kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

এমন একটা ঝড় উঠুক...

আব্দুল বায়েস

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



এমন একটা ঝড় উঠুক...

সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি-নীতি নাকি এই যে একজন সরকারপ্রধান বিদেশ সফরের খুঁটিনাটি সম্পর্কে দেশবাসীকে অবহিত করবেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ কাজটা করা হয় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে, জাতীয় সংসদ তো অবহিত হওয়ার অপেক্ষায় আছেই। সেই ঐতিহ্যের বাহনে চেপে মাত্র কয়েক দিন আগে ভারত সফর শেষ করে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন। তারও আগে একই কাজ করেছিলেন আজারবাইজানে ন্যাম সম্মেলন শেষে দেশে ফিরে এসে। বিদেশে সরকারি সফর শেষে এ কাজটি করতে তিনি সাধারণত কালক্ষেপণ করেন না বলেই জানি।

যা হোক, ভারত সফর শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী ভালো করেই জানতেন যে সেই দেশের সঙ্গে সম্পাদিত কয়েকটা চুক্তি নিয়ে তীব্র প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে পারেন। কিন্তু দেখা গেল, দ্বিধাহীনচিত্তে সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি সক্ষম হলেন—এমনকি পানি নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার কিংবা গ্যাস নিয়ে ঘুসঘুসে সমালোচনারও চটজলদি জবাব দিলেন। সহজ ভাষায় এবং অম্লমধুর বাক্য বিনিময়ে সংবাদ সম্মেলনকে প্রাণবন্ত করে রাখার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে একটা মোহনীয় ক্ষমতা আছে, তা নিয়ে সম্ভবত সন্দেহ নেই; ঝানু ঝানু সাংবাদিক তাঁকে ধরাশায়ী করতে গলদঘর্ম হন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদ সম্মেলনগুলোতে অন্য সব কিছু ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠে চলমান একটা ঝড়-দুর্নীতি তথা ক্যাসিনো কাণ্ডবিরোধী অভিযান প্রসঙ্গ। কয়েক শ কিলোমিটার বেগে ধাবিত এই ঝড় এরই মধ্যে তছনছ করে দিয়েছে নির্বাচিত কিছু দুর্নীতিবাজের সাজানো ‘সাম্রাজ্য’। ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রত্যুৎপন্নমতি প্রধানমন্ত্রী সবাইকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত শূন্য সহনশীলতার (জিরো টলারেন্স) ধারাবাহিকতায় অভিযান আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত হবে, যেমন করে হবে রাজনৈতিক পেশা এবং দলনিরপেক্ষ অভিযান।

দুই.

একটা ব্যক্তিগত কড়চা দিয়ে মূল আলোচনা শুরু করা যাক। বৈকালিক ভ্রমণকালে পেছন থেকে একটা মেয়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। মোবাইল ফোনে কাউকে সে বলছে, ‘আমাদের টিভি চ্যানেলে ছাঁটাই চলছে; পারিস তো আমার জন্য একটা কাজ দেখ।’ অপর প্রান্ত থেকে সম্ভবত অন্য এক চ্যানেলের কথা বলা হলে মেয়েটি ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘আরে, ওখানে তো অবস্থা আরো খারাপ...।’

বাংলাদেশে এখন নাকি ৩৫টা টিভি চ্যানেল আছে এবং শোনা কথা, অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে আরো ১৫টি। অসংখ্য সংবাদপত্র এ দেশে, আর প্রাইভেট রেডিওর সংখ্যা নেহাত কম নয়। অন্যদিকে এখানে যেমন অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে (এবং আরো আসছে বলে শুনছি), তেমনি অনেক ব্যাংক থাকা সত্ত্বেও পাইপ লাইনে আছে আরো কয়েকটি ব্যাংক। সন্দেহ নেই যে এসবই রাজনৈতিক তথা দলীয় বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

দল ক্ষমতায় গেলে সমর্থকদের স্বার্থ একটু-আধটু দেখতে হয় এবং পৃথিবীর সব দেশেই মাত্রাভেদে তা আছে। তবে সীমা লঙ্ঘন করে নয়। পশ্চিম বাংলার সিপিএম, ভারতের কংগ্রেস এবং বাংলাদেশের বিএনপি এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তথাকথিত দলকানা স্বজন-তোষণ আর ভয়াবহ দুর্নীতির মাধ্যমে প্রসারমাণ তথাকথিত ‘পুঁজিবাদের’ ভয়াবহ পরিণতির কথা। সুতরাং এই দুই দেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছে, তাদের উচিত হবে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া।

তিন.

