kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দলীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা গণতন্ত্র

এম হাফিজউদ্দিন খান

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দলীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা গণতন্ত্র

দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এখন তো রাজনীতি ও গণতন্ত্র শুধু বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বক্তৃতায় পাওয়া যায়, বাস্তবে এর দেখা খুব একটা মেলে না। রাজনীতি এখন দলীয় ব্যাপার হয়ে গেছে। সার্বিকভাবে মানুষ ও দেশের জন্য যে রাজনীতি হয়, সেই জিনিস এখন আর দেখতে পাই না। এটা এক হিসেবে আমরা যারা একটু সুধীসমাজ, সমাজের নানা বিষয়ে চিন্তাভাবনা করি, তাদের জন্য আশাপ্রদ কোনো ব্যাপার নয়। এসব আমাদের হতাশই করে।

রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে হতাশা ছাড়া আশার কোনো আলো দেখতে পাচ্ছি না। দেশে রাজনীতি আছে, গণতন্ত্রও আছে; সেসব আছে শুধু নির্বাচনী কথায় বা নির্বাচনী ইশতেহারের ঘোষণায়। রাজনীতির যে লক্ষ্য, নীতি ও উদ্দেশ্য—সেসব ভোটের আগে দলীয় নির্বাচনী ইশতেহারে পাওয়া যায়। নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে সেসব নিয়ে আর কোনো চর্চা বা আলোকপাত দেখা যায় না। সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য নির্বাচনের আগে যে ম্যানিফেস্টো দেওয়া হয়, তার মেয়াদ যেন নির্বাচন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। নির্বাচনের পর প্রতিশ্রুত ইশতেহার বাস্তবায়নের দিকে কোনো সরকারের মনোযোগ দেখা যায় না। সেসব বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে খুব একটা তৎপরতাও লক্ষ করি না। এই সংস্কৃতিটা কোনো বিশেষ দলের মনোভাব বা বৈশিষ্ট্য, এমন নয়। বাংলাদেশে সব দলই এভাবে চলে আসছে। ফলে ইশতেহার নিয়ে নির্বাচনের আগে ও পরে অনেক তফাত লক্ষ করা যায়।

দেশ নানাভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু দুর্নীতি দেশের সব রকম সুনাম ও অর্জন নষ্ট করে ফেলছে। এটা নিয়ে বিশদভাবে বলার দরকার নেই। কোথায়, কখন ও কিভাবে দুর্নীতি হয়, হয়ে আসছে—এসব সাধারণ মানুষও এখন জানে এবং বোঝে বলেই আমার ধারণা।

আরেকটা বড় প্রবণতা দেখা যায়, সব কিছুতেই দলীয়করণ। রাজনীতি ও গণতন্ত্র থেকে শুরু করে সব কিছুতেই একটা দলীয়করণের ছাপ পাওয়া যায়। সার্বিকভাবে সাধারণ মানুষের সুবিধা ও কল্যাণ হবে, সে জন্য আলাদা করে ভাবনা তো দেখি না। সব কিছুতেই দলীয় প্রচার ও প্রপাগান্ডা দেখতে পাওয়া যায়।

এখন যে কথাটা বলা যায়, আইনের শাসন যেমন নেই দেশে, গণতন্ত্রও তেমন অনুপস্থিত। গণতন্ত্রের কিছুই দেশে নেই বলা যায়। ২০০৮ সালের আগে নির্বাচনী পরিবেশ ও গণতন্ত্রের চর্চা এবং পরিবেশ তা-ও অবশিষ্ট ছিল। এখন এখানে নির্বাচন নিয়ে আশাপ্রদ কিছু দেখা যায় না।

কী নিয়ে এখন রাজনীতি করা হয়? সাধারণ মানুষ ও সমাজের কথা, ভাবনা ও স্বপ্ন কি রাজনীতিতে প্রতিফলিত হয়? কোথায়, সেসব তো দেখা যায় না। এখন দলীয় রাজনীতির চর্চা যেমন বেড়েছে, দলীয় সরকারের বিষয়টাও বড় হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবেই দেশ চলছে। কোনো অসুবিধা তো নেই, যদি সেভাবে ভাবা যায় আর কি।

এই সময়ে দেশে অনেক উন্নয়ন হচ্ছে। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে অনেক টাকাও খরচ হচ্ছে। কাজ সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ায় খরচ আরো বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেসব নিয়ে কোনো আলোচনা তো দেখা যায় না। এখানে যে বিষয়টা আমাদের ভাবতে হবে—লোক-দেখানো উন্নয়ন কাজ এবং প্রজেক্টগুলো কতটা কাজের? সাধারণ মানুষের এসব উন্নয়ন কতটা কাজে লাগে? আবার উন্নয়ন যেমন দরকার, তারও আগে ভাবা দরকার যে কোন কাজটা আগে করতে হবে। অগ্রাধিকার কোন কাজে আগে দিতে হবে। এসব নিয়েও ভাবতে হবে। উন্নয়নের সাফল্যে এসব কথা ও চিন্তা চাপা পড়ে যায়। আলাদা করে এসব নিয়ে ভাবার মানুষ তো দেখতে পাই না।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে এখানে একটা ট্রাম্প কার্ড ব্যবহার করা হয়। এতে কোনো আপত্তি দেখি না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আওয়ামী লীগ মনে করে, তারাই শুধু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। এভাবে তারা নিজেরাই একটা বিভাজন তৈরি করে ফেলেছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও এসব নিয়ে যে তর্ক এবং স্বার্থপর বিবেচনা প্রকাশ করা হয়, তাতে দুঃখিত না হয়ে উপায় থাকে না। আওয়ামী লীগ মনে করে, তারাই শুধু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক। বাকি সবাই তাদের বিপরীত। বিষয়টা তো এমন নয়।

এখন নানা ধরনের সমস্যায় দেশ ও দেশের মানুষ অস্থির সময় পার করছে। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম দুর্নীতি। আরেকটা সমস্যা এখানে দেখতে পাচ্ছি, যেটা দুর্নীতির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সেটা হচ্ছে ব্যক্তিপূজা। ব্যক্তিপূজা ও চাটুকারিতা সারা দেশে, সর্বত্র এবং সব ব্যাপারে জেঁকে বসেছে। এ কারণে সুষ্ঠু রাজনীতির কোনো চর্চা দেখি না। সব ধরনের কাজে এবং সর্বত্র চাটুকারিতা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে, এর বিকল্প যেন আর কিছু নেই। বিকল্প থাকতেও পারে না।

আরেকটা চিন্তার বিষয়, এখানে বিরুদ্ধমতের কোনো সুযোগ নেই। সময়টা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, কোনো বিষয়ে বিরুদ্ধ মত ও ভাবনা প্রকাশই করা যাবে না। প্রকাশ করলেই বিপদ। সব ঘটনা তো আর ফোকাস হয় না বা আলোর মুখ দেখে না। কিন্তু দু-একটা ঘটনা যখন সামনে আসে, বোঝা যায়—কোথায়, কেন এবং কী ঘটছে। সর্বশেষ বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে নিয়ে যে হত্যাকাণ্ড ঘটে গেল, তা থেকেই অনুমান করা যায়, ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। এটা তো পরিষ্কার, বিরুদ্ধমত প্রকাশের কারণেই তাঁকে ছাত্রলীগের ছেলেরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। এমন ঘটনা আরো ঘটেছে, ঘটে চলেছে, হয়তো সেসব আলোর দেখা পায়নি। কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বা তেমন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অন্য মতের কাউকে কোনোভাবেই দাঁড়াতে দেওয়া যাবে না। বের করে দেওয়া হবে।

আমাদের সময়েও ছাত্ররাজনীতি ছিল। কিন্তু তখন রাজনীতি এত কলুষিত ছিল না। সব ধরনের ছাত্রদের মধ্যে সমান অধিকার বজায় ছিল। আদর্শ বা মত যা-ই হোক না কেন, বিরোধী কাউকে ক্যাম্পাসে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না—এ ধরনের কোনো ব্যাপার ছিল না। তখন আদর্শ বলি বা ম্যানিফেস্টো—এগুলো ছাত্ররাই নিয়ন্ত্রণ করত। এত কোন্দল ছিল না। দলীয়ভাবে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় ছিল না। ছাত্ররাজনীতি নিয়ে জাতীয়ভাবে যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রভাব, তার সঙ্গে এর কোনো যোগ ছিল না। এখন ভিকটিম অনুযায়ী গঠিত দল হলে তো ভালো কিছু আশা করা যায় না।

সব দলেই এখন পক্ষপাত ও প্রভাবের বিষয়টা প্রধান হয়ে উঠেছে। আমরা শুধু আওয়ামী লীগের কথাই বলছি না। এখানে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল বা অন্যদের বেলায় একই বিষয় আমরা দেখতে পাই। একমাত্র বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে কিছু আদর্শ এখনো বজায় আছে বলে মনে হয়। এ ছাড়া অন্যান্য দলের কথা সেভাবে বলার অবস্থা দেখি না। জামায়াত বা তাদের অঙ্গসংগঠনের কথা তো বলার কোনো অবকাশই নেই।

রাজনীতি নিয়ে আমরা ভালো অনুভূতি বোধ করি না। এখানে অনেক সমস্যা ও অসংগতি দেখতে পাই। কথা বলে কোনো লাভ হয় না। রাজনীতি বলি আর সামাজিক কাঠামোই বলি, এখানে আইনের কোনো শাসন নেই। সঠিক বিচার হয় না। বিচারের কাজ ঝুলে থাকে। গণতন্ত্রের চর্চার সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ এসব দেখতে পাই না।

এখন অল্প কথায় বলা সম্ভব নয় যে কিভাবে এর থেকে উত্তরণ হতে পারে। খুব দ্রুতই কোনো ভালো কিছুর সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। নতুন এবং ভালো কিছু করতে হলে সবার আগে ব্যক্তিপূজা, লেজুড়বৃত্তি এবং দুর্নীতির বিষয়গুলো দূর করতে হবে। এসব যদি চলতেই থাকে, তাহলে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয় না। হ্যাঁ, এসব থাকলেও দেশ চলবে না, রাজনীতি ও গণতন্ত্র থাকবে না—তা নয়। কিন্তু সেই রাজনীতি ও গণতন্ত্রের কোনো কল্যাণমূলক ভবিষ্যৎ আছে বলে মনে হয় না। এখন যেটা হতে পারে, নতুন আদর্শ, ভাবনা এবং সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে যদি কেউ রাজনীতিতে আসেন, তাহলে হয়তো রাজনীতি কলুষমুক্ত হওয়ার অবকাশ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া আপাতত রাজনীতিতে নতুন কোনো আলো ও উত্তরণ এই মুহূর্তে আমি দেখতে পাচ্ছি না।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা