kalerkantho

সোমবার । ৫ আশ্বিন ১৪২৮। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১২ সফর ১৪৪৩

বই আলোচনা

‘বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানের দর্শনচিন্তা’ প্রসঙ্গে

কুমার প্রীতীশ বল   

১৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানের দর্শনচিন্তা’ প্রসঙ্গে

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি মুসলিম দার্শনিকদের পদচারণ মধ্যযুগ থেকে শুরু বলা যায়। সে সময়ের পুঁথি-সাহিত্যে দর্শনচিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। ‘বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানের দর্শনচিন্তা’ গ্রন্থের অবতরণিকায়ই লেখক ড. মো. আনিসুজ্জামান এর উল্লেখ করেছেন। ‘মধ্যযুগে বাংলার সুফিশাস্ত্রের গ্রন্থগুলোতে জীবন জিজ্ঞাসা, নৈতিকতা, সমাজে মানুষের অবস্থান ইত্যাদি দার্শনিক প্রশ্নের উপস্থিতি দেখা যায়।’ সে সময়ই দর্শনের নানা গলিপথে বিচরণের মাধ্যমে ফয়জুল্লাহ, মীর সৈয়দ সুলতান, মোহসেন আলি, শেখ মনসুর, হাজী মুহম্মদ প্রমুখ দর্শনের নানা শাখা-প্রশাখা খুঁজে বের করেছেন; যদিও তাঁরা শুরুতে ‘আরব বিশ্বের সুফিসাধক’ কর্তৃক প্রভাবিত ছিলেন। মধ্যযুগের কিছু আগে আরব বিশ্বের সুফিসাধকরা এ দেশে এসেছেন, স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন। এই প্রভাববলয় থেকে মুক্ত হতে না হতেই ‘ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের দার্শনিকেরা পাশ্চাত্য এবং ভারতীয় দর্শনের অনুপ্রেরণায় দর্শন চর্চা’ শুরু করেন। স্বতন্ত্র পথ নির্মাণে অনেকেই সচেষ্ট ছিলেন। লালন ও হাসন রাজা বাংলাদেশের দুজন মৌলিক দার্শনিক। লালনের দর্শনে জ্ঞানবিদ্যা, অধিবিদ্যা ও মূল্যবিদ্যা রয়েছে। হাসন রাজার গানের মধ্যে অধিবিদ্যক বিষয়গুলো বিদ্যমান।

গ্রন্থে প্রতিনিধিত্বশীল বিশিষ্ট সাতজন বাঙালি মুসলিম দার্শনিক খানবাহাদুর আহছানউল্লাহ, মোহম্মদ বরকতুল্লাহ, আরজ আলী মাতুব্বর, আবুল হাশিম, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, সাইদুর রহমান ও আহমদ শরীফের জ্ঞানবিদ্যা, অধিবিদ্যা ও মূল্যবিদ্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। উল্লিখিত এই সাতজন দার্শনিককে নির্বাচনের কারণ বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়, ‘খানবাহাদুর আহছানউল্লাহ, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, আবুল হাশিম ও দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের দর্শনচিন্তায় ধর্মের প্রভাব বেশি। আরজ আলী মাতুব্বর ও আহমদ শরীফ ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদী দার্শনিক হিসেবে পরিচিত, সাইদুর রহমানের দর্শনচিন্তায় বস্তুবাদ ও ভাববাদের মধ্যে সমন্বয় দেখা যায়। বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনচর্চার দুটি প্রধান ধারা ধর্মভিত্তিক দর্শনচর্চা বা ভাববাদী দর্শনচর্চা এবং ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদী দর্শনচর্চা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

পরিশেষে বলতে চাই,‘বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানের দর্শনচিন্তা’ গ্রন্থটির আলোচনা কয়েকজন দার্শনিকের দর্শনচর্চার মধ্যে থেমে থাকেনি। হলে তা হতো গতানুগতিক। কারণ এর আগে হয়তো এদের প্রত্যেককে নিয়ে পৃথক পৃথক আলোচনা গ্রন্থ বা জীবনী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এই গ্রন্থের বিশেষত্ব হলো বিশ শতকের সাতজন দার্শনিকের দর্শনচর্চা নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ গ্রন্থে বাংলা ও বাঙালির দর্শন-ভাবনার আদিঅন্ত পরম্পরা আলোচিত হয়েছে। লেখক আলো ফেলেছেন বরং বাঙালির সামগ্রিক দর্শনভাবনায়। দর্শনভাবনায় রেনেসাঁর প্রভাবকেও তুলে এনেছেন। ফলে এ গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে পাঠক মাত্রই শুধু সাতজন বাঙালি মুসলমানের দর্শন চিন্তা সম্পর্কে জানবেন, তা কিন্তু নয়; বরং একই সঙ্গে বাংলা এবং বাঙালির সমাগ্রিক দর্শন চিন্তার হাজার বছরের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবেন।

বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানের দর্শনচিন্তা : ড. মো. আনিসুজ্জামান। প্রকাশক : জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ। মূল্য ৪৫০ টাকা।