kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

আরেকটি উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রস্তুতি

ফরিদুল আলম

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আরেকটি উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রস্তুতি

যুদ্ধ যেন মধ্যপ্রাচ্যের পিছু ছাড়ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পর এবার পেন্টাগন জানিয়েছে, তাদের আরেকটি যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস অরলিংটন যাচ্ছে উপসাগরে আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে যোগ দিতে। ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা রয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে ইরানের ধাতবশিল্পের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যা তেলের পর তাদের সর্ববৃহৎ রপ্তানি খাত। এই পদক্ষেপের ফলে ইরানের লোহা, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং কপারশিল্পেও ব্যাপক প্রভাব পড়বে। হঠাৎ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এমন বিক্ষুব্ধ আচরণে অনেকটা বিস্মিত তার মিত্ররাও। প্রায় দুই বছর আলোচনার পর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভিয়েতনামে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির যে পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেটির অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান কিন্তু সে কথা বলছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর গত বছরের ৮ মে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত ছয় জাতি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়, যা ট্রাম্পের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম একটি বিষয় ছিল। ২০১৬ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার শুরু হয়, তার মাত্র কয়েক মাস আগে যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা-ও আবার যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য পাঁচটি রাষ্ট্রের মধ্যস্থতায়, তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগাম ঘোষণায় তখন থেকেই ট্রাম্পের মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের প্রকাশ দেখা যায়। মূলত ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মেয়াদের একটি অন্যতম সাফল্যকে ভিন্ন খাতে তুলে ধরার একটি অজুহাত খোঁজা হয় তখন থেকেই। আর গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে অপরাপর পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ব্যতিরেকেই ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি সুযোগ হিসেবে মনে করা হয়। আসলে এর মধ্য দিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ডাব্লিউ বুশ-পরবর্তী একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছেন বলেই মনে করা যেতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এহেন পদক্ষেপে ইরানের পক্ষ থেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক এক বছর পর গত ৮ মে ইরান আংশিকভাবে চুক্তি বাতিল না করলেও নিজেকে সেখান থেকে কিছুটা বের করে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। সেই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ শুরু করেছে বলে অভিযুক্ত করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। বিশ্বের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। চীন সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছে, ইরানের তেলসম্পদের লাগাম টেনে ধরার প্রচেষ্টা করা হলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এহেন আকস্মিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইরানের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ও সিরিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি একটি অন্যতম কারণ হতে পারে এবং পশ্চিমাদের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের নিজ দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার এটি একটি কারণ বলে মনে করা হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের অন্যতম সফল পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ, যিনি ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির সম্পাদিত চুক্তির অন্যতম ক্রীড়নক ছিলেন, তাঁর পদত্যাগ—তখন থেকেই নতুন একটি সংকটের আগাম পূর্বাভাস দিতে থাকে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং তৎপরবর্তী সময়ে ইরানের সঙ্গে তাদের অন্যতম মিত্র বাশার আল আসাদের অব্যাহত যোগাযোগ বৃদ্ধি জাভেদ জারিফের কূটনৈতিক সফলতাকে অনেকটা ম্লান করে দিয়েছে বলেই তাঁর এই পদত্যাগ—এমনটা মনে করা হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির সঙ্গে বাশার আল আসাদের বৈঠকটি জারিফের জন্য চূড়ান্ত বিব্রতকর ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা না হলেও এটি তাদের প্রতি ইরানের পক্ষ থেকে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসেবে মনে করা হতে পারে।

তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে বর্তমান সময়ে ইরানের তরফ থেকে যে ধরনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এক ধরনের উসকানি, যা তাদের নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে উপস্থিতিকে একটি যুক্তির আওতায় আনার চেষ্টা। আগেই উল্লেখ করেছি যে সম্পাদিত চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের লাভ-ক্ষতির আলোকে নয়, বরং নতুন করে পারমাণবিক হুমকি থেকে বিশ্বকে মুক্ত রাখতে ছয় জাতির একটি দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ফসল। ট্রাম্প অনেকটা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কৌশল নির্ধারণ এবং নতুন করে যুদ্ধ সংঘটনের মাধ্যমে ডাব্লিউ বুশের মতো তাঁর মেয়াদকালকে দ্বিতীয় দফায় টেনে নিতে যে হীন নীতির আশ্রয় নিয়েছেন, তা ইরানের জন্য নতুন করে রক্ষাকবচ অন্বেষণে অনেকটা বাধ্য করেছে। চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অব্যাহতভাবে ইরানের প্রতি যেসব উসকানি প্রদর্শন করা হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা। ওই নিষেধাজ্ঞায় ১২টি কম্পানি এবং ইরান ও চীনের ১৩ জন ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে মার্কিন অর্থ বিভাগ। নিষেধাজ্ঞার এই তালিকায় রয়েছে ইরানের রিপাবলিকান গার্ডের সদস্যরাও। লেবানন ও চীনের সঙ্গে ইরানের অস্ত্র সংগ্রহ কার্যক্রম ব্যাহত করাই ছিল এই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য। ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য মার্কিন হুমকি কী হতে পারে, সেটি ভেবেই তার আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ সমীচীন বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের পক্ষ থেকে এবং সেই সঙ্গে তাদের সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা মোকাবেলায় যথোপযুক্ত জবাব দেওয়ার কথা জানানো হয়। এই লক্ষ্যে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করে, পরীক্ষা চালায় নতুন কিছু মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের। এর মধ্যে এমন কিছু রয়েছে, যা দুই হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে, যার মূল লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় এলাকার মার্কিন ঘাঁটি। ইরানের এ ধরনের তৎপরতাকেই যুক্তরাষ্ট্র আসলে প্রচার করতে চাইছে যে তারা বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদে উসকানি দিচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে তারা আবারও নতুন করে আরেকটি উপসাগরীয় যুদ্ধের পরিকল্পনা আঁটছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেছেন যে তাঁরা যুদ্ধ চান না, বরং সেখানে উপস্থিত মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের পক্ষ থেকে কোনো হামলা করা হলে তার নির্মম জবাব দেওয়ার জন্যই এটি একটি বার্তা। উল্লেখ্য, বর্তমানে ইরাকে প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন সেনার উপস্থিতি রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের পরিস্থিতি কিন্তু এ কথা বলে না যে ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন সেনাদের কোনো ধরনের হুমকি প্রদান করা হয়েছে। যদিও অপরাপর পাঁচটি শক্তি এখন পর্যন্ত এই চুক্তি বজায় রেখেছে এবং তারা প্রয়োজনে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ারই পক্ষপাতী। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, তারাও যেন এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় এবং ইরানের তেল রপ্তানি খাতে অচলাবস্থা বিরাজ করুক, যা তাদের ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতিকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। সার্বিক পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে এখন অনেকটা অস্থির মনে হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উত্তপ্ত করতে না পারায়, যেমনটা একসময় ডাব্লিউ বুশ করতে পেরেছিলেন। রাশিয়া আজ নতুন করে গর্জন তুলছে, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে তাচ্ছিল্য করে নতুন এক চৈনিক পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলছে ক্রমাগত, ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধুচন্দ্রিমা যে অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে, সেখানে এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের ক্রমেই বাড়তে থাকা নৈকট্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষ বার্তাবহ। এটি আসলে ট্রাম্পের দুর্ভাগ্য যে তিনি এর কোনো বার্তাই পড়তে পারছেন না।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য