kalerkantho

বুধবার । ২ আষাঢ় ১৪২৮। ১৬ জুন ২০২১। ৪ জিলকদ ১৪৪২

মেহনাজ

শহিদ হোসেন

১১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



মেহনাজ

অঙ্কন : মাসুম

বেশ কয়েক বছর আগের কথা, আমরা তখন সেন্ট জর্জের ছোট একটা বাসায় থাকি। আমার ছেলের বয়স পাঁচ, মেয়ে তখনো জন্মায়নি। সামান্য বেতনের চাকরি, মাস শেষে টানাটানিতে পড়ে যাই। বাসে-ট্রেনে অফিসে যাই, ট্যাক্সি নেওয়া তখন বিলাসিতা।

ছোট বাসা বলে বাসায় গেস্টটেস্ট তেমন ডাকা হয় না। একদিন আমার বন্ধু হাবিব ঢাকা থেকে ফোন করল। ওর ভাতিজি আর তার জামাই সিঙ্গাপুরে আসবে ডাক্তার দেখাতে, সপ্তাহখানেক আমাদের বাসায় থাকবে। বাসায় থাকার কথা শুনে আমি আমতা আমতা করেও কিছু বলতে পারলাম না।

আমার তখন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। খাবারদাবারের কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু ওরা থাকবে কোথায়? দুই রুমের ফ্ল্যাটের একটায় আমরা থাকি, আরেকটায় আমার ছেলে থাকে। তার রুমে সিঙ্গল খাট, তা-ও আবার ডাবল ডেকার। ডাবল ডেকার না কিনলেও চলত; কিন্তু কণা বাদ সাধল। তার আবার বিষয়বুদ্ধি আমার চেয়ে ভালো। কণা ইঙ্গিত দিল, অদূর ভবিষ্যতে ডাবল ডেকারই লাগবে। তা ছাড়া ডাবল ডেকারে বইপত্র রাখার সিস্টেমও আছে, একের ভেতরে তিন অপশন পেয়ে যাচ্ছি। মন্দ কী?

এখন কিভাবে কী হবে বুঝতে পারছি না। এর মধ্যে হাবিব ফোন দিয়ে বলছে—দোস্ত দুইটা নামাজের বিছানা লাগবে, ভাতিজির জামাই আবার হুজুর মানুষ, পর্দানশিন ফ্যামিলি। 

মনটা আরো ভেঙে গেল। আমার চেয়ে বেশি ভাঙল কণার। উটকো লোক তার অপছন্দ। তার ছোট সংসার সে নিজের মতো করে চালায়। দৈন্যের মধ্যেও নিজের মতো করে চলার স্বাধীনতাকে সে উপভোগ করে। সেখানে অজানা-অচেনা কারো কাছে সংসারের খুঁটিনাটি হাঁ হয়ে থাকবে এটি নিতে পারছে না।

হাবিবের ভাতিজি মেঘনা আর তার হাজব্যান্ড মবিন এসে বাসায় পৌঁছেছে। মেঘনাকে দেখে চমকে গেলাম। চোখ ছাড়া পুরোটাই কালো বোরকায় ঢাকা, হাতে-পায়ে মোজা। ছেলেবেলায় দেখেছি, ভীষণ দুরন্ত ছিল। বাড়ির লনে সাইকেল চালাত, ঈদের সময় বাসায়ও বেড়াতে এসেছে কয়েকবার। এ রকম চটপটে মেয়েকে এভাবে দেখব ভাবিনি।

মবিনের বয়স সাতাশ-আটাশ হবে। টুপি দাড়ি সুরমা পাঞ্জাবিতে  বয়স দেখায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। ওদের জন্য বরাদ্দ আমাদের বেডরুম। আর আমাদের জন্য ছেলের রুমে ডাবল ডেকার খাট।

ডাবল ডেকার যে ট্রিপল ডেকার, এটা আমার মনে ছিল না। খাটের তলা থেকে টেনে আর একটা পোর্টেবল ম্যাট্রেস বের করা যায়। সেই পোর্টেবল ম্যাট্রেসে কণা, তারপর আমার ছেলে শান্তনু আর ওপরের তলায় আমি ঘুমাব, উত্তম ব্যবস্থা। 

আমার ছেলে খুব খুশি, মা-বাবা তার রুমে ঘুমাবে, এটা তার কাছে উৎসবের মতো। মবিন প্রথমে কাঁইকুঁই করলেও রুম বরাদ্দের ব্যবস্থাপনা মেনে নিল দুটি কারণে, এক আমাদের বেডরুমে অ্যাটাচড টয়লেট। ডাবল ডেকারে সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামা করাটা তার জন্য মুশকিল। হাত-মুখ ধুয়ে ডিনার করার কথা বলতেই মবিন বলল, আংকেল আমরা পুরুষরা আগে বসে খায়া নেই মেয়েরা পরে বসুক।

সমস্যা কী, সবাই একসঙ্গে ডাইনিং টেবিলে বসি।

সমস্যা আছে আংকেল, আপনের আন্টির পর্দার সমস্যা।

এতক্ষণে আমার খেয়াল হলো মেঘনা একবারও লিভিংরুমে আসেনি, বেডরুমে আছে। তার মানে এরা কঠিন পর্দা মেনে চলে। আমি বললাম, কোনো সমস্যা নেই।

তাইলে আমরা পুরুষরা আগে বইসা যাই। 

আমার ছেলে বলে, পুরুষ মানুষ কী আংকেল?

পুরুষ হইল Man, ছেলেমানুষ। আর তোমার আন্টি হইল লেডিস, মেয়েমানুষ।

ছেলেমেয়েরা কি একসঙ্গে খেতে পারে না?

অবশ্যই পারে, এক ফ্যামিলির হইলে কোনো সমস্যা নাই, জায়েজ। কী নাম তোমার?

আমার নাম শান্তনু।

এইটা আবার কী রকম নাম, হিন্দু নাম মনে হইতাছে, নামের আগে মুহাম্মদ নাই?

কণা খাবার এনে টেবিলে রাখছিল, মবিনের প্রশ্নে কণা আড়চোখে আমার দিকে তাকাল।

আংকেল ছেলেরে কি মুসলমানি দিছেন?

ছেলে আগ বাড়িয়ে বলে, আমার মুসলমানি হয়েছে, তুমি দেখবা?

আমি শান্তনুকে চোখরাঙানি দেই। কিছুদিন আগেই তার সারকামসাইজ হয়েছে। আমার মা তখন এখানে ছিল। আমার মায়ের কাছ থেকেই ‘মুসলমানি’ শব্দটার সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। তার ধারণা, এটা অহংকার করার মতো কোনো ব্যাপার। এ জন্য বাসায় কোনো গেস্ট এলেই সে তার পাখি দেখাতে চায়। কিছুদিন আগে আনিসুজ্জামান স্যার আর তাঁর স্ত্রী এসেছিলেন। পরিচয় পর্ব শেষ হতেই শান্তনু বলে, তুমি আমার পাখি দেখবা?

আনিসুজ্জামান স্যার আঁতকে ওঠে। বেবি ভাবি হাসতে হাসতে বলেছিল, ও দেখবে না, তুমি আমার কাছে আসো।

মবিন বলে, না থাক, দেখব না। চলো, খাওয়াদাওয়া করি।

ডিনার শেষে আমরা বাইরের করিডরে গিয়ে বসলে কণা আর মেঘনা খেতে বসে। রাতে ঘুমাতে এসে কণা বলে, ওদের পাঁচ বছর ধরে বিয়ে হয়েছে, কোনো বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছে না। দেশে ডাক্তার দেখিয়েছে, কোনো কাজ হয়নি। এ জন্যই এখানে আসা। ভালো কথা। ওদের জন্য কি কোনো ডাক্তার ঠিক করেছ? KK হসপিটালে তোমাকে যে ডাক্তারকে দেখাতাম তার সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দেব বলে ঠিক করেছি।

ওরা কোনো পুরুষ ডাক্তার দেখাবে বলে মনে হয় না। তুমি কোনো ফিমেল ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিও।

কণার কথাই  ঠিক হলো, ওরা কোনো পুরুষ ডাক্তার দেখাবে না। সকালে ব্রেকফাস্টের পর মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালের ডাইরেক্টরি দেখে ডক্টর Kelly Loi-এর সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিলাম। তারপর একটা ট্যাক্সি ডেকে দিয়ে আমি অফিসে চলে গেলাম।

আমার ধারণা ছিল ডাক্তারের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলার জন্য আমাকে ওদের সঙ্গে যেতে হবে। মবিন বলে, মেহেনাজ খুব ভালো ইংরেজি বলে, সে নিজেই পারবে।

আমার খেয়াল হলো ছেলেবেলায় মেঘনা আর ওর ভাইকে ইংলিশ মিডিয়ামের প্রিপারেটরি স্কুলে যেতে দেখেছি। মেঘনা নামটিও বদলে গিয়ে হয়েছে মেহনাজ। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া মেঘনা এখন আপাদমস্তক কালো কাপড়ে ঢাকা মেহনাজ। মেহনাজের সঙ্গে কথা বলার কোনো অধিকার আমার নেই, আমি নিছকই এক পরপুরুষ। 

ভালোয় ভালোয় তিন দিন কেটে গেল। সারা দিন আমার অফিসে কেটে যায়। মবিন আর মেহনাজও সকালে হসপিটালের উদ্দেশে বেরিয়ে যায়, ফেরে সন্ধ্যায়। এসেই নিজেদের রুমে ঢুকে পড়ে। ওদের সম্ভবত নানা রকমের টেস্টফেস্ট চলছে।

পুরুষদের ডিনার পর্ব শেষে যখন আমরা করিডরে এসে বসি, তখন টুকিটাকি কথা হয়। মবিন বলে, আংকেল এই দেশে তো মেলা মুসলিম দেখি। মাদরাসা নাই? আপনার ছেলেটারে মাদরাসায় দেন। মাদরাসা ছাড়া ইসলামের শিক্ষা পূর্ণ হয় না।

আমি হেসে বলি, মাদরাসা থাকলেও তাকে দিতে চাই না। আমি চাই ছেলে সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। অন্য ধর্মের মানুষকে সম্মান করতে শিখুক। চাই না সে মানুষকে ঘৃণা করে বড় হোক।

ইসলাম তো আর ঘৃণার কথা বলে না, শান্তির কথা বলে। বেহেশতের চাবিকাঠি হইল ইসলামে। যারা ইসলামের সঙ্গে নাই, যারা বিধর্মী। তারা কোনো দিন বেহেশতে যাবে না আংকেল।

কে বেহেশত যাবে আর কে যাবে না, সে কাজ সৃষ্টিকর্তার ওপর ছেড়ে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমি মানুষকে বিচার করি তার কর্ম দিয়ে, ধর্ম দিয়ে না। দোজখ-বেহেশতের ভাবনা মাথা থেকে দূর করে দেন। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে তার নিজের ধর্মকে ভালোবাসার। আপনার কাছে যেমন আপনার ধর্ম প্রিয়, অন্যের কাছেও তার ধর্ম প্রিয়। মানুষকে ভালোবাসুন, পৃথিবীকে ভালোবাসুন।

আমার কথাবার্তা যে মবিনের পছন্দ হয় নাই, সেটা তার মুখ দেখেই বোঝা গেছে। আমারও মনে হয়, তার সঙ্গে ধর্মীয় আলোচনায় যাওয়া ঠিক হয়নি। মবিনের প্রতিদিনের জীবনাচার, বিশ্বাস, শিক্ষা পাঁচ মিনিটের আলোচনায় বদলাবে না। আমি মনের মধ্যে এক ধরনের রিগ্রেট বোধ নিয়েই ঘুমাতে গেলাম।

ডিনারের পর আজও বারান্দায় গিয়ে বসলাম। মবিনকে আজ একটু খুশি খুশি লাগছে। কালকের ব্যাপারটা নিয়ে আমি কিছুটা গিলটি ফিল করছিলাম। ভাবলাম, চিকিৎসা কেমন চলছে সে ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করব। কিন্তু ব্যাপারটা টু পার্সোনাল বলে আমিও কিছু জিজ্ঞেস করি না। নিজে থেকে যদি বলে তো বলবে। মবিন বলল, আংকেল একটা কথা ছিল।

কী কথা, বলুন।

মেহনাজ একটা আবদার করছে আন্টির কাছে।

কী আবদার? আপনার আন্টিকে বলেন।

আপনাকে বলি। আপনি অনুমতি না দিলে তো হবে না।

আচ্ছা ঠিক আছে, বলুন।

মেহনাজ একটু Sentosa আইল্যান্ডে বেড়াতে যেতে চায়।

সে তো খুবই ভালো কথা। সিঙ্গাপুরে এসে Sentosa-তে না বেড়ালে কি হয়? সব ট্যুরিস্টই ওখানে বেড়াতে যায়। কাল সকালেই নাশতা খেয়ে দুজন বেরিয়ে পড়ুন।

আন্টি যদি কালকে ফ্রি থাকে তাইলে মেহনাজকে নিয়া Sentosa ঘুরে আসুক।

আন্টি যাবে কেন, আপনারা যান। দুজন একসঙ্গে ঘুরলেন, অনেক কিছু দেখার আছে।

না আংকেল, আমি যেতে পারব না, অসুবিধা আছে।

কিসের অসুবিধা? আপনি জাস্ট ট্যাক্সিতে উঠে বলবেন Sentosa যাব, ড্রাইভার আপনাদের পৌঁছে দেবে। আপনি টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে যাবেন। ওয়ান্ডারফুল প্লেস।

না আংকেল, প্রবলেম আছে। পর্দার সমস্যা।

মেহনাজ তো বোরকা পরেই যাবে, পর্দার সমস্যা হবে কেন?

সমস্যাটা মেহনাজের না, আমার। বাইরে বাইর হইলে অনেক বেপর্দা মাইয়ালোক দেখি। এতে আমারই পর্দার সমস্যা হয়।

মবিনের কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। পরদিন কণা মেহনাজকে নিয়ে Sentosa-য় বেড়াতে বের হলো, সঙ্গে শান্তনু। ভালো হয়েছে, মেহনাজের শেষ পর্যন্ত Sentosa দেখা হলো। মেয়েটা বাসায় আছে কী নেই বোঝা যায় না। সারাক্ষণ কী করে একটা রুমের মধ্যে থাকে কে জানে! একেবারে বন্দি জীবন। এভাবে কি মানুষ বাঁচে?

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় আমি কণাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের ঘোরাঘুরি কেমন হলো?

কণা নিচ থেকে ফিসফিস করে বলল, আজ একটা মজার কাণ্ড হয়েছে। তুমি কিন্তু কাউকে বলবে না, খুব সিক্রেট। 

কাকে আর বলব, কী হয়েছে বলো।

আজ না মেহনাজ জিন্স আর শার্ট পরে বেরিয়েছে।

বলো কী! ওর বোরকা?

বোরকা শান্তনুর ব্যাগে রাখা ছিল।

জিন্স আর শার্ট পেল কোথায়? দেশ থেকে নিয়ে এসেছে?

আরে না না, আমারই এক সেট দিয়েছি ওকে। Sentosa-তে গিয়ে ওয়াশরুমে চেঞ্জ করেছে। এত সুন্দর মেয়েটা, আমি তো প্রথমে চিনতেই পারিনি। কী সুন্দর চোখ-ভ্রু আর এত বড় লম্বা চুল, আমার চেয়েও লম্বা চুল। 

ওকে আমি ছোটবেলায় সাইকেল চালাতে দেখেছি। এই রকম একটা লোকের সঙ্গে কেন যে বিয়ে দিল ওর বাবা!