আপাতত না হয় থাক সে কথা। লাভ-ক্ষতি হিসাব করলে এর আগে উল্লিখিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই দেউলিয়া হওয়ার কথা। হওয়ার কথা কেন বললাম, বস্তুত ভেতরে ভেতরে দেউলিয়াই, যদিও বাইরের চাকচিক্য দেখলে মনে হয় ফিটফাট। হাতে গোনা কটি টিভি চ্যানেল ও পত্রিকা ছাড়া অন্যরা নাকি চলমান খরচ জোগান দিতেও হিমশিম খায়। অন্যদিকে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় শ খানেক ব্যয়বহুল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যার মধ্যে বড়জোর ১০-১২টি প্রকৃত অর্থে শিক্ষাসেবা দেয় বলে বিশ্বাস করা যায়; বাকিরা কয়েকটা রুম দখল করে বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়ে, ইউজিসির চোখের সামনে, সনদপত্র বিক্রি করে মুনাফা লুট করে নেয়।

ব্যাংকের কথা বলাই বাহুল্য। সরকারি-বেসরকারি মিলে ব্যাংকের সংখ্যা হয়তো শয়ের কাছাকাছি হবে, যার মধ্যে কয়েকটা দেউলিয়া হয়ে গেছে, তবে সরকারি অর্থায়নে অক্সিজেন মাস্ক পরে ‘আসিইউতে’ আছে। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারি ব্যাংকই প্রকৃত আর্থিক অর্থে অচল প্রায়। বেসরকারি ব্যাংকগুলো পারিবারিক প্রাধান্য নিয়ে নিজেরাই নিজেদের জন্য ঋণ বরাদ্দ নেয়। এখানেও তদারকি সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতা দিবালোকের মতো পরিষ্কার।

একসময় বরাদ্দকৃত নিউজপ্রিন্ট কালো বাজারে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করা যেত বলে পত্রিকা বের করতে অনেকে আগ্রহ দেখাতেন। এখন বোধ হয় সেই দিন নেই। কারণ নিউজপ্রিন্টের আকালের কথা আর শোনা যায় না। তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়, বাজারে এত পত্রিকা কেন? নিন্দুকেরা বলেন, পত্রিকা বা চ্যানেল হচ্ছে ক্ষমতা, অর্থবিত্ত বৃদ্ধিকল্পে মইস্বরূপ, অর্থাৎ কিছু কিছু পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক বিরূপ রিপোর্টের ভয় দেখিয়ে ‘চাঁদা’ ও ‘নজরানা’ আদায় করে থাকেন।

চার.

এই অভিযোগের সত্যতা যে একেবারেই নেই তা বোধ হয় বলা যাবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ঈষৎ ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা ধরে অনুসন্ধান এগোতে পারে। কোনো এক পত্রিকার সম্পাদক নাকি এক ব্যাংকারকে ধমকের সুরে বলেছেন, টাকা না দিলে বাজে রিপোর্ট করে ওই ব্যাংকারের বারোটা বাজাবেন। অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে এবং সে সম্পর্কে জনশ্রুতি বলছে, কিছু পত্রিকার মালিক বা চ্যানেল হুমকি-ধমকি আর ব্ল্যাকমেইল করে আঙুল ফুলে কলাগাছ নয়, বরং বটগাছ বনে গেছে। ক্যাসিনো কিংবা অন্যান্য কুকর্মে তাঁদের সম্পৃক্ততা প্রশ্নাতীত নয় বলেও গুঞ্জন আছে।

ব্যাংক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় বলি অথবা সংবাদপত্র কিংবা চ্যানেল বলি, এগুলো ক্ষেত্রবিশেষে কালো টাকার মালিকদের নিয়ন্ত্রণে হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানে এই দিকটায় যেন বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়।

সমালোচকরা বলে থাকেন, প্রধানমন্ত্রীর চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নাকি একটা ‘আই ওয়াশ’। অর্থাৎ সার্বিক ব্যর্থতা থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকার পরিকল্পিতভাবে এই অভিযান নাটকের অবতারণা করেছে। অবশ্য সমালোচকদের দোষ দেওয়া যায় না। কারণ চুন খেয়ে মুখ পুড়ে গেলে মানুষ দই খেতেও ভয় পায়। বিগত কালের সামরিক শাসকরা ক্ষমতায় বসেই একটা ক্লিন ইমেজ সৃষ্টির লক্ষ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতেন; কিন্তু পরিশেষে দেখা গেছে তাঁরাই আবার মানুষের আস্থাকে পুঁজি করে সাঙ্গোপাঙ্গসহ দুর্নীতির দরিয়ায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়েছেন। তাঁদের অভিযানের মূল লক্ষ্য থাকত ভয়ভীতি আর হামলা-মামলা দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা কিংবা নবগঠিত নিজ দলে ভেড়ানো। ‘জো জিতে ওহি সিকান্দর’ ভেবে এক শ্রেণির রাজনৈতিক টোকাই হুড়মুড় করে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিতেন; চলত সীমাহীন দুর্নীতি। সুতরাং ‘আরে রাখেন ভাই আপনার অভিযান; এমন কত দেখলাম এই জীবনে—যেই লাউ সেই কদু’—এমনতর ধারণা কারো মনে বাসা বাঁধলে দোষ দেওয়া যায় না।

পাঁচ.

তবে বিশেষত দু-একটা ব্যতিক্রম বলে দেয় যে সম্ভবত এবারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান একেবারে অতীতের অন্ধ অনুসরণ নয়। এই যেমন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজের দলের অঙ্গসংগঠন দিয়ে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম একের পর এক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের (আওয়ামী লীগের) নিজ ঘর থেকে। অতীতে ক্ষমতায় অন্যান্য রাজনৈতিক দলও ছিল, একক না হলেও অন্তত জোট বেঁধে এবং তাদের কালে দুর্নীতি অপেক্ষাকৃত কম ছিল—এমন উদ্ভট উপপাদ্য নিয়ে কেউ হাজির হলে বলতে হবে সে নিতান্তই দলকানা; চোখ থাকতেও সে অন্ধ। অতীতে দুর্নীতি যথেষ্ট হয়েছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুংকার ছাড়া হয়েছে প্রচুর, তবে আখেরে ‘যেই লাউ সেই কদু’ থেকে গেছে।

আশাবাদী একজন মানুষ হিসেবে অন্তত আমি মনে করি যে এই অভিযানটা ‘আই ওয়াশ নয়’, আশা রাখব যে যথাযথ তদন্তসাপেক্ষে দুর্নীতিবাজ ও তাদের সঙ্গীদের ‘হোয়াইট ওয়াশ’ করে ছাড়া হবে অর্থাৎ একদিকে জেল-জরিমানা, অন্যদিকে তাদের অবৈধ উপায়ে গড়া সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। এর বিকল্প নেই। কারণ দুর্নীতি উন্নয়নের উইপোকা শুধু নয়, দুর্বৃত্তায়নের প্রধান অনুঘটকও। আইনের শাসনের যথাযথ প্রয়োগের কারণে নুসরাত হত্যার বিচার যদি প্রশংসনীয়ভাবে স্বল্পতম সময়ে হতে পারে, আইনের কঠোর প্রয়োগের ফলে এসিড মেরে ঝলসে দেওয়ার প্রবণতা যদি বহুলাংশে হ্রাস পেতে পারে, তাহলে দুর্নীতিবাজদের কিংবা ঋণখেলাপিদের বিচার কেন দ্রুততার সঙ্গে করা যাবে না, তা বোধগম্য নয়।

ছয়.

প্রশ্ন হচ্ছে, ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে’—এই আপ্ত বাক্য যখন সবার মনে, তখন দুষ্টের দমনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতে হবে কেন? বহু বছর ধরে ক্যাসিনো অবৈধ কর্মকাণ্ড চলছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায়। তাদের জবাবদিহির ব্যাপারে কী হবে? দুদকের সাবেক এক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, দুদক নাকি নখ ও দন্তহীন বাঘ; কিন্তু অতি সম্প্রতি তৎপরতা দেখে তো মনে হচ্ছে দুদকের নখ ও দন্ত বেশ ধারালো, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও প্রশংসনীয়।

আমরা মনে করি যে শুধু ওপর থেকে নির্দেশ দিয়ে সমাজ থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন কিংবা অবৈধ কর্মকাণ্ডের অবসান কখনো সম্ভবপর নয়, যদিও অভিযানের ফলে ছোট-বড় কিছু মাছ জালে আটকাবে। কিছুদিন পর আবার দুর্নীতি পুনরুৎপাদিত হবে। অতএব বিদ্যমান সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা, ক্ষমতা ও স্বাধীনতা সুসংহত করতে না পারলে, অভিযানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী পড়বে তা নিয়ে সন্দেহ থাকাই স্বাভাবিক।

প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতির প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ সমর্থন আছে।

এমন একটা ঝড় উঠুক—ঝড় উঠুক, দূর হোক দুর্নীতি।

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা