kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ইরানের সঙ্গে বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্য

শ্যেন কিন

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত ইরাক অভিযানের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে নিশ্চিত করেই বলা যায়—এ কথা ওয়াশিংটনের লোকজন ভুলে যায়নি। ২০০৩ সালের মার্চের আগ্রাসনের আগেই, দীর্ঘকালের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরাক অনেকাংশে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তার পরও মার্কিন সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক সংস্থাগুলো ইরাকে কর্তৃত্ব ধরে রাখতে পারেনি।

পেন্টাগন ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু তারা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। আরো আগে থেকে ইরাক ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে যাঁরা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁদের জন্য এটি বিপত্তিকর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান ও ইরাক নিয়ে ভাবার সময় মনে রাখতে হবে, এই দুই প্রতিবেশী দেশ খনিজ সম্পদে ভরপুর এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত—কার্যত বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটিতে। আরো মনে রাখতে হবে, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মধ্য এশিয়া ইরান ও ইরাকের উত্তরে; পূর্বে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত—পরের দুটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী; দক্ষিণে সৌদি আরব—বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল উৎপাদক এবং ৭৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র।

তেলের মজুদের দিক থেকে ইরান ও ইরাকের বৈশ্বিক অবস্থান যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম। এই দুই দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ শক্তিধর কোনো দেশকে (যুক্তরাষ্ট্রের মত) বিশেষ বৈশ্বিক অবস্থানে এগিয়ে নিতে পারে।

পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি বরাবর ইরানের অবস্থান। উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেলের উৎস; বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপকূলীয় তেলক্ষেত্র সাফানিয়া (সৌদি আরব) ওই উপসাগরে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও আমিরাতও রয়েছে, যারা বিশ্বের ৬৬ শতাংশ তেলের মজুদের অধিকারী এবং ৩৩ শতাংশের বেশি গ্যাসের অধিকারী। সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনাকারীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ অঞ্চলে নজর রেখেছে। এই চার দেশে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে তেহরানকে হুঁশিয়ারি দেওয়ার জন্য।

হরমুজ প্রণালি সংকীর্ণ ও অগভীর জলপথ। তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ পথে বিশ্বের তেল চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ সরবরাহ হয়; এলাকাটি ইরান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাজ্যের মতো পশ্চিমা শক্তির বর্ধমান বিরোধের ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র বিরোধে জড়ালে এ পথে বিদেশি জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান।

হরমুজ প্রণালি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের নিয়ন্ত্রণে। মার্কিন সেনাদের অবস্থান হরমুজ থেকে ৩০০-৪০০ মাইলের মধ্যে; মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি বাহরাইনের কাছে। ইরানকে পশ্চিমা রাজনীতিক ও মিডিয়ার চক্ষুশূল বলা যেতে পারে। ১৯৭৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে শাহ মোহাম্মাদ রেজা পাহলভির ক্ষমতাচ্যুতির পর ইরানের মার্কিনবলয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি কখনো ক্ষমা করেনি পাশ্চাত্য।

১৯৭৯-পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটনের প্রভাবমুক্ত থেকে নীতি নির্ধারণ করে যাচ্ছে তেহরান। এ কারণে ইরান স্থিতিশীলতার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে অভিহিত হয়েছে। ইরান স্পষ্টতই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের জন্য চ্যালেঞ্জ। ইরানি নেতারা ইরাকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারির সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন—এ সম্পর্ক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক। পশ্চিমা শক্তির স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে সিরিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট হয়েছে তেহরান।

উপসাগরীয় এলাকায় ইরানের বর্ধমান প্রভাবে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে (তেলসমৃদ্ধ এলাকা) পূর্ণমাত্রিক বিদ্রোহ ঘটতে পারে। সেখানে প্রচুর শিয়ার বসবাস এবং সেখানকার সামাজিক অসন্তোষের ইতিহাস দীর্ঘ। সুন্নি সৌদি সরকারের নিপীড়নের শিকার তারা।

ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের মূল কারণ গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস নয়, বরং অনুগত একটি সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেশটির তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। আগ্রাসনের পর সেখানে বিদেশি সেনাদের কর্মকাণ্ডে গোষ্ঠীগত ও জাতিগত বিরোধ কার্যত গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়। শিয়ারা ক্ষমতার সামনের কাতারে চলে আসে, যা ইরানের আকাঙ্ক্ষার অনুরূপ। ইরাক যুদ্ধে মার্কিন সরকারের ব্যয় হয়েছে দুই ট্রিলিয়ন ডলার—বলতে গেলে অযথাই।

অধিকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষ বাড়তে থাকায় মার্কিন বিনিয়োগকারীরা ইরাকে বিনিয়োগ করতে পারেনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক মাসের মধ্যে পেন্টাগন এ উদ্দেশ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তার নিরিখে বলা যায়, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ খুবই মারাত্মক ও বিপর্যয়কর হবে। জনসংখ্যা, আয়তন, সামরিক শক্তি ও ভূ-প্রকৃতি—সব দিক বিবেচনায়। চীন ও রাশিয়ার মতো বড় শক্তির সঙ্গেও ইরানের মিত্রতা রয়েছে।

লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে লেখেন; গ্লোবাল রিসার্চের লেখক

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা