• ই-পেপার

শিক্ষকের মর্যাদা ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক

  • এ কে এম শহীদুল হক

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বেড়েছে, এখন প্রয়োজন সেবার মানোন্নয়ন

সুমিত বণিক

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বেড়েছে, এখন প্রয়োজন সেবার মানোন্নয়ন

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হলেই প্রধানত আমরা শুনি, মানুষের তুলনায় বরাদ্দ খুব কম। কথাগুলো একেবারে মিথ্যা নয়। কিন্তু আজকের বাস্তবতা শুধু এতটুকুতে আটকে নেই। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেই মানুষ ভালো চিকিৎসা পাবেএমন সরল বিশ্বাস এখন আর যথেষ্ট নয়। কারণ সরকারি হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা রোগী, উপজেলা হাসপাতালে ডাক্তার না পাওয়া মা কিংবা ডায়াবেটিসের ওষুধ কিনতে হিমশিম খাওয়া বৃদ্ধ মানুষতাদের কাছে বাজেটের অঙ্ক নয়, সেবার বাস্তব চেহারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কালের কণ্ঠে প্রকাশিত স্বাস্থ্য খাতে ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব শিরোনামের প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতের বড় বরাদ্দের কথা এসেছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক খবর। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, চিকিৎসাশিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনাসব মিলিয়ে সরকার এবার স্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়এমন একটি বার্তা এতে আছে। একজন জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমি এই বার্তাকে স্বাগত জানাই। কারণ স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ মানে শুধু হাসপাতাল বানানো নয়, এটি মানুষের কর্মক্ষমতা, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার বিনিয়োগ। তবে প্রশ্ন হলো, এই টাকা কোথায় যাবে, কিভাবে খরচ হবে, আর সাধারণ মানুষ তার কতটা সুফল পাবে? কালের কণ্ঠের অদক্ষ ব্যবহারই স্বাস্থ্য খাতের বড় সংকট শিরোনামের আলোচনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে সমস্যা শুধু টাকার অভাব নয়, বড় সমস্যা হলো বিদ্যমান সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার, অব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ঘাটতি। সেখানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই বিদ্যমান সম্পদ দিয়ে সেবার পরিমাণ অনেক বাড়ানো সম্ভব। এই কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক জায়গায় ভবন আছে, কিন্তু ডাক্তার নেই; যন্ত্র আছে, কিন্তু চালানোর লোক নেই; বরাদ্দ আছে, কিন্তু সময়মতো ওষুধ নেই।

আরো গভীর ছবি পাওয়া যায় কালের কণ্ঠের ২০ সমস্যায় অচল স্বাস্থ্য খাত শিরোনামের প্রতিবেদনে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের আলোচনায় দুর্নীতি, সক্ষমতার ঘাটতি, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নিম্নমানের চিকিৎসাশিক্ষা, উপকরণের অভাব, ওষুধ ও সেবার অযৌক্তিক উচ্চমূল্য, পদশূন্যতা, বদলি-পদোন্নতি-প্রশিক্ষণের জটিলতা, ল্যাবের দুর্বলতা এবং দালালচক্রের হস্তক্ষেপের মতো সমস্যাগুলো উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি স্বাস্থ্য খাতে অনুমোদিত দুই লাখের বেশি পদের মধ্যে বড় একটি অংশ শূন্য। গ্রামীণ এলাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূন্যতার হার আরো বেশি। এই অবস্থায় শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করলে হবে না, মাঠ পর্যায়ে জনবল না দিলে মানুষ সেই বাজেটের সুফল পাবে না।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় অন্যায় হলো, যার টাকা আছে, সে তুলনামূলক ভালো চিকিৎসা পায়; আর গরিব মানুষ অনেক সময় চিকিৎসা না নিয়েই বাড়ি ফিরে যায়। শহরের বড় হাসপাতালে ভিড়, গ্রামে সেবা সংকট, নগর বস্তিতে স্বাস্থ্যসেবার অনিশ্চয়তাএসব আমাদের উন্নয়নের গল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। স্বাস্থ্য শুধু রোগ সারানোর বিষয় নয়, এটি ন্যায্যতার প্রশ্ন। একজন রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক, কৃষক, গৃহকর্মী কিংবা চরাঞ্চলের মাতাঁদের স্বাস্থ্য অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কালের কণ্ঠের ইতিবাচক ধারায় স্বাস্থ্য খাত : বাজেটে নতুন সম্ভাবনা শিরোনামটি তাই আশার জায়গা তৈরি করে। কিন্তু এই আশা বাস্তব হবে তখনই, যখন বাজেটকে কাগজ থেকে হাসপাতালের বিছানায়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে, ওষুধের তাক এবং রোগীর হাসিতে নামিয়ে আনা যাবে। আমাদের দরকার এমন স্বাস্থ্যনীতি, যেখানে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে ন্যূনতম চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও জরুরি সেবা নিশ্চিত থাকবে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ওষুধের ডিজিটাল হিসাব থাকবে। কোন যন্ত্র নষ্ট, কত দিন ধরে নষ্ট, কে দায়ীএসব তথ্য জনগণের জানার সুযোগ থাকতে হবে।

আরেকটি বড় কাজ হলো প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাএসব এখন ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে। অথচ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো অনেকটাই রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার দিকে বেশি ঝুঁকে আছে। স্কুলে স্বাস্থ্যশিক্ষা, এলাকায় রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং, পুষ্টিসচেতনতা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণএসবকে বাজেটের কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে।

সব শেষে স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার মানে শুধু মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম, গবেষক এবং সাধারণ মানুষসবাইকে যুক্ত করতে হবে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটি শুধু কাগজে থাকলে হবে না; সেখানে রোগীর প্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি ও স্থানীয় নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ দরকার। ভালো সেবার পুরস্কার এবং দুর্নীতি বা অবহেলার শাস্তিদুটিই দৃশ্যমান হতে হবে।

স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অঙ্ক আমাদের আশাবাদী করে, কিন্তু চোখ বন্ধ করে উচ্ছ্বাস করার সময় এখনো আসেনি, বরং এখনই সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়ার সময়। কারণ প্রতিটি টাকা যদি সঠিক জায়গায় না যায়, তাহলে বাজেট বড় হলেও মানুষের কষ্ট ছোট হবে না। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে মানবিক রাষ্ট্র বানাতে হলে স্বাস্থ্যকে দয়া নয়, অধিকার হিসেবে দেখতে হবে। বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত সংসদের কাগজে নয়, মাপা হবে গ্রামের হাসপাতালে শিশুর চিকিৎসা, মায়ের নিরাপদ প্রসব, বৃদ্ধের ওষুধ পাওয়া এবং দরিদ্র রোগীর সম্মানজনক সেবায়।

তবু হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বড় বড় সাফল্য দেখিয়েছেটিকাদান কর্মসূচি, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমানো, কমিউনিটি ক্লিনিকের বিস্তার, দুর্যোগের সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকাএসব আমাদের আশা দেখায়। তাই আজকের প্রয়োজন হলো সেই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়া। সরকার যদি স্বাস্থ্য বাজেটকে শুধু বরাদ্দের অঙ্ক হিসেবে না দেখে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে এই খাত সত্যি বদলে যেতে পারে।

এ জন্য সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত মাঠ পর্যায়ের সেবা শক্তিশালী করা। উপজেলা হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকে ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বড় শহরের হাসপাতালে চাপ কমাতে হলে গ্রামের মানুষকে গ্রামেই ভালো প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে। একই সঙ্গে যে পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য পড়ে আছে, সেগুলো দ্রুত পূরণ করা জরুরি। শুধু ভবন বানালেই স্বাস্থ্যসেবা হয় না, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো প্রশিক্ষিত জনবলই স্বাস্থ্যব্যবস্থার আসল প্রাণ।

দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। কোন হাসপাতালে কত টাকা বরাদ্দ হলো, কত ওষুধ কেনা হলো, কোন যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, কতজন রোগী সেবা পেলএসব তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা উচিত। এতে জনগণের আস্থা বাড়বে, অপচয় কমবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাজের মানও উন্নত হবে। সরকারি হাসপাতালের সেবা যদি সহজ, দ্রুত ও সম্মানজনক হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ বেসরকারি খাতে অতিরিক্ত খরচ করতে বাধ্য হবে না।

তৃতীয়ত, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে জাতীয় অগ্রাধিকার করতে হবে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ক্যান্সার, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং পুষ্টিহীনতাএসব রোগ ধীরে ধীরে পরিবারকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই স্কুল, কর্মস্থল, গ্রাম ও শহরের মহল্লাভিত্তিক স্বাস্থ্যসচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং সহজ পরামর্শসেবা চালু করা সময়ের দাবি। রোগ হওয়ার পর ব্যয়বহুল চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ সব সময় সস্তা, মানবিক এবং কার্যকর।

সব শেষে বলা যায়, স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার কোনো এক দিনের কাজ নয়, এটি একটি ধারাবাহিক জাতীয় অঙ্গীকার। সরকার, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষসবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে গরিব মানুষ চিকিৎসা খরচের জন্য হাসপাতালে যেতে ভয় পাবে না; যেখানে গ্রামের মা নিরাপদ প্রসবের নিশ্চয়তা পাবে; যেখানে বৃদ্ধ মানুষ নিয়মিত ওষুধ পাবে; যেখানে প্রতিটি নাগরিক সম্মানের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা পাবে। সরকারের হাতে এখন সুযোগ আছে বড় বাজেটকে বড় পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার। সঠিক পরিকল্পনা, সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আগামী দিনে আরো ন্যায়ভিত্তিক, শক্তিশালী ও মানবিক হয়ে উঠবেএই আশাই আমাদের এগিয়ে রাখুক।

 

লেখক : জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক

বিনিয়োগ : ভিয়েতনাম মডেল থেকে শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ

মাসুদ রুমী

বিনিয়োগ : ভিয়েতনাম মডেল থেকে শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে কয়েকটি দেশ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প রূপকথার মতো লিখেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান শক্তি ভিয়েতনাম তাদের অন্যতম। ব্যবসাবান্ধব শুল্কনীতি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সমন্বয়ে দেশটি গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের নতুন পাওয়ারহাউসে পরিণত হয়েছে। কয়েক দশকে তৈরি পোশাক ও জুতা শিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে ভিয়েতনাম এখন বিশ্বমানের টেক জায়ান্টদেরও প্রথম পছন্দের গন্তব্য। চীনের বিকল্প খুঁজতে থাকা স্যামসাং, অ্যাপল ও ফক্সকনের মতো কম্পানিগুলোর জন্য ভিয়েতনাম লালগালিচা বিছিয়ে দিয়েছে।

একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং ট্যাক্স হলিডের মতো আকর্ষণীয় প্রণোদনার মাধ্যমে দেশটি শত শত কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করেছে। এই বিনিয়োগের জোয়ারে স্থানীয় অবকাঠামো চাঙ্গা হয়েছে, লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং একসময়ের যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম উদাহরণে পরিণত হয়েছে।