আমাকে সব বলেছে, হঠাৎ করে বাবা মারা যাওয়ার পর ওর ভাই বিয়ে ঠিক করেছে। মবিনদের নাকি অনেক বড় গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে। ওদের সঙ্গে মেহনাজের ভাইয়ের বিজনেস আছে।

ভাইয়ের বিজনেসের বলি হলো মেয়েটা।

মবিন নাকি আগে এ রকম ছিল না। বাচ্চাকাচ্চা না হওয়ায় কোনো এক হুজুরের মুরিদ হয়েছে। তার পর থেকে এ অবস্থা। 

মানুষ কেমন দেখো। নিজের জীবনের ভালো-মন্দ ব্যাপার সে অন্যের হাতে কত অবেলায় তুলে দেয়। প্রার্থনা মানে হলো সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করা, এই মানবজীবনের জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানানো, আর সততা নিজে জীবন যাপন করা—এই তো হলো ধর্ম। এর জন্য পীর ধরতে হবে কেন, থার্ড পার্টি  ধরতে হবে কেন? শেষ পর্যন্ত তো সেই ডাক্তারের কাছেই আসতে হলো।

আমারও মাথায় আসে না, শিক্ষিত মানুষ কী করে মূর্খের পাল্লায় পড়ে। তবে যাই বলো, মেয়েটির মনে অনেক দুঃখ, এ রকম জীবন সে চায়নি। বাসায় একটা টিভি পর্যন্ত নেই।

কী বলো?

হে, টিভিতে নাটক-মুভি দেখা নাকি বেদাত কাজ। মেহনাজ টিভি দেখত বলে একদিন বাসায় ফিরে আছাড় দিয়ে টিভি ভেঙে ফেলেছে।

ও মাই গড। পুরো এক্সট্রিম।

আমি সারাক্ষণ মেয়েটির জীবনের কথা ভেবেছি। এ রকম সুন্দর শিক্ষিত একটা মেয়ে শুধু ধর্মান্ধতার কারণে কত অসহায়। আজ মেয়েটি কী সুন্দর ডানা মেলা প্রজাপতির মতো ঘুরে বেরিয়েছে। কী যে ভালো লেগেছে আমার। জিন্স আর শার্টে ওকে খুব মানিয়েছিল। শোনো, এ ঘটনা তুমি যেন আবার কারো সঙ্গে শেয়ার কোরো না।

মাম্মি, আংকেলকে বলে দিয়েছি আন্টি আজ বোরকা পরেনি। 

হোয়াট! অহ মাই গড! শান্তনু  ঘুমায়নি, সে এতক্ষণ ঘাপটি মেরে পড়ে ছিল! হায় হায় এখন কী হবে?

কণা চাপা গলায় শান্তনুকে ধমকাতে লাগল, তুই কেন বলতে গেলি? আমি না তোকে পই পই করে বলে দিলাম, এ কথা যেন কেউ না জানে? কেন, বলতে গেলি কেন?

আমাকে আংকেল এক বাক্স চকোলেট দিয়ে বলেছে, ঘোরাঘুরি কেমন হয়েছে?

আমি বলেছি, ভালো হয়েছে। তারপর বলেছি, একটা সিক্রেট আছে, কাউকে যেন বলো না।

তারপর তুই ওকে সব বলে দিলি?

কণা রাগে কাঁপতে লাগল।

সকালে আমি দ্রুত বাসা থেকে অফিসে চলে গেলাম, আমাকে যেন কোনো অপ্রিয় ঘটনার মুখোমুখি হতে না হয়। কণা বলেছিল আজ যেন অফিসে না যাই। কিন্তু আমি যেন পালাতে পারলে বাঁচি। সন্ধ্যায় চাপা আতঙ্ক নিয়ে বাসায় ঢুকলাম। ডিনার রেডি হচ্ছে, বাইরে থেকেই বিরিয়ানির ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। দরজায় পা দিয়েই চমকে গেলাম। আমি কি ভুল করে অন্য ফ্লোরে চলে এসেছি? সালোয়ার-কামিজ পরা লম্বা সুশ্রীমতো এক মেয়ে এসে সালাম দিল, স্লামালাইকুম আংকেল।

আমি থতমত খেয়ে গেলাম। সালামের জবাব দিতেও ভুলে গেলাম। আমার অপ্রস্তুত ভাব দেখে মেয়েটি মিষ্টি করে হাসি দিয়ে বলল, আমি মেঘনা আংকেল, ভেতরে আসুন।

এই প্রথম নিজের বাসায় আমি সংকোচ নিয়ে ঢুকলাম। কাল মেঘনারা চলে যাবে, এ জন্য রান্নাবান্নার ব্যাপক আয়োজন চলছে। মেঘনা কণাকে রান্নায় হেল্প করছে। ডিনারে একটু দেরি হবে। তাই মেঘনা চা দিয়ে গেল। সারা বাড়িতে যেন উৎসবের আমেজ। এ কদিন জীবনের স্বাভাবিক গতি যেন থেমে ছিল। তাইতো, কী করে এ রকম চঞ্চল একটি মেয়ে সারাক্ষণ নিজেকে একটি ঘরে বন্দি করে রেখেছে! 

আমার জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। মবিন এসে অপরাধী মুখ করে বলল, জীবনটারে খামাখা জটিল কইরা লাভ নাই আংকেল। কাল রাইতে আমি রাগ কইরা মেহনাজের গায়ে হাত তুলছি। সে সারা রাইত কান্নাকাটি করছে। তারপর আমি অনেক ভাবলাম, চিন্তা কইরা দেখলাম, যে তার পরিবারকে ভালোবাসে না, তার সুখ-দুঃখ বোঝে না, সে কী কইরা আল্লার ভালোবাসা পাবে।

বাহ, আপনার পজিটিভ চিন্তা দেখে ভালো লাগল।

থ্যাংক ইউ আংকেল। 

গল্পটা এখানে শেষ করলে কেমন হয়? সুখী সুখী গল্প। পজিটিভ গল্প। কিন্তু জীবন সব সময় লেখকের পজিটিভ ভাবনা মেনে চলে না। গল্পের এন্ডিংটা আমার কল্পনা। আসল ঘটনা ভিন্ন রকম।

রাতে ওদের ঝগড়াঝাঁটি আমাদের কানে এসেছে। সকাল হতেই ওরা আমাদের বাসা থেকে লাগেজটাগেজ নিয়ে চলে যায়। কোনো এক হোটেলে গিয়ে ওঠে, বহু অনুনয়-বিনয় করেও ওদের আটকাতে পারিনি। অনেক খোঁজখবর করেও ওদের আর দেখা পাইনি। এ ঘটনার পর কণা অনেক দিন মনমরা হয়ে ছিল।

তারপর বেশ কয়েক বছর পর ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হসপিটালে মবিনদের সঙ্গে হঠাৎ করেই দেখা। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা করতে আসা আমার এক বন্ধুকে দেখতে ওই হসপিটালে গিয়েছিলাম। ওরা লবিতেই বসে ছিল। মবিন পরে ছিল পায়জামা-পাঞ্জাবি আর পাশে মেহনাজ সেই আগের মতোই আপাদমস্তক বোরকায় ঢাকা। আমি দেখতে পেয়ে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, আরে মবিন কেমন আছেন?

আমাকে চিনতে পেরে মবিন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ভালো আছি আংকেল। আন্টি, শান্তনু কেমন আছে? 

ওরা ভালো আছে। মেহনাজ তুমি কেমন আছ?

মবিন আমাকে একটু দূরে ঠেলে নিয়ে বলে, আংকেল ও মেহনাজ না। ওর নাম বিলকিস।

আমি বোকার মতোই জিজ্ঞেস করলাম, মেহনাজ কোথায়?

মেহনাজ তো নাই আংকেল!