kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বাংলাদেশ গণতন্ত্র থেকে কত দূরে

ড. খুরশিদ আলম   

১ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে কি না এ বিষয়ে গত দুই বছরে অনেক বিতর্ক হয়েছে। এ বিষয়ে বিতর্ক আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। ১৯৯০ সাল থেকে যতবারই দেশে নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়েছে ততবারই এ বিষয় নিয়ে নানা কথা হয়েছে। বিতর্ককারীরা সবাই সরকারগুলোকে নির্বাচিত বলেছেন, কিন্তু অনেকে সেসব সরকারকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সরকার বলেননি।

বিজ্ঞাপন

তাঁদের যুক্তি ছিল, নির্বাচিত হলেই গণতান্ত্রিক সরকার হয় না। কারণ নির্বাচিত হলেও শাসনব্যবস্থায় তেমন কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু আবার পাল্টা প্রশ্ন আসত যে যদি নির্বাচিত না হতো, তাহলে কি আরো ভালো কিছু হতো? এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত ছিলেন যে অনির্বাচিত ও অগণতান্ত্রিক সরকার দেশের জন্য ভালো নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ গণতন্ত্র থেকে কত দূরে? বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য থেকে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে, আবার নেইও। যাঁরা গণতন্ত্র নেই মনে করেন, তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সবার অংশগ্রহণে হয়নি। সুতরাং দেশে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে উল্লেখ করা দরকার, জন স্টুয়ার্ট মিলসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দার্শনিক নির্বাচিত সরকারকে উত্তম সরকার বলে মনে করেছেন বা মন্দের ভালো বলেছেন; কিন্তু কেউই তাকে শ্রেষ্ঠ সরকার পদ্ধতি বলে মনে করেননি। কারণ নির্বাচিত সরকার হলেও তা গণতান্ত্রিক সরকার নাও হতে পারে। তাই বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশের নির্বাচিত সরকারকে বিভিন্নজন 'নির্বাচিত স্বৈরসরকার' বলেও অভিহিত করেছেন, যদিও সেসব সরকার যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছিল। এ কথা মনে রাখতে হবে যে নির্বাচন হচ্ছে একটি সরকার গণতান্ত্রিক কি না তা যাচাই করার একটি অন্যতম মাপকাঠি। যদিও তা একমাত্র মাপকাঠি নয়। এর বাইরেও আরো অনেক মাপকাঠি রয়েছে, যেমন- মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণভাবে সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং এর মাধ্যমে জনগণকে সমীহ করা। একটি দেশে গণতান্ত্রিক সরকার তখনই হবে যখন সে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেবে ও জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে।

আব্রাহাম লিংকনের বিখ্যাত একটি উক্তি রয়েছে, 'গণতন্ত্র হচ্ছে এমনই এক ধরনের সরকার, যা জনগণের ও জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্যই তৈরি। ' বিষয়টি অনেক সময় এমন দাঁড়ায় যে জনগণের দ্বারা তৈরি সরকার জনগণের সরকার হতে পারে আবার নাও হতে পারে। যেমনটা বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে। আবার কিছু দেশে দেখা যায়, গণতান্ত্রিক সরকার বলতে ওই সরকারকে বোঝানো হয়, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন হবে সংখ্যালঘিষ্ঠের সম্মতি সাপেক্ষে, যা বাংলাদেশে কোনো নির্বাচিত সরকারের আমলে দেখা যায়নি। এটি চর্চা করা দরকার, তা কতজন উপলব্ধি করেন সে বিষয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। কোনো সরকারই সবাইকে খুশি করতে পারে না, কারণ কোনো নীতি দেশের বা দলের সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে- এমনটা আশা করা যায় না।

বর্তমান সরকারের একটি দুর্বলতা হলো এই যে এটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত নয় বা হতে দেওয়া হয়নি। তাই এ সরকার কেবল জনগণকেই সমীহ করে, কারণ সরকারকে যদি কেউ এ মুহূর্তে পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে তা কেবল জনগণই রাখে। এটি বর্তমান সরকার খুব ভালোভাবে বুঝেছে। সে কারণে কোনো একটি সংকট দেখা দিলে প্রায়ই সরকার সে সংকট নিরসনের জন্য খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এমনকি বৃহত্তর বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য সরকার সবচেয়ে তেতো কাজটিও করেছে, যা এই সরকারের অনেক রাজনৈতিক কৃষ্টির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যেমন খালেদা জিয়াকে ফোন করা, কোকোর মৃত্যুর পর তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তাঁর অফিসের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত যাওয়া ইত্যাদি।

বর্তমান সরকারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে বলা যায়, অতীতের যেকোনো সরকারের চেয়ে এ সরকার জনগণকে অনেক বেশি সমীহ করে। এমনকি অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারগুলো (১৯৯৬-২০০১ ও ২০০৯-১৩) জনগণকে এতটা সমীহ করেনি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লিমন বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরের মামলার রায়ে জন-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। একইভাবে সমুদ্রপথে মানবপাচারের বিষয়ে সরকার কঠোর মনোভাব পোষণ করেছে এবং পাচার বন্ধে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। দেশে বিভিন্ন প্রকারের সন্ত্রাসবাদীকে দমন করা কিংবা অনেক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া, বিতর্কিত ব্যক্তিদের অনেককে এবারকার মন্ত্রিসভায় স্থান না দেওয়া কিংবা নির্বাচনে মনোনয়ন না দেওয়ার বিষয়টি জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সরকার শ্রদ্ধাশীল বলেই প্রমাণ করে।

সরকার জানে, জনগণ যদি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে তাহলে সরকারের পরিবর্তন হতে পারে, অন্যভাবে হওয়ার তেমন কোনো দৃশ্যমান কারণ নেই। এ অর্থে বাংলাদেশে অতীতের কোনো সরকার জনগণকে এতটা সমীহ করেনি, যা বর্তমান সরকার করছে। আর জনগণকে সমীহ করা হচ্ছে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি, যা কমবেশি এ সরকার করছে। যত দিন এ সরকার এ ধারাকে ধরে রাখতে পারবে, তত দিন তার বিপদ হওয়ার কথা নয়। দেখা যাক সরকার কত দিন চোখ-কান খোলা রাখে। কারণ সরকারকে মনে রাখতে হবে, অন্ধ হলে তো আর প্রলয় বন্ধ থাকবে না।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব

সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট



সাতদিনের সেরা