১৯৮৬ সালের দোই মোই বা অর্থনৈতিক সংস্কার নীতির মাধ্যমে চরম দারিদ্র্যপীড়িত দেশটি এখন উচ্চ প্রযুক্তির ম্যানুফ্যাকচারিং ও চিপশিল্পের অন্যতম বৈশ্বিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে ভিয়েতনাম বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এফডিআই নিজেদের ঘরে তুলেছে, তা এককথায় বিস্ময়কর। এই সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও কৌশলগত দূরদর্শিতার ফসল।

বিনিয়োগ : ভিয়েতনাম মডেল থেকে শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশঅন্যদিকে প্রায় সমসাময়িক সময়ে অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করা এবং সস্তা শ্রমের বিশাল জনমিতিক লভ্যাংশ (পপুলেশন ডিভিডেন্ড) থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক উল্লম্ফন এবং বাংলাদেশের এই দীর্ঘস্থায়ী অনগ্রসরতা দুই দেশের নীতিমালার পার্থক্যকেই স্পষ্ট করে।

ভিয়েতনামের কৌশল : ভিয়েতনামের এই অভাবনীয় বিনিয়োগ সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও চতুর ভূ-রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কৌশল, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন প্লাস ওয়ান মডেল নামে পরিচিত। কোনো কম্পানি তাদের পণ্য উৎপাদনের জন্য শুধু চীনের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প হিসেবে অন্য অন্তত একটি দেশে কারখানা স্থাপন বা বিনিয়োগ করাকে চীন প্লাস ওয়ান মডেল বলে। গত এক দশকে বিশ্বের বড় বড় বহুজাতিক জায়ান্ট চীনের ওপর তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সম্পূর্ণ নির্ভরতা কমাতে বিকল্প গন্তব্য হয়ে ওঠে ভিয়েতনাম।

চীন ও ভিয়েতনামের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈরিতা ও সীমান্ত বিতর্ক থাকলেও ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে কখনো তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রভাবিত হতে দেয়নি। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছে, আবার একই সঙ্গে ওয়াশিংটন এবং ব্রাসেলসের সঙ্গেও নিজেদের বাণিজ্যের পরিধি বাড়িয়েছে। চীনের সরবরাহ শৃঙ্খল, কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ খুব সহজেই সড়ক ও রেলপথের মাধ্যমে ভিয়েতনামে চলে আসে। বাংলাদেশ এই সুবিধা নেওয়ার মতো বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ সামনে পেয়েও শুধু কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং সময়োপযোগী অবকাঠামোগত প্রস্তুতির অভাবে তা কাজে লাগাতে পারেনি।

ভিয়েতনামে চীনা পুঁজির মহীরুহ : ভিয়েতনামের মোট বিদেশি বিনিয়োগের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানে চীনা পুঁজির প্রভাব দিন দিন কতটা বাড়ছে। ২০২৫ সালে চীন ও হংকং থেকে ভিয়েতনামে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮.১৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে চীন ছিল ভিয়েতনামে তৃতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। আরো বিস্ময়কর হলো, ২০২৫ সালে ভিয়েতনামের মোট এফডিআইয়ের অর্ধেকেরও বেশি প্রায় ৫৬.৫ শতাংশ এসেছে প্রসেসিং ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে। ভিয়েতনামে চীনা বিনিয়োগের গুণগত মানেও এসেছে এক আমূল পরিবর্তন। সেখানে স্যামসাং, অ্যাপল ও ফক্সকনের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টরা ভিয়েতনামে তাদের বিশাল উৎপাদন লাইন গড়ে তুলেছে। অথচ স্যামসাং বাংলাদেশেও আসতে চেয়েছিল, কিন্তু জমিসংক্রান্ত জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক হয়রানির কারণে আমরা ধরে রাখতে পারিনি।

আমলাতান্ত্রিক ও আইনি সংস্কারের বিপ্লব : বিনিয়োগকারীরা শুধু একটি দেশের সস্তা শ্রমের দিকে তাকান না, তাঁরা দেখেন সেখানে ব্যবসা শুরু করার এবং তা টিকিয়ে রাখার প্রক্রিয়া কতটা সহজ ও গতিশীল। ভিয়েতনাম শুধু প্রাকৃতিক বা ভৌগোলিক সুবিধার ওপর ভরসা করে বসে থাকেনি। তারা বছরের পর বছর ধরে একের পর এক আমূল প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কার করেছে। বিশেষ করে তাদের নতুন অর্থনৈতিক ইশতেহার এবং বিশেষ রেজল্যুশনের মাধ্যমে তাদের বিনিয়োগনীতিকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে সবচেয়ে আধুনিক করে তোলা হয়েছে।

ভিয়েতনামে বিনিয়োগের লাইসেন্স পাওয়ার সময়সীমা অতীতে যেখানে ৩০ থেকে ৪৫ দিন ছিল, তা প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে নামিয়ে আনা হয়েছে মাত্র সাত থেকে ১৫ দিনে। আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো, উচ্চ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের মতো কৌশলগত খাতের জন্য তারা চালু করেছে সবুজ ঋণ, যা দ্রুত পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় দেশটি। এই ব্যবস্থার অধীনে কোনো বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান আবেদন করলে মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কিছু প্রাথমিক লাইসেন্স ও অনুমোদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়ে যায়।

একই সঙ্গে ভিয়েতনাম সরকার সম্প্রতি মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ১১টি বিশেষ রেজল্যুশনের মাধ্যমে ৫৬টি শর্তযুক্ত ব্যাবসায়িক খাত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেছে এবং প্রায় এক হাজার ৭৫৪টি ব্যাবসায়িক শর্ত বা নিয়ম-কানুন শিথিল করেছে। এর ফলে বেসরকারি খাত এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আইনি নিয়ম মানার পেছনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এক ধাক্কায় প্রায় ৫৪.৬ শতাংশ কমে গেছে।

উচ্চ প্রযুক্তির এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পের জন্য ভিয়েতনামের করকাঠামো অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তারা এ ধরনের শিল্পের ক্ষেত্রে চার বছর সম্পূর্ণ কর মওকুফ এবং পরবর্তী ৯ বছর অর্ধেক কর দেওয়ার নীতি অত্যন্ত কঠোরভাবে ও দীর্ঘ মেয়াদে বজায় রেখেছে। করের এই হার বা নীতি হুট করে কোনো বাজেটে পরিবর্তন করা হয় না, যা বিনিয়োগকারীদের ১০ বা ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ব্যাবসায়িক পরিকল্পনা সাজাতে দারুণভাবে সাহায্য করে।

মানবসম্পদ খাতের রূপান্তর : ভিয়েতনামের রূপান্তরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাদের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন। তারা বুঝতে পেরেছে, সস্তা ও অদক্ষ শ্রমিকের ওপর ভরসা করে থাকলে তারা চিরকাল নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েই থাকবে। তাই তারা তৈরি পোশাকের মতো কম মূল্য সংযোজনকারী খাত থেকে বেরিয়ে উচ্চ প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের দিকে ধাবিত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ হাজার থকে এক লাখ চিপ প্রকৌশলী তৈরির একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে দেশটির সরকার এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করেছে। বর্তমানে ভিয়েতনামের ৩৫টিরও বেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরাসরি সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ ডিজাইন নিয়ে কাজ করছে।

লজিস্টিকস ও অবকাঠামোর মানদণ্ড : ভিয়েতনামে তিনটি সচল মেগাপোর্টসহ (হাই ফং, ক্যাট লাই, কাই মেপ) মোট ৩৪টি বন্দর ও ৩২০টি টার্মিনাল রয়েছে। এগুলো সরাসরি বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনার মাদার ভেসেল বা জাহাজ নোঙর করতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে গভীরতার (ড্রাফট) সীমাবদ্ধতার কারণে বড় মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি ভিড়তে পারে না। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরটি চালু হলে এই সংকট অনেকটাই কেটে যাবে।

বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে (এলপিআই) ভিয়েতনামের অবস্থান বেশ ওপরের দিকে (র‌্যাংক ৪১)। তাদের সমন্বিত মাল্টিমোডাল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ অনেক কম। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০-এর কাছাকাছি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতির কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের কারণে পণ্য খালাসে সময় বেশি লাগে।

বাংলাদেশ বনাম ভিয়েতনাম : একটি দেশের অর্থনৈতিক গভীরতা বোঝা যায় তার বাণিজ্য ও বিনিয়োগের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বার্ষিক মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ যেখানে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ভিয়েতনাম ও চীনের মধ্যে বার্ষিক মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৫৬.৪ বিলিয়ন ডলার। আমদানির ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশ চীন থেকে প্রতিবছর প্রায় ২২.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে রয়েছে তুলা, সুতা, সিনথেটিক ফ্যাব্রিকস এবং ভারী যন্ত্রপাতি। কিন্তু চীনে রপ্তানি করতে পারে মাত্র ১.১৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রকট, যার পরিমাণ ২১.৬৪ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে ভিয়েতনাম চীন থেকে বিশাল অঙ্কের পণ্য আমদানি করলেও চীনে বার্ষিক প্রায় ৯৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। ভিয়েতনাম চীন থেকে পার্টস আমদানি করে নিজেদের কারখানায় হাই-টেক পণ্য তৈরি করে সেগুলো আবার বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরো বেশি বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের নিট এফডিআই ছিল মাত্র ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র এক বিলিয়ন ডলারে। অথচ ২০২৫ সালে ভিয়েতনামে মোট নিবন্ধিত এফডিআই ছিল ৩৮.৪২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ১৮.২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ভিয়েতনামের এফডিআই স্টক ২০২৪ সালে ছিল ২৪৯.১৪ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের চেয়ে ১৩ গুণের বেশি। বাংলাদেশের মাথাপিছু এফডিআই মাত্র ৯ ডলার, যেখানে ভিয়েতনামে তা ১৭৫ ডলার।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে যে সামান্য এফডিআই আসে, তার গুণগত মান অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশে মূলত তৈরি পোশাক বা টেলিকম খাতে আগে থেকে ব্যবসা করা বিদ্যমান বিদেশি কম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করাকেই মোট এফডিআই হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

আমাদের গলদ যেখানে : বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সস্তা শ্রমের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা এফডিআই আকর্ষণে ব্যর্থ, তার আসল সমস্যাগুলো কাঠামোগত।

প্রথমত, অবকাঠামো ও জ্বালানি। ভিয়েতনাম যেখানে বিনিয়োগকারীদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করেছে, সেখানে বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র হলো গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট। এতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। 

দ্বিতীয়ত, আমলাতন্ত্র। ভিয়েতনামে মাত্র সাত থেকে ১৫ দিনে লাইসেন্স দেওয়া হয়, অথচ বাংলাদেশে একটি লাইসেন্স পেতে মাসের পর মাস সময় লেগে যায়।

তৃতীয়ত, নীতিমালার ধারাবাহিকতার অভাব। ভিয়েতনামে ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য করনীতি অপরিবর্তিত থাকে, কিন্তু বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছর বাজেটে করের হার হুট করে বদলে যায়।

চতুর্থত, ডলার সংকট। বাংলাদেশে ডলার সংকটের সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা সহজে নিজেদের দেশে নিতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

পঞ্চমত, দক্ষ মানবসম্পদের অভাব। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা তাত্ত্বিক বিদ্যায় আটকে আছেন, অথচ ভিয়েতনামের শ্রম উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের এই বিনিয়োগ খরা দূর করার ক্ষেত্রে আশার আলো সঞ্চার করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর। গত ২৬ জুনে বেইজিংয়ে এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে চীনের ১২টি শীর্ষস্থানীয় মেগাকম্পানি বাংলাদেশে রেকর্ড ৯.২১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিনিয়োগের প্রস্তাব পেশ করেছে। চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং মোংলা ও চট্টগ্রামে চীনা বিনিয়োগের জন্য বিশেষ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এখন প্রয়োজন এই বিপুল বিনিয়োগের প্রস্তাবকে আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্যমুক্ত রেখে দ্রুত বাস্তবে রূপদান করা। ভিয়েতনামের সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ যদি তার নীতিগত ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোগত নিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক গতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে, তবেই শুধু এই বিপুল সম্ভাবনাকে সার্থক করা সম্ভব হবে। অন্যথায় রূপকথার গল্পগুলো শুধু ভিয়েতনামেরই থাকবে, আমরা শুধু দূর থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলব।

লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক

উত্তপ্ত পৃথিবী বিপন্ন পরিবেশ

ড. কানন পুরকায়স্থ

উত্তপ্ত পৃথিবী বিপন্ন পরিবেশ

অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার অর্থ পৃথিবীর পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। এ অবস্থায় সাগরে পানির ঘনত্বের পরিবর্তন হয়। তা ছাড়া গলে যাওয়া বরফ ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে মেরু অঞ্চলে সাগরের পানির লবণাক্ততা হ্রাস পায় এবং সাগর পৃষ্ঠের পানি হালকা হয়ে যায়। এরই প্রভাবে আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন (এএমওসি)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র স্রোতগুলোর গতি কমে যায়। মহাসাগরীয় স্রোতগুলো বিশ্বব্যাপী এক ধরনের পরিবাহক বেল্ট হিসেবে কাজ করে এবং বিপুল পরিমাণে সৌরতাপ বিষুবরেখা থেকে মেরুর দিকে নিয়ে যায়। যখন এএমওসির গতি কমে যায়, থেমে যায় বা ব্যাহত হয়, তখন স্থানীয়ভাবে তাপ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ‘সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ’ সৃষ্টি হয়। এই দীর্ঘস্থায়ী চরম তাপমাত্রা বাস্তুতন্ত্রকে ব্যাহত করে এবং ভূমিতে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণ হয় ।

বর্তমানে যুক্তরাজ্য একটি চরম তাপপ্রবাহের মুখোমুখি। লেখক বিল ম্যাকগুয়ার তাঁর ‘দি ফ্যাট অব দি ওয়ার্ল্ড : আ হিস্টোরি অ্যান্ড ফিউচার অব দি ক্লাইমেট ক্রাইসিস’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে ‘যুক্তরাজ্যের তাপমাত্রা উত্তপ্ত পৃথিবী বিপন্ন পরিবেশএ বছর এবং/অথবা পরের বছর চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে।’ ম্যাকগুয়ার আরো বলেন, ‘বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরে রেকর্ড পরিমাণে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হওয়ার কারণে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি পর্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা সম্ভব।’ ‘এল নিনো’ হলো প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়ার ধরন, যা বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ায় এবং সম্ভবত এই গ্রীষ্মে এটি আবির্ভূত হবে। প্রকৃতপক্ষে এই সপ্তাহে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কিছু অংশে তাপমাত্রা আটত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। ইংল্যান্ডের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এবং ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের দক্ষিণ-পশ্চিমের কিছু অংশের জন্য অতি তাপপ্রবাহের অ্যাম্বার সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে।

অ্যাডভান্সেস ইন ক্লাইমেট চেঞ্জ রিসার্চ-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে এশিয়ার পামির পর্বতমালাজুড়ে অভূতপূর্ব হারে বরফ কমে যাওয়া লক্ষ করা গেছে। ২০২২-এর আগে হিমবাহের কিছুটা ওঠানামা দেখা গিয়েছিল, কিন্তু তার পর থেকে বরফের ক্ষয় দ্রুত হয়েছে। গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে ২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ বরফ গলে, যা হিমবাহের পুরো পৃষ্ঠের ১.৫ মিটার পানি হারানোর সমতুল্য। এটি ২০১১-২৪-এর সময়কালে হিমবাহের গড় ক্ষয়ের চেয়ে চার গুণ বেশি। গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে পামির-কারাকোরাম অঞ্চলের হিমবাহের ক্ষয়, বিশ্বব্যাপী বরফ গলার প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং চরম ঘটনাগুলো সম্ভবত সেখানে হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করছে।

তাপপ্রবাহ ও গ্রিনহাউস গ্যাসের মধ্যে একটি দুষ্টচক্র রয়েছে। তাপপ্রবাহ দাবানলের কারণ হতে পারে। সুমেরু অঞ্চলে গাছপালা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু তাদের অবশিষ্টাংশ পিটের মতো আকারে মাটিতে জমা হতে পারে, যা সহস্রাব্দ ধরে জমা হতে থাকে। এর অর্থ হলো, সুমেরু অঞ্চল এবং কাছাকাছি উত্তর গোলার্ধের বনের মাটি কার্বনের আধার হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে সুমেরু অঞ্চলে আগুনের ঘটনা আরো ঘন ঘন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির পৃষ্ঠের উদ্ভিদের দ্রুত জ্বলন কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে শুট বা ব্ল্যাক কার্বনের নির্গমন ঘটাচ্ছে। হেলসিংকিভিত্তিক ফিনিশ মেটেরোলজিকাল ইনস্টিটিউট উল্লেখ করেছে যে ‘মাটির দহন দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত কার্বনকে এমন মাটি থেকে মুক্ত করতে পারে, যা আগে কার্বনের আধার হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।’ এটা স্পষ্ট যে বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং তাপপ্রবাহের কারণে আমরা নতুন অগ্নিকাণ্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যা ওপরের মাটির স্তরগুলোকে ধ্বংস করছে এবং পিটল্যান্ডগুলোকেও পুড়িয়ে ফেলছে এবং মাটি থেকে পুরনো কার্বন নির্গত হচ্ছে।

সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে বনের আগুন কার্বন মনোক্সাইড নির্গত করতে পারে, তবে এটি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার থেকেও নির্গত হতে পারে। এই যৌগ ও বিভিন্ন অস্থায়ী জৈব যৌগগুলো বায়ুমণ্ডলে অন্যান্য যৌগের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ওজোন গঠন করে। এই ওজোন ওপরের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ওজোনের মতো নয়। ঊর্ধ্ব স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ওজোন ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি ফিল্টার করে, যেখানে নিম্ন বায়ুমণ্ডলে গঠিত ওজোন তাপকে আটকে রাখে, যা অন্যথায় মহাকাশে বিকিরিত হবে। পরোক্ষ গ্রিনহাউস গ্যাসগুলো হাইড্রক্সিল মুক্ত মূলকের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে গ্রহকে উষ্ণ করে। উদাহরণস্বরূপ যদি আরো বেশি হাইড্রক্সিল কার্বন মনোক্সাইড এবং উদ্বায়ী জৈব যৌগের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, তাহলে মিথেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করার জন্য কম হাইড্রক্সিল পাওয়া যাবে। এর অর্থ বায়ুমণ্ডলে আরো মিথেন থাকবে, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে আশি গুণ বেশি তাপ আটকে রাখতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো, পৃথিবী কী পরিমাণ আলো প্রতিফলিত করে এবং তার প্রতিফলনের প্রকৃতি, তার সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা জড়িত। আমরা জানি যে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের প্রতিফলন ক্ষমতা বা অ্যালবেডো প্রায় সমান, যেখানে অ্যালবেডো হলো কোনো পৃষ্ঠ দ্বারা কী পরিমাণ আলো, বিশেষত সৌর বিকিরণ, প্রতিফলিত হয় তার পরিমাপ। এর মানে হলো আফ্রিকা, ইউরোপ, আলাস্কা এবং উভয় মেরুর মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি রেখা পৃথিবীকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে, যা সমান পরিমাণ আলো প্রতিফলিত করে। কিন্তু ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) দ্বারা পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে সাতাশ ডিগ্রি পূর্ব এবং এক শ তিপ্পান্ন ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমা রেখা বরাবর একটি দ্বিতীয় প্রতিসাম্য রেখা রয়েছে। নেচার জার্নালে প্রকাশিত এনওএএ-এর গবেষণা আমাদের জানিয়েছে যে এই দ্বিতীয় রেখা দ্বারা বিভক্ত গোলার্ধগুলো তিনটি ক্ষেত্রে সমান : মেঘমুক্ত আকাশে তাদের অ্যালবেডো, মেঘের প্রতিফলন ক্ষমতা এবং বরফমুক্ত মহাসাগর দ্বারা আবৃত অংশের পরিমাণ। অসলোর আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণাকেন্দ্রের গবেষকরা মনে করেন যে এটি সম্ভবত ‘একটি সুদৃঢ় বৈশিষ্ট্য এবং পৃথিবীর আরেকটি আকর্ষণীয় ধর্ম’। এই প্রতিসাম্য বিষয়টি পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

ভবিষ্যৎ এএমওসির পরিণতি নিয়ে জলবায়ু মডেলগুলোতে ব্যাপক অনিশ্চয়তা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্ত সরকারি প্যানেল (আইপিসিসি) তার ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলেছে যে যদিও তারা নিশ্চিত যে এই শতাব্দীর বাকি সময়ের মধ্যে এএমওসির অবক্ষয় ঘটবে, তবে ২১০০ সালের আগে এটি ভেঙে পড়বে না—এ বিষয়ে তাদের ‘মাঝারি আস্থা’ রয়েছে। জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স জার্নালে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে যদি এএমওসি ভেঙে পড়ে, তাহলে লন্ডনে চরম ঠাণ্ডা অর্থাৎ মাইনাস কুড়ি ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং অসলোতে মাইনাস আটচল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এএমওসির যেকোনো দুর্বলতা এই ব্যবস্থাটিকে একটি অজানা সংকটময় সীমা অতিক্রম করানোর ঝুঁকি তৈরি করে। এই সীমাটি কোথায় অবস্থিত তা জানা কঠিন। এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটার্স-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে উচ্চ নির্গমনের ক্ষেত্রে ৬৭ শতাংশ এবং মাঝারি নির্গমনের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ এলাকায় AMOC বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবাহ কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা রয়েছে। এএমওসির আচরণ বোঝার জন্য মডেলে এখনো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা বাকি থাকতে পারে।

সংক্ষেপে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কাকে দোষ দেওয়া যায় তা খোঁজার পরিবর্তে প্রকৃতিতে কী ঘটছে এবং কেন ঘটছে তা জানা প্রয়োজন। এটি আমাদের বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে কিছু যুক্তিসংগত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। তাই আমাদের ঈশপের এই উপদেশটি গ্রহণ করা উচিত, ‘ঝাঁপ দেওয়ার আগে দেখে নাও।’ অর্থাৎ জলবায়ু সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আড়ে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ জরুরি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

ও অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য

ক্ষমাও কখনো বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দেয়

কাজী হাফিজ

ক্ষমাও কখনো বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দেয়

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার গত ২৪ জুন সংসদে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। এটি ইতিবাচক। কিন্তু প্রতিশোধ না নেওয়া মানে বিচারহীনতা নয়। আমরা চাই, এক-এগারোর সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর যে নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে, এ ঘটনায় জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক এবং এ ঘটনার আমি বিচার দাবি করছি।’ তিনি এই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন যে এর বিচার না হলে পরবর্তী সময়ে এমন ঘটনা আরো ঘটতে পারে।

এর আগে গত ১৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে জানান, ওই সময় শারীরিকভাবে নির্যাতনের কারণে তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। সঠিক সময়ে  চিকিৎসা না পাওয়ায় এখনো এক্স-রে করলে হয়তো দেখা যাবে ওই হাড় বাঁকাভাবে জোড়া লেগে আছে।

ক্ষমাও কখনো বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দেয় তারেক রহমান আরো জানান, যারা এর জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সম্ভব। কিন্তু  তাতে তাঁর শারীরিক সমস্যা তো দূর হবে না। তিনি প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করার কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই মনোভাব প্রকাশকে অনেকে নির্যাতনকারীদের ক্ষমা করার উদারতা হিসেবেও দেখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি এড়ানো  যাবে না যে মৃত্যু হতে পারে এমন  নির্যাতনের অপরাধ কি ভুক্তভোগীর ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমেই বিচারহীন থেকে যাবে? তা ছাড়া বিষয়টি দেশে আইনের শাসনের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ব্যক্তি পর্যায়ে ক্ষমা মহৎ গুণ হলেও বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে অপরাধীরা দায়মুক্তি পেলে তা সমাজ ও আইনের শাসনকে দুর্বল করে। কোনো অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি না করে ছেড়ে দেওয়া একধরনের বিচারহীনতা।

২০০৭ সালের ৭ মার্চ বিনা অভিযোগে তারেক রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন মা বেগম খালেদা জিয়ার অঝোর কান্না আর প্রতিবাদ উপেক্ষিত হয়। এরপর চলে নির্মম নির্যাতন। একজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ওপর এ ধরনের নির্যাতন নজিরবিহীন। তারেক রহমানকে বারবার চাপ দেওয়া হয়েছিল রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার জন্য। রাজি না হওয়ায় তাঁর ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। প্রায় এক ডজন সাজানো মামলা দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ২৮ নভেম্বর আদালতের কাঠগড়ায় তিনি তাঁর ওপর অমানবিক নিপীড়নের বিবরণ তুলে ধরেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘শারীরিকভাবে এতটাই নির্যাতনের শিকার হয়েছি যে এখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছি না। চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে আমাকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা মোটা কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে নির্জন স্থানে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে আমাকে।’

সম্প্রতি প্রকাশিত বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ আলমগীর পাভেল ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজের সম্পাদিত ‘তারেক রহমান : সংগ্রাম ও রাজনৈতিক যাত্রা’ নামের বইয়ে তারেক রহমানের ওপর এই নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।   

তারেক রহমান ১২টি মামলায় জামিন পাওয়ার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কারামুক্ত হন। ১১  সেপ্টেম্বর তাঁকে স্ট্রেচারে করে লন্ডনগামী বিমানে তুলে দেওয়া হয়। তার আগে ওই দিনই বেগম খালেদা জিয়া কারামুক্ত হয়ে পিজি হাসপাতালে অসুস্থ পুত্রের সঙ্গে দেখা করেন। সেদিন মা ও ছেলের বেদনার্ত সাক্ষাতের সচিত্র খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়।

নির্যাতনে কতটা অমানবিক হওয়ার পর তারেক রহমানকে কারাগার থেকে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল তা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক কাজী মাজহারুল ইসলামের দোলনের একটি লেখা থেকে জানা যায়। গত ২৫ ডিসেম্বর একটি পত্রিকায় প্রকাশিত ওই লেখায় তিনি উল্লেখ করেন,  ‘তারেক রহমানকে যখন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (আগের পিজি হাসপাতাল) নিয়ে আসা হয়, তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। এসেছিলেন সাংঘাতিক কোমর ব্যথা নিয়ে। বাঁ পায়ে ভর দিতে পারছিলেন না। ভর্তি না করিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু হাসপাতালে আসার পর এক্স-রে করলাম। তাতে দেখা যায়,  মেরুদণ্ডে যে ১২টি ভার্টিকুলার থাকে তার মধ্যে ৮-৯-এর মাঝের স্পেস কমে গেছে। যে কারণে এমআরআই করিয়ে পরিষ্কার দেখা গেল ইন্টার ভার্টিব্রাল ডিস্ক চেপে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো ডিস্কে এই সমস্যা কেন হয়? অনেক ভারী জিনিস তুললে, দুর্ঘটনায় বা ওপর থেকে পড়ে গেলে এমন হতে পারে। তখন উনি (তারেক রহমান) বলেছিলেন, প্রায় ১৫ ফুট ওপর থেকে পড়ে গেছেন। উনি তো আর নিজে নিজে পড়েননি। উনাকে হয়তো বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল, সেখান থেকে হয়তো পড়ে গেছেন বা ফেলে দিয়েছে। সেইভাবে তিনি আঘাত পেয়েছেন। তখন তো ওই পরিবেশে তিনি আমাদেরও খোলামেলা কিছু বলেননি।’

তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন কারা চালিয়েছিল, তাদের নাম-পরিচয় সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে  ‘সাম্প্রতিক অনুসন্ধান’ সূত্রে জানানো হয়। এতে কারো কারো ধারণা, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে এবং দায়ি ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হবে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এই সম্ভাবনার স্পষ্ট কোনো স্বীকৃতি এখনো নেই। 

ব্যক্তি পর্যায়ে ছাড়াও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের ক্ষমা করার বিষয়টিও অনেকাংশে বিচারহীনতা বলে অনেকে মনে করেন। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে দণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষমা করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির রয়েছে এবং এই ক্ষমতা অবাধ। ৪৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এই বিধান রাখা হয়েছে ভুল বিচারে কেউ শাস্তি পেলে বা অত্যন্ত মানবিক কারণে ক্ষমা করার জন্য। তবে কে, কিসের ভিত্তিতে ক্ষমা পাবে, তার কোনো নীতিমালা নেই; যা সংবিধানের ৭, ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও সরকারের পক্ষে এই ক্ষমতা প্রয়োগের বিধান রয়েছে।

দেশের স্বাধীনতার পর ২০১৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫ জন আসামি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পায়। এর মধ্যে ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার আমলেই ক্ষমা পায় ২১ জন। ২০০৯ সালে একজন, ২০১০ সালে ১৮ জন এবং ২০১১ সালে দুজন ফাঁসির আসামি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পান। ওই ২১ জনের মধ্যে ছিল লক্ষ্মীপুরের বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড পাওয়া আসামি এইচ এম বিপ্লব। বিপ্লব লক্ষ্মীপুর  পৌরসভার  সাবেক  মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু তাহেরের ছেলে। ২০১১ সালের ১৪ জুলাই বিপ্লবের সাজা মওকুফের আদেশ কার্যকর হয়।

২০০৯ সালের আগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা পাওয়া ফাঁসির আসামির সংখ্যা ছিল চারজন। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে ক্ষমা করা হয়নি। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়ে এই ক্ষমার চর্চা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজউদ্দিন আহমেদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এক আসামিকে ১৯৮৭ সালে ক্ষমা করা হয়।

২০১৩ সালের মার্চে নবম সংসদের পঞ্চদশ অধিবেশনের প্রথম দিন লিখিত এক প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর রাষ্ট্রপতির ক্ষমার এই তথ্য জানিয়েছিলেন। পরেও এভাবে ক্ষমা করার ঘটনা অব্যাহত থাকে।  সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই হারিছ ও জোসেফ দুটি খুনের মামলায় যথাক্রমে যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। তাঁদের আরেক ভাই আনিস আহমেদ একটি খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ হারিছ ও আনিসের সাজা মওকুফ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর জোসেফের সাজা মাফ করেন রাষ্ট্রপতি।

আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতদের দণ্ড মওকুফ করে সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে নামিয়ে আনার অধিকার সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির থাকলেও তার প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা অনেক পুরনো। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। রিটে কোনো নীতিমালা ছাড়া সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার ক্ষমতা কেন অসাংবিধানিক হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির নির্দেশনা চাওয়া হয়। 

জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতা রোধে বোর্ড গঠনের সুপারিশ করে। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (আওয়ামী লীগ সরকার আমলে) সরকার যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে তা সর্বজনবিদিত। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারকাজ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়েছে। একই অপরাধীকে দুবার ক্ষমা প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। ক্ষমা প্রদর্শনের এই ঘটনাগুলো আমাদের দেশের আইনের শাসনের ধারণাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’

কমিশন ‘ক্ষমা প্রদর্শন আইন’ নামে একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়ে বলে, এই আইনের মাধ্যমে একটি ‘ক্ষমা প্রদর্শন বোর্ড’ গঠিত হবে। বোর্ডের সদস্য থাকবেন অ্যাটর্নি জেনারেল, জাতীয় সংসদের সরকার ও বিরোধী দলের দুজন সংসদ সদস্য, একজন সিভিল সার্জন এবং একজন মনোবিদ। এই  বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি বা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী বিভাগ ক্ষমা প্রদর্শন করবেন।

গত বছরের শেষ দিকে রাষ্ট্রের সংস্কার বিষয়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায়ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সম্পর্কিত বিধান পরিবর্তনে ঐকমত্যে পৌঁছায় রাজনৈতিক দলগুলো। এখন অপেক্ষা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের। অপেক্ষা তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনকারীদের বিচারের সম্মুখীন করার।

 

লেখক : কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক

শিক্ষকের মর্যাদা ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক | কালের কণ্ঠ