kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাজনীতির ‘বড় ভাই’ এবং আস্থা-অনাস্থার রাজনীতি

রেজানুর রহমান

২৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রাজনীতির ‘বড় ভাই’ এবং আস্থা-অনাস্থার রাজনীতি

‘বড় ভাই’ কথাটা ইদানীং অনেক বেশি আলোচিত হচ্ছে। স্বাভাবিক অর্থে আমরা কী বুঝি? ‘বড় ভাই’ মানে তো একটা আস্থার জায়গা। বড় ভাই তো বাবারই মতো। বড় ভাই কাছে থাকলে, পাশে দাঁড়ালে মনে বল আসে। হতাশা কেটে যায়। মনের মাঝে একটা বিশ্বাস তৈরি হয়, হ্যাঁ, এবার আমি পারব। সে কারণেই বড় ভাইকে ঘিরে কতই না গল্প, কবিতা লেখা হয়েছে। যাঁরা সিনেমা ভালোবাসেন বিশেষ করে আশি, নব্বইয়ের দশকের সিনেমাপাগল বাঙালি প্রয়াত অভিনেতা আনোয়ার হোসেনকে ‘বড় ভাই’ হিসেবেই শ্রদ্ধা করতে শিখেছেন। কারণ আনোয়ার হোসেন বেশির ভাগ সিনেমায় হয় বাবা, না হয় বড় ভাই চরিত্রে অভিনয় করতেন। অভিনয়ের মাধ্যমে বাস্তব জীবনের বড় ভাইদের ত্যাগী জীবনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরতেন। ছোট ভাই-বোনকে মানুষ করার জন্য বড় ভাইয়ের কী প্রাণান্তকর চেষ্টা। আহারে বড় ভাই! কী কষ্টের জীবন তাঁর। শরীরের চামড়া দিয়ে স্যান্ডেল বানিয়ে দিলেও যেন ঋণ শেষ হবে না।

সেই শ্রদ্ধার বড় ভাই শব্দটিই এখন আতঙ্ক ও বিব্রতকর শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় ভাই শব্দটা শুনলেই মনে হয়, ওই বুঝি বিপদ আসন্ন। বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ডের পর শব্দটি শুধু ভীতিকর নয়, ঘৃণার শব্দও হয়ে উঠেছে। আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তারকৃতদের অনেকেই বড় ভাইকে দোষারোপ করেছেন। আবরার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি নাজমুস সাদাত আদালতে দাবি করেছেন, বড় ভাইদের কথায় সেদিন আবরারকে তিনি ডেকে আনেন। তার মানে শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির বড় ভাইয়েরা ভয়ংকর হয়ে উঠেছেন। তাঁরা ইচ্ছা করলেই যে কাউকে ডেকে এনে যা খুশি তাই করার ক্ষমতা রাখেন। তাঁরা ইচ্ছা করলেই যেকোনো ছাত্রকে হল থেকে তাড়িয়ে দিতে পারেন। কারো হাঁটাচলা পছন্দ নয় সে জন্য তাকে জরুরি তলব করে কঠিন শাস্তি দিতে পারেন। মিছিলে যায়নি কেন এই অভিযোগেও যে কাউকে চরম হেনস্তা করার ক্ষমতা রাখেন।

সংসারের দায়িত্ববান বড় ভাইয়ের আদর্শকে ধারণ করেই কিন্তু রাজনীতিতে একসময় ‘বড় ভাই’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং একসময় রাজনীতিতেই বড় ভাই শব্দটি অনেক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা তৈরি করে। আজকে যাঁরা জাতীয় রাজনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন, খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাঁদের অনেকের সাফল্যের ক্ষেত্রে রয়েছে রাজনীতির বড় ভাইদেরই বিরাট অবদান। পরিবারের মতো রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রেও তো বড় ভাইয়েরা অর্থাৎ সিনিয়র নেতারা জুনিয়রদের পথ দেখান। এটাই রাজনীতির সৌন্দর্য। ছাত্ররাজনীতিতে এর প্রকাশভঙ্গি ছিল আরো মর্যাদাকর। আমাদের দেশে আকবর হোসেন নামে একজন ঔপন্যাসিক ছিলেন। ‘ঢেউ জাগে’ নামে তাঁর একটি উপন্যাসের নায়ক ছিলেন একজন নামকরা ছাত্রনেতা। একদিন প্রচণ্ড ঝড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। ঝড়ের মধ্যেই ওই ছাত্রনেতা একাই বিপদগ্রস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন। তাঁর দেখাদেখি অন্যরাও সহায়তাকাজে অংশ নেন। তার মানে উপন্যাসটির কাহিনি প্রমাণ করে আগের দিনের ছাত্রনেতারা কতটা ত্যাগী মনোভাবের ছিলেন। এমন ত্যাগী, পরোপকারী ছাত্রনেতাই তো বড় ভাই। এভাবেই রাজনীতিতে বড় ভাই শব্দটি আদরণীয়, শ্রদ্ধা ও আস্থার জায়গাটা তৈরি করেছিল।

কিন্তু বর্তমান সময়ে ছাত্ররাজনীতির বড় ভাইরা যেন মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ছাত্ররাজনীতিতে বড় ভাই সম্পর্কটি সবার কাছে ভীতিকর তো বটেই, ঘৃণিতও হয়ে উঠেছে। শুধু যে ছাত্ররাজনীতিতেই বড় ভাই শব্দটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, ঠিক তা নয়। জাতীয় রাজনীতিতেও বড় ভাই শব্দটি অনেকের কাছেই নিন্দনীয় হয়ে উঠেছে। অবৈধ ক্যাসিনো কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগ নেতা সম্রাটকে তাঁর অনুসারীরা বড় ভাই বলতে অজ্ঞান হয়ে যান। অপরাধ জগতে ‘ভাই’ অথবা ‘বড় ভাই’ শব্দ দুটি বেশ সম্মানের। ভাই, আপনি শুধু অর্ডার করেন তারপর দেখেন আমরা কী করি? এই ধরনের সংলাপ অনেকেরই পরিচিত। নাটক-সিনেমায় অহরহ এই ধরনের সংলাপ শুনতে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ভাই হলেন অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি। যারা তাঁর কাছে অর্ডার চাচ্ছেন তারা ভাইয়ের প্রতি বেশ অনুগত। কিন্তু তাদের স্বপ্ন—একদিন তারাও ‘ভাই’ হবেন। ভাই শব্দটি কার্যত এখন অন্যায় কর্মকাণ্ডের শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কলেজ ক্যাম্পাসে গেলেই দেখবেন, হয়তো কোনো ছাত্রনেতা হেঁটে আসছেন, তাঁর পেছনে আরো অনেক ছাত্র হাঁটছে...সবার চোখে-মুখে এক ধরনের উদ্ধত ভঙ্গি। যেন ভাইকে খুশি রাখতে পারলেই একটা কাজের কাজ হবে। আর যদি ওই ছাত্রনেতা হন ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠনের কোনো নেতা, তাহলে তো হেঁটে আসার ভঙ্গি হবে আরো ভয়ংকর। রিকশা অথবা গাড়ি তাঁদের সাইড না দিলেই হয়েছে... কপালে জুটবে হম্বিতম্বি না হয় ভাঙচুর...

তার মানে ভাই হওয়া কি খুবই সহজ? না তা নয়। ভাই হতে গেলে প্রথমে দরকার পড়বে একটি ছাত্র সংগঠনের পরিচয়। তারপর কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদ তো লাগবেই। সে কারণেই দেখবেন দেশের বেশির ভাগ ছাত্র সংগঠনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ একটি করে থাকলেও অন্য পদগুলোর ক্ষেত্রে একাধিক নাম যুক্ত হয়। যেকোনো মূল্যে সংগঠনের কোনো একটি পদে নাম যুক্ত করতে পারলেই তো কেল্লাফতে। ভাই হিসেবে নিজেকে যোগ্য করে তোলার লড়াইটা শুরু হয় এভাবেই...

কথায় আছে ‘ভাই বড় ধন’... হ্যাঁ, ভাইয়ের মতো মধুর সম্পর্ক তো আর হয় না। বিশেষ করে বড় ভাই তো দারুণ এক আস্থার প্রতীক। রাজনীতির বড় ভাইয়েরাও একসময় আস্থার প্রতীক ছিলেন। অথচ এখন যেন সেই আস্থাটা কেউই পাচ্ছেন না; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনীতির বড় ভাইদের কাছ থেকে অনেকেই আস্থা ও ভরসার জায়গা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

আবরারের ছোট ভাই ঢাকা কলেজে পড়ত। সেও অনেক মেধাবী ছাত্র। মেধাবী ছাত্র মানেই স্বপ্ন থাকে ঢাকা কলেজে পড়ার। অথচ আবরারের ছোট ভাই ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও কলেজ থেকে ছাড়পত্র নিয়ে ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে। কেন গেছে? কারণ সে রাজনীতির বড় ভাইদের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারছে না। এই ঘটনা থেকে সত্যি কি আমাদের কোনো শিক্ষা নেওয়ার আছে?

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা