kalerkantho

সোমবার । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ ফাল্গুন ১৪২৬। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

মোজাফ্ফর হোসেন
টোপ : ইমদাদুল হক মিলন। প্রকাশক : অনন্যা প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। মূল্য : ২০০ টাকা

টোপ উপন্যাসটি এখন আরো বেশি প্রাসঙ্গিক

মোজাফ্ফর হোসেন
টোপ : ইমদাদুল হক মিলন। প্রকাশক : অনন্যা প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। মূল্য : ২০০ টাকা

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



টোপ উপন্যাসটি এখন আরো বেশি প্রাসঙ্গিক

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের আলোচিত এবং প্রশংসিত উপন্যাস ‘টোপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। বেশ কয়েকটি সংস্করণ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাসটির অনন্যা সংস্করণ।

সাহিত্যের যাঁরা খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের অনেকের হয়তো এই উপন্যাসের প্লট সম্পর্কে জানা আছে। ইমদাদুল হক মিলন উপন্যাসটি লেখেন এক নির্মম ঘটনার শিকার হয়ে ঝরে পড়া প্রাণ শবমেহেরকে নিয়ে। ১৯৮৫ সালের ঘটনা। নারায়ণগঞ্জ জেলার টানবাজারের পতিতাপল্লীতে ওকে উঠিয়ে আনা হয়। ইলেকট্রিক শক দিয়ে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শবমেহের হার মানেনি। তার মৃত্যু সময়ের আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে। 

সেই শবমেহেরকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করে উপন্যাসটি লেখা। প্রথম দিককার মুদ্রণে শবমেহেরকে পারুল নাম দিলেও নতুন সংস্করণে লেখক শবমেহের নামটিই ব্যবহার করেছেন। এতে অবশ্য ভালোই হয়েছে, শবমেহের বেঁচে থাকবে স্বনামে।

শবমেহের গ্রামের দরিদ্র ঘরের কিশোরী। সরল বিশ্বাসে ঢাকায় এসে বাঁচতে চাওয়া মেয়েটি পতিতালয়ে বিক্রি হয়ে যায়। মৃত্যুর ফাঁদে পা রাখে নিজের অজান্তেই। কিন্তু সে অদৃষ্ট ভেবে মেনে নিতে চায়নি নিজের পরিণতি। প্রচণ্ড অত্যাচারের মধ্যেও তাকে বশে আনা যায়নি। সে কোনোভাবেই খদ্দের নেবে না। কিন্তু বৃহত্তর পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-কাঠামোর ভেতর থেকে তৈরি হয়েছে যে টোপ, তার সঙ্গে পেরে ওঠে না একা এক নারীর সংগ্রাম। ফলে এক শবমেহের মারা যায়, আমরা আরো শত শত শবমেহেরের জন্ম হতে দেখি একটা অমানবিক বিকল ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে। 

‘টোপ’ উপন্যাসের মাধ্যমে শবমেহেরের যে পরিণতি, তার যে আকুতি ও সংগ্রাম, তা সব

সময়ের পাঠকের জন্য সমকালীন ঘটনা হিসেবে থেকে যাবে। পাঠক যখন উপন্যাসটি পড়বেন তখন আর তাঁকে আশির দশকে ফিরে যেতে হবে না। কারণ প্রায়ই আমরা এ ধরনের অমানবিক ঘটনার বিবরণ পত্রপত্রিকায় পড়ি। বিভিন্ন বয়সী নারী, এমনকি কিশোরীও নির্মমভাবে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। নারীকে পণ্যের মতো দেশি-বিদেশি বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। নারীপাচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় সব ধরনের আন্দোলনই হয়েছে, হচ্ছে; কিন্তু কোনো আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়ে ওঠেনি। ফলে ‘টোপ’ উপন্যাস যখন পাঠক পড়বেন, তাঁকে একই সঙ্গে ব্যথিত ও অসহায় করে তুলবে। কিন্তু এ-ও ঠিক যে আমরা এই অসহায়ত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারি না। একজন লেখক হিসেবে ইমদাদুল হক মিলন কোথাও না কোথাও আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন। তিনি গল্পটির কাঠামোর ভেতর দিয়ে এক ধরনের মানবিক সম্ভাবনাও জাগিয়ে তুলেছেন। নিছক ঘটনার বয়ান তুলে ধরার জন্য উপন্যাসটি তিনি লেখেননি। ঐতিহাসিক বা বাস্তবে ঘটে যাওয়া বিশেষ কোনো ঘটনা উপন্যাসে এসে মানুষকে তাদের ভুলগুলো শুধরে দেয়। ঘটনাগুলো ফের জীবন্ত হয়ে সময় বদলে দেখতে চায় মানবিক সম্ভাবনাগুলো। তখন আর অতীত শুধু অতীত থাকে না, হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও। উপন্যাসটি সে কারণে এখনকার মতো আগামীতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

উপন্যাসে ভাষার ব্যাপারেও লেখককে সচেতন হতে দেখি। তিনি কথোপকথনে বিক্রমপুর অঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করেছেন। নতুন সংস্করণে ভাষাগত কিছু সম্পাদনা বা পরিমার্জনা করেছেন বলে মনে হয়। বলার রীতিও আকর্ষণীয়। সব মিলে নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছেও উপন্যাসটি প্রিয় হয়ে ওঠার মতো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা