• ই-পেপার

কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ

  • হাবিব আনিসুর রহমান

ফুটবলের কবিতা যখন রাজনীতি হয়ে ওঠে

মাসুদুজ্জামান

ফুটবলের কবিতা যখন রাজনীতি হয়ে ওঠে
অঙ্কন : তানভীর মালেক

বিশ্বজুড়ে ফুটবলকে জনপ্রিয় করেছে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকা। এ দুই অঞ্চলের ফুটবল ঘরানা দুই ধরনের। ইউরোপে যেখানে শারীরিক শক্তির প্রাধান্য লক্ষ করা যায়, লাতিন আমেরিকার ফুটবল সেখানে গতির ওপর নির্ভরশীল। লাতিন আমেরিকায় ফুটবল খেলার প্রচলন শুরু হয় গত শতকের প্রথম দিকে। এরপর এর জনপ্রিয়তা এতটাই শিখরস্পর্শী হয়ে ওঠে যে সমাজ, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রপ্রতিটি ক্ষেত্রেই ফুটবলের অপ্রতিরোধ্য প্রভাব লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। এই অঞ্চলের প্রায় সব প্রধান কবি, লেখক ও কথাসাহিত্যিক ফুটবল নিয়ে কমবেশি সাহিত্যচর্চা করেছেন।

আমি এই ছোট্ট লেখায় লাতিন আমেরিকার ফুটবল সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় ও উল্লেখযোগ্য কবিতা নিয়ে আলোচনা করব। সেই সূত্রে এই অঞ্চলের জাতিসত্তা ও প্রাণস্পন্দনের বড় অংশ যে ফুটবলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, সেটা বোঝা যাবে।

লাতিন আমেরিকায় ইউরোপীয় সংস্কৃতি শুধু ফুটবলের মাধ্যমে প্রবেশ করেনি। ইউরোপীয় সাহিত্যের দিকেও ঝোঁক তৈরি হয়েছিল এই অঞ্চলের কবি ও কথাসাহিত্যিকদের। তাঁরা খুঁজছিলেন সাহিত্যের স্বতন্ত্র পথ। বেশি আকর্ষণ ছিল ফরাসি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতি। তবে দ্বন্দ্বও ছিল নিজেদের স্থানীয় ঐতিহ্যের স্থান তাঁদের সাহিত্যে কিভাবে ঘটবে, তা নিয়ে তাঁরা দ্বিধান্বিত ছিলেন। তবে পশ্চিমের নান্দনিক চর্চা ও নিরীক্ষাকে গ্রহণ করেছেন তাঁরা। শুধু বিতর্ক ওঠে সভ্যতাবর্বরতার পরিসর ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে। পশ্চিম লাতিন মহাদেশকে বর্বর বলতে চাইলেও লাতিন লেখকরা তা মেনে নিতে পারেননি। স্থানীয় জনজীবন ও ঐতিহ্যকে নিরীক্ষার মাধ্যমেই সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন। সেই নিরীক্ষার প্রকাশ ঘটেছে লাতিন আমেরিকার লেখকদের লেখায়। নিরীক্ষাধর্মী লেখালেখির দিকে এই সময় যুক্ত হয়েছেন এই এলাকার প্রায় সব প্রধান লেখক। কবিতায় রীতিমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঢেউ বয়ে গেছে। এর প্রভাব কবিতাকেও ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সনাতন ভঙ্গি বদলে আধুনিক ও আঁভাগার্দধর্মী হয়ে উঠেছে। আঁভাগার্দের অর্থ হচ্ছে বিপ্লবাত্মক হয়ে ওঠা। ফুটবলকেন্দ্রিক কবিতায়ও এই নিরীক্ষা ঘটেছে বেশ সফলভাবে। বিশ শতকের শুরুর দিকে, বিশেষ করে দ্বিতীয় দশকে এই অঞ্চলের কবিতা আধুনিক আঁভাগার্দ ও ফিউচারিজমকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করেছে। এই ধরনের কবিতার জন্য সেই সময়ে খ্যাতি অর্জন করেন খুবই তরুণ এক কবিহুয়ান পাররা দেল রিয়েগো। আমি এই লেখায় তাঁর ফুটবলকেন্দ্রিক একটি এপিকপ্রতিম কবিতা নিয়ে আলোচনা করব। রিয়েগোর কবিতা শুধু নতুন ধরনের প্রকাশরীতি ও ভাষাভঙ্গির জন্য নয়, বিষয়-আশয়ের দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। এককথায় রাজনৈতিক-সামাজিক দিক থেকে এই কবিতাটি বেশ গভীর ও ভাবসম্পদে ঋদ্ধ।

রিয়েগো ১৮৯৪ সালে পেরুতে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু কবিতাচর্চার লক্ষ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর উরুগুয়ে চলে যান। উরুগুয়ের রাজধানী লিমা ছিল তখন পুরো অঞ্চলের পরীক্ষা-নিরীক্ষাধর্মী সাহিত্যচর্চার মূল কেন্দ্র। আঁভাগার্দ ও আধুনিকতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন এবং অচিরেই লাতিন আমেরিকাজুড়ে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে যুদ্ধের বিভীষিকা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ তাঁকে উদ্দীপ্ত আধুনিক কবিতা রচনায় অনুপ্রাণিত করে।

যুদ্ধের একটা মারাত্মক দিক হচ্ছে, মানুষ এর দ্বারা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়। মানুষের শরীরে ও মনে তৈরি হয় ক্ষত। বিশ্বসাহিত্যে সেই যুদ্ধ-পরবর্তী দিনগুলোতে মানুষের শরীর ও মন তাই বেশ ভালো করে স্থান করে নিয়েছে। সামাজিক-রাষ্ট্রিক বিপর্যয় তো ছিলই। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, যেকোনো খেলার মতো ফুটবল হচ্ছে শারীরিক, বিশেষ করে পায়ের কাজ, দৌড়ের গতি, শরীরের শক্তি ও সঞ্চালন, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিপক্ষকে কৌশলে হারিয়ে দিয়ে জয়ী হওয়ার খেলা। অর্থাৎ এই খেলায় শরীরের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। রিয়েগোর কবিতায় এই শরীরের প্রাধান্য চোখে পড়ার মতো, বিশেষ করে ফুটবল নিয়ে তিনি যে কবিতাগুলো লিখেছেন তাতে এই শরীরের প্রাধান্য লক্ষ করা যাবে। শরীরের সূত্রেই তিনি বেশ কিছু সামাজিক-ব্যক্তিক সমস্যাকে তুলে ধরেছেন। দেল রিয়েগো ফুটবলবিষয়ক দুটি কবিতার জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন এবং আজও সমাদৃত হন ফুটবল কবিতার পুরোধা হিসেবে। এই দুটি কবিতার শিরোনাম হচ্ছে ফুটবলের স্তবগাথা এবং বহুমাত্রিক ছন্দোময় ফুটবলার গ্রাদিন। আমি আলোচনা করছি দ্বিতীয় কবিতাটি নিয়ে।

ইসাবেলিনো গ্রাদিন (১৮৯৭-১৯৪৪) ছিলেন উরুগুয়ের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম দিকের কৃষ্ণাঙ্গ তারকা ফুটবলার। এই গ্রাদিনকেই বহুমাত্রিক ছন্দোময় ফুটবলার গ্রাদিন-এর বিষয়বস্তু করেছেন তরুণ কবি দেল রিয়েগো। ১৯১৬ সালে কোপা আমেরিকার প্রথম টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে। তিনি সেই টুর্নামেন্টে ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। চিলির বিরুদ্ধে উরুগুয়ে যে ৪-০ গোলে জয়ী হয়, তার দুটি গোলই করেছিলেন গ্রাদিন। গ্রাদিন কৃষ্ণাঙ্গ বলে উরুগুয়ে দলে তাঁর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপত্তি তোলে চিলি। আপত্তিটা কী? চিলি জানায়, গ্রাদিন তো কৃষ্ণাঙ্গ, তাঁর রক্তে বইছে আফ্রিকার জাতিগত রক্ত; লাতিন অঞ্চলের নয়। এই আপত্তির অবশ্য কোনো কারণ ছিল না। গ্রাদিনের পূর্বপুরুষ আফ্রিকার হলেও তাঁর জন্ম লাতিন আমেরিকায়। চিলি আসলে এই আপত্তির মধ্য দিয়ে সভ্যতা বনাম বর্বরতার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু লাতিন আমেরিকায় ফুটবল শুরুর দিনগুলোতে দর্শকরা ধারণা করতে থাকে, কৃষ্ণাঙ্গরা ফুটবলকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এতে শুধু ফুটবলে নয়, একদিন হয়তো সামাজিক-রাষ্ট্রীয় জীবনে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যও খর্ব হবে।

পাররা দেল রিয়েগোর কবিতাটি লাতিন আমেরিকার ফুটবল সাহিত্যের প্রথম দিকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা। কবিতাটি শুরু হয়েছে উল্লাস আর উদযাপনের অনুষঙ্গ দিয়ে। গ্রাদিনকে তুলনা করা হয়েছে একজন বিমানচালকের উড্ডয়ন দক্ষতার সঙ্গে। এই তুলনাটা ছিল আধুনিক কবিতার রূপক। অনেকটা প্রথাগত পুরনো কবিতার কাঠামো অনুসরণ করে কবিতাটি শুরু করেছেন রিয়েগো। পরে সেই রীতি বর্জন করে তিনি আধুনিক প্রকাশ কাঠামোর আশ্রয় নিয়েছেন।

কবিতাটিতে গ্রিক পুরাণের প্রভাবও লক্ষ করা যাবে। এতে যে ডানার উল্লেখ আছে তা গ্রিক পুরাণকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। ডানার চিত্রকল্পটি ক্লাসিক্যাল, কিন্তু ফিউচারিজমে উদ্দীপ্ত কবি রিয়েগো অন্য নানা ধরনের উপমা ও চিত্রকল্প ব্যবহার করে কবিতাটিকে আধুনিক করে তুলেছেন। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, আধুনিক ও ধ্রুপদি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তিনি খেলাধুলাকেন্দ্রিক উদযাপনকে মিলিয়ে দিয়েছেন।

আধুনিককালে শরীরের নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো। তাঁর মতে শরীরের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে রাজনীতিতে। শরীরকে, অর্থাৎ শরীরী মানুষকে স্বৈরাচারী শাসকরা কারাগারে আটক রেখে অনেক সময় দেশ শাসন করে। শরীরকেন্দ্রিক বিদ্রুপও হাতিয়ার হয়ে ওঠে রাজনীতির। নারীর ক্ষেত্রে এটা ঘটে সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশগুলোতে। বর্ণবাদ তো পুরোপুরি শরীরী বিষয়। রিয়েগো সেই বিশ শতকের শুরুতে গ্রাদিনের মহিমাকীর্তনের মধ্য দিয়ে এই বর্ণবাদকে অগ্রাহ্য করেছেন। ভেঙে দিয়েছেন দাসত্বের গণ্ডি। এ জন্যই কবিতাটিতে বিমানচালকের উপমা ব্যবহার করেছেন রিয়েগো। গ্রাদিন বলের সঙ্গে ওড়েন, লাফান, চাঁদ ছুঁয়ে দেন। আকাশে উড্ডীন দেখা যায় তাঁকে। আবার মাটিতেও ফিরে আসেন তিনি। ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যূহ ভেদ করে গোল করেন। গ্রাদিনের এই যে অদম্য রূপের পরিচয় কবি তুলে ধরেছেন, এই পরিচয়ের মধ্যেই রাজনীতি রয়েছে। সেই রাজনীতি যেমন শরীরী, তেমনি বর্ণবাদবিরোধী, দাসত্ববিরোধী। গ্রাদিন দাস হয়ে থাকেন না এই কবিতায়। তিনি আপন মহিমায় ছাড়িয়ে যান সবাইকে। তাঁর সঙ্গে পেরে ওঠে না কেউ।

ফুটবলারের শরীর যদি সময়কে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়, তাহলে তা স্থানকেও অতিক্রম করতে পারে, এ রকমই ভাবতেন রিয়েগো। লক্ষণীয়, এ কারণেই আকাশের উল্লেখ দিয়ে শুরু করার পর কবিতাটি মাটির দিকে নেমে আসে। সেই সময় মাঠে গ্রাদিনের দক্ষতা সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে। এরপর কবিতাটি আকাশ অভিমুখী হয়ে পড়ে, যখন গ্রাদিন বলটিকে হেড দিয়ে ওপরের দিকে ভাসিয়ে দেন এবং নিজে একটি বেলুনে পরিণত হন। এরপর বলের সঙ্গে গ্রাদিনও আবার মাটিতে ফিরে আসেন, যখন তিনি প্রতিপক্ষকে ড্রিবল করে বল নিয়ে বেরিয়ে যান এবং কবিতার মূল ফোকাসটি গোল করাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। পরবর্তী স্তবকগুলোতে আমরা সমুদ্রের দিকে চলে যাই, যেখানে গ্রাদিন হলেন অ্যাক্রোব্যাট মাছ, যিনি সবচেয়ে সহিংস আক্রমণের তীব্রতা থেকে পিছলে যান, বাঁক নেন, বাতাসে ভেসে থাকেন। কেউ তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও দেখতে পায় না, কিন্তু একটি সাবমেরিনের মতো গ্রাদিন ওপাশে বল নিয়ে ভেসে ওঠেন! শেষ পর্যন্ত দৃশ্যপট মহাশূন্যে স্থানান্তরিত হয়। গ্রাদিনের নাম চাঁদের উদ্দেশে ঘোষণা করা হয় টুপির উজ্জ্বল অভিবাদনের মাধ্যমে।

সামাজিক-রাজনৈতিক মাত্রাটিও এই কবিতাকে অনন্য করে তুলেছে। কবিতাজুড়ে রঙের ধারাবাহিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন রিয়েগো। এর বেশির ভাগই কালো-সাদা বা অন্ধকার-আলোর বাইনারি বা বিপ্রতীপ বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে তাই দেখা গেল শ্বেতাঙ্গ কবির আত্মা হচ্ছে অন্ধকার, অন্যদিকে কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারের দক্ষতাই ওই শ্বেতাঙ্গদের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে আলোকোজ্জ্বল পরম অনুভূতির স্বাদ দিয়েছে। একইভাবে কবিতার শেষ স্তবকে, দর্শকসারিযা মূলত শ্বেতাঙ্গদের আধিক্যে পূর্ণ ছিলগ্রাদিনের গোলের আবেগে আপ্লুত হয়ে কর্কশ কালো তরঙ্গে পরিণত হয়। 

শরীর ও জাতির এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে আরেকটি বাড়তি মাত্রা যোগ হয় গ্রাদিনকে কামনার অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে। গোল হওয়ার পরবর্তী মুহূর্তে কবি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন : আমি নিতম্ববিশিষ্ট নারীদের তিনজনকে দেখেছি / তারা আবেগে কেঁপে উঠত ও শিহরিত হতো! এই বর্ণনায় একজন অভিজাত পুরুষ ফুটবলারের প্রতি বিপরীত লিঙ্গের নারীদের আকর্ষণের বিষয়টি স্পষ্ট। উরুগুয়ের সেই সময়ের ফুটবল ম্যাচগুলোতে উপস্থিত দর্শকদের কথা বিবেচনা করলে (যা ছিল মধ্যবিত্তদের একটি সামাজিক অনুষ্ঠান), এটি বেশ নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে, সেই নারীরা শ্বেতাঙ্গ ছিলেন। এই বর্ণনা তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় শ্রেণি ও জাতিগত বিভেদকে ছাড়িয়ে যৌন আকর্ষণ এবং সম্পর্কের মতো একটি বিতর্কিত বিষয়কে সরাসরি স্পর্শ করে। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এই ভাবনা একদিকে যেমন ছিল অভিনব, অন্যদিকে দুঃসাহসী।

এই কবিতার গঠনকাঠামো ও নির্মাণশৈলী মূল বিষয়বস্তুগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যের নিরিখে সংক্ষেপে বিবেচনা করার মতো। ছোট ছোট শব্দ দিয়ে বেশ কিছু পঙক্তি রচনা করে কবিতাটিকে ফুটবলের মতো গতিময় করে তুলেছেন কবি। ছন্দ বা অন্ত্যমিলের কোনো নির্দিষ্ট বিন্যাস নেই। তবে কবিতাটি গ্রাদিনের মতোই সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, আবার পুরোপুরি প্রথার দাসও নয়। কাঠামোগত এই বাধ্যবাধকতা এবং একে অগ্রাহ্য করার মধ্য দিয়ে ফুটবল মাঠে একজন জাতীয় নায়ককেই প্রতিষ্ঠা করেছেন রিয়েগো। লাতিন আমেরিকার সমকালীন সমাজের এক অবদমিত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে গ্রাদিনের অবস্থান এই কবিতায় চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই সঙ্গে ফুটবলের মহিমা ও জনপ্রিয়তাও তুলে ধরেছেন কবি রিয়েগো।

 

জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি

অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা সূর্যমুখী সূত্র

ভূমিকা ও অনুবাদ : আনীকা তাসনিম হোসেন

অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা সূর্যমুখী সূত্র

অ্যালেন গিন্সবার্গ। জন্ম তিন জুন, ১৯২৬, আমেরিকার নিউজার্সিতে। মৃত্যু পাঁচ এপ্রিল, ১৯৯৭; নিউ ম্যানহাটানের ইস্ট ভিলেজে, লিভার ক্যানসারে। আইকোনিক বিট জেনারেশনের’ কবি। হিন্দু, বুদ্ধ ও জায়নবাদী দর্শনে ভাবিত ছিলেন। সূর্যমুখী সূত্র’ কবিতাটি গিন্সবার্গের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হাওল’ (প্রকাশিত ১৯৫৬)-এ অন্তর্ভূক্ত। আমেরিকায় কাব্যগ্রন্থটি নিষিদ্ধ ছিল। আদালত নিষেধ তুলে নেয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১-এ কবি এসেছিলেন যশোর রোডে। লিখেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি।

 

আমি হেঁটেছিলাম ফেলে দেওয়া টিনের কৌটায় ভরা কলার ঘাটে, দক্ষিণ প্যাসিফিক-লোকোমোটিভের বিশাল ছায়াতলে বসে কেঁদেছিলাম বক্স হাউস পাহাড়ের ওপরে ডুবে যাওয়া সূর্য দেখে। জ্যাক ক্যারুয়াক এসে এক মরচে ধরা লোহার খুঁটির ওপর আমার পাশে বসল। আমরা সহযাত্রী, চিন্তাপ্রবাহ একই আত্মার। বিবর্ণ, নীল এবং বিষণ্ন চোখ যন্ত্রের মতো গাছের ইস্পাত-শিকড়ে আবদ্ধ।

নদীর তৈলাক্ত জলে লাল আকাশের প্রতিচ্ছবি, সূর্য ডুবেছিল শেষ ফ্রিসকো পাহাড়ের চূড়ায়। সে স্রোতে কোনো মাছ নেই, পাহাড়ে কোনো তপস্বী নেই, শুধু আমরা দুজন, ভেজা চোখে, নদীর পারে মাতাল ক্লান্ত বৃদ্ধ ভবঘুরের মতো।

ওই সূর্যমুখীকে দেখো, সে বলল। আকাশের বিপরীতে ধূসর মৃত ছায়া মানুষের মতো বড়, বসে আছে শুকনো প্রাচীন করাতের গুঁড়ার স্তূপের ওপরমোহাচ্ছন্ন আমি ছুটে গেলামআমার প্রথম সূর্যমুখী, ব্লেকের স্মৃতি, আমার সব দর্শনহার্লেম আর পূর্ব নদীগুলোর নরক, সেতুদের ঝনঝন জোসে গ্রিজি স্যানডুইসেচ, মৃত শিশুর অশ্ববাহিত বাহন, বিস্মৃত আর না ফিরে আসা কালো টায়ারের বৃত্ত, নদীতীরের কবিতা, জন্মনিরোধক আর গঞ্জিকা, ইস্পাতের ছুরি, কোনো কিছুই নিষ্কলঙ্ক নয়, শুধু নোংরা কাদার মতো আবর্জনা; আর রেজারের মতো ধারালো শিল্পের অতীত ভ্রমণ

আর সেই ধূসর সূর্যমুখী সূর্যাস্তের সময় সামনে দাঁড়িয়ে ধুলো আর ধোঁয়ায় কলুষিত, চোখে পুরনো লোকোমোটিভের কালো ধোঁয়াতোমার মলিন কাঁটার মুকুট নুয়ে পড়ছে পরাজিত ক্ষতবিক্ষত রাজমুকুটের মতো; আলোকিত বাতাসে অচিরেই দাঁত পড়ে যাওয়া মুখ থেকে পড়ে গেছে বীজ।

বিলুপ্ত সূর্যরশ্মি মাকড়সার শুকনো জালে, শুকনো পাতা বেরিয়ে আছে প্রসারিত হাতের মতো, কাঠের গুঁড়োর ভিতর থেকে উঠে আসা ইশারা, কালো ডালপালার গা থেকে খসে পড়া প্লাস্টারের টুকরো, তোমার কানের কাছে আটকে ছিল একটা মৃত পোকা!

তোমরা ছিলে জীর্ণ অপবিত্র; আমার আত্মা সূর্যমুখী, আমি ভালোবেসেছিলাম।

এ আবর্জনা মানুষের নয়, ছিল মৃত্যু আর মানব-লোকোমোটিভের। ধুলোর সেইসব পোশাক, রেলপথের কালো হয়ে যাওয়া আবরণ, গালের ধোঁয়াশা, চোখের পাতায় জমে থাকা অন্ধকার দুর্দশা, কালিমাখা হাত কিংবা পুরুষাঙ্গ, অথবা কৃত্রিম আবর্জনার চেয়েও নিকৃষ্ট কোনো স্ফীতি শিল্পের, আধুনিকতার, সবই তোমার উন্মত্ত সোনালি মুকুট জুড়ে সেইসব সভ্যতার দাগ।

আর ঝাপসা মৃত্যুচিন্তা ধুলাঢাকা প্রেমহীন চোখ, অবসান আর শুকিয়ে যাওয়া স্মৃতি, নিচে ধুলো আর কাঠের গুঁড়োর স্তূপে রবারে বাঁধা নোটে, যন্ত্রের উপরিভাগে কাঁদতে কাঁদতে কাশতে থাকা গাড়ির যন্ত্রাংশে, মরচে ধরা জিহ্বা বের করা নিঃসঙ্গ ফাঁক টিনের কৌটোগুলোয়, আমি নাম দিতে পারতামকোনো দাঁড়ানো সিগারের ধোঁয়া আকীর্ণ ছাই, জীর্ণ চেয়ারের ক্ষয়ে যাওয়া পশ্চাদ্দেশ, মোটরগাড়ির শ্বেতশুভ্র স্তন, আর ডায়নামোর স্ফিঙ্কটারসবকিছু জড়িয়ে আছে তোমার মমি হয়ে যাওয়া শিকড়েআর তুমি সূর্যাস্তের সামনে দাঁড়িয়ে তোমার অবয়বে তুমি মহিমান্বিত!

সূর্যমুখীর নিখুঁত সৌন্দর্য! চমৎকার, তুলনারহিত ভালোবাসায় সুর্যমুখীর অস্তিত্ব! পূর্ণিমার দিকে মধুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে জেগে ওঠা প্রাণ, আর আবেগে মাসিক সূর্যাস্তের সোনালি ছায়ায় মৃদুমন্দ বাতাস!

তোমার চারপাশে কত পতঙ্গের গুঞ্জন যখন তুমি দুষেছিলে রেলগাড়ির রাস্তা আর তোমার পুষ্পসত্তাকে? গরিব মৃত ফুল? কখন বিস্মৃত হলে তুমি ছিলে ফুল? কবে নিজের চামড়া দেখে ভেবেছিলে, তুমি ছিলে নোংরা নপুংসক নোংরা বুড়ো লোকোমোটিভ?

না, তুমি কখনো লোকোমোটিভ ছিলে না, ছিলে সূর্যমুখী!

আর তুমি লোকোমোটিভ, লোকোমোটিভ, আমাকে ভুলবে না!

তখন আমি কঙ্কালরূপী পুষ্ট সূর্যমুখী আঁকড়ে ধরে আমার পাশে রাজদণ্ডের মতো গুঁজে দিলাম, আমি আমার উপদেশে নিবেদন করি জ্যাক ও আমার আত্মাকে আর যে-ই শুনতে চায়।

আমরা আমাদের শরীরে জমে থাকা আবর্জনা নই, আমরা ভীত, বিবর্ণ, ধুলাঢাকা, রূপহীন লোকোমোটিভ নই; আমাদের অন্তরে আমরা সোনালি সূর্যমুখী, নিজেদের অন্তর্নিহিত আশীর্বাদে ধন্য; আমাদের সোনালি লোমশ, নগ্ন শরীর বেড়ে উঠছে পাগল কালো নিয়মী সূর্যমুখীদের সূর্যাস্তের ভিতর, আর আমাদেরই চোখ আমাদের রূপান্তরের সাক্ষী লোকোমোটিভের ছায়া। নদীতীরের সূর্যাস্তে, সন্ধ্যায় ফিসকো পাহাড়ের কৌটোসন্ধ্যার অন্তর্দৃষ্টির মধ্যে বসেছি।

ফুটবলের জন্য প্রার্থনা

ইমদাদুল হক মিলন

ফুটবলের জন্য প্রার্থনা

খেলাধুলার প্রতি বিশেষ কোনো আকর্ষণ আমার কখনো ছিল না। ছেলেবেলা কেটেছে গ্রামে। ১২-১৩ বছর বয়স পর্যন্ত একাকী নানির কাছে থাকতাম। মা-বাবা, অন্যান্য ভাই-বোন ঢাকায়। গ্রামের সেই জীবনে ঋতু বলতে প্রধানত দুটিই বুঝতাম আমরা। বর্ষাকাল আর খরালিকাল। বিক্রমপুরের ভাষায় খরালি মানে শুকনো। খরালিকালের দু-তিনটি মাস শীতকাল। খেলাধুলা, আমোদ-উৎসবের প্রায় সবই হতো খরালিকালের প্রায় সাত-আট মাস জুড়ে। বাকি সময়টা বর্ষাকাল। জল কাদা বৃষ্টির দিন। অমন দিনে শ্রীনগরের রথের মেলা, গোয়ালিমান্দ্রার ঝুলন ছাড়া তেমন আর কোনো উৎসব ছিল না।

আমার কখনো ঝুলন দেখা হয়নি। শ্রীনগরের রথের মেলায় একবার গিয়েছিলাম, ধু ধু মনে আছে। সাত-আট বছরের বেশি বয়স হবে না। আমার খালাতো ভাই জহু নজু মামা ননি হামিদ তখন সদ্য যুবক। যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল তারাই। মণীন্দ্র ঠাকুরের ছইঅলা নৌকাখানা ম্যানেজ করেছিল। মেদিনীমণ্ডল থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত নৌকা বেয়ে গেল মজিদ। যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সেবারের সেই রথের মেলায় জীবনে প্রথম সার্কাস দেখা হলো। আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। আমাদের খাওয়ার জন্য এক হাঁড়ি রসগোল্লা কেনা হয়েছে। এখন ১০ টাকায় যে সাইজের একখানা রসগোল্লা পাওয়া যায়, তখন এক টাকায় ও রকম ২০ খানা পাওয়া যেত। ঘটনাটি ৬০-৬২ বছর আগের।

যা হোক, নৌকায় বসে রসগোল্লা খাওয়া হচ্ছে। প্রথমেই কাঁঠালপাতার ঠোঙায় দু-তিনটি আলাদা করে দেওয়া হয়েছে আমাকে। আর সবাই হাঁড়ি থেকেই তুলে তুলে খাচ্ছে। একটা পর্যায়ে মজিদের বোধ হয় মনে হলো দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে রসগোল্লা। তার ভাগে যা পড়ার কথা তা বোধ হয় পড়বে না। সে করল কি, ওই সাইজের রসগোল্লা একসঙ্গে দুটি করে মুখে দিতে লাগল। কিন্তু মানুষের মুখ বলে কথা। তা আর কত বড় হবে। দুটি রসগোল্লা মুখে দেওয়ার পর না চিবাতে পারে মজিদ, না গিলতে পারে। রসগোল্লার রস মুখ থেকে বেরিয়ে থুতনি ও গলা ভেজাতে লাগল তার।

কতকাল আগে দেখা দৃশ্য! এখনো পরিষ্কার মনে আছে।

বর্ষাকালে তেমন কোনো খেলাধুলা গ্রামে হতো না। বিক্রমপুরের সেই সময়কার বর্ষা ছিল ভয়াবহ। মাঠঘাট ডুবিয়ে জল উঠে যেত মানুষের বসতভিটায়। কখনো কখনো ঘরেও ঢুকে যেত। বাড়িগুলো হয়ে উঠত একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। তবু কোনো কোনো ছাড়াবাড়িতে কিংবা বিশাল কোনো একটি বাড়ির কোনো অংশে ধরাছি (কাবাডি) খেলা হতো। লৌহজংয়ের মাঠ কিংবা কালীরখিলের মাঠে বর্ষা মাত্র হচ্ছে, এমন সময়ে ফুটবলও খেলা হতো। ভরা বর্ষায় ওই অত উঁচু মাঠও ডুবে যেত। তখন আর খেলার উপায় নেই।

কিন্তু খরালিকালজুুড়েই ফুটবল খেলাটা হতো। গ্রামের মাঠে, স্কুলের মাঠে। আমি পড়তাম কাজির পাগলা হাই স্কুলে। সেই স্কুলের বিশাল মাঠে প্রতি বিকেলেই ফুটবল খেলা হতো। স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্ররা খেলত। ফাঁক পেলে খেলত আমার বয়সী ছাত্ররা। কিন্তু আমি কখনো চান্স পেতাম না। কারণ আমি একটু মোটাসোটা ছিলাম, একটু আরামপ্রিয়, অলস প্রকৃতির। বলের সঙ্গে দৌড় দিতে পারতাম না।

তবে নিজেদের পাড়ার মাঠে দয়া করে আমাকে কখনো কখনো খেলায় নেওয়া হতো। আমি আমার সাধ্যমতো সবার সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করতাম, কিন্তু বেশির ভাগ দিনই বল পায়ে ছোঁয়ার সৌভাগ্যই আমার হতো না। আমার পায়ের কাছে এসে পৌঁছার আগেই অন্যরা ছোঁ মেরে সেই বল নিয়ে যেত। আমার তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া উপায় থাকত না।

একবার তো মাঠে প্রায় দমবন্ধ হয়ে মরেই যাচ্ছিলাম। বড় ছোট সবাই মিলে খেলছি আমরা। কে যেন একটা শট করেছে। আমি গেছি বলটা আটকাতে। পায়ে না লেগে বলটা এসে লাগল আমার বুক ও পেটের মাঝখানে। টের পেলাম, আমি আর শ্বাস ফেলতে পারছি না। শুনে নানি আমার ফুটবল খেলা বন্ধ করে দিলেন। তারপর সবাই খেলত, আমি মাঠের কোণে বসে খেলা দেখতাম। দর্শক।

তবে খেলা দেখতেও আমার বিশেষ ভালো লাগত না।

ঢাকার গেণ্ডারিয়া হাই স্কুলে এসে ভর্তি হলাম ক্লাস সিক্সে। ১৯৬৬ সাল। এই স্কুলের নিজস্ব কোনো মাঠ নেই। মিলব্যারাক মাঠ কিংবা ধূপখোলা মাঠে গিয়ে ফুটবল, ক্রিকেটএসব খেলত ছাত্ররা। আমাদের ক্লাসের সুভাষ মণ্ডল খুব ভালো ফুটবল খেলত। আর ভালো খেলত আমার বন্ধু ইউসুফ। পরবর্তীকালে মোহামেডানে খেলেছে ইউসুুফ। মোহামেডানের হয়ে প্রথম যেদিন স্টেডিয়ামে নামল, সেদিনই হ্যাটট্রিক। রাতারাতি হিরো হয়ে গেল ইউসুফ। কয়েক বছর মাঠ মাতিয়ে রাখল। তারপর খেলাধুলা ছেড়ে আমেরিকায় চলে গেল।

মনে আছে, ইউসুফদের সঙ্গে একবার কী যেন কী কারণে আমিও খেলতে নেমেছিলাম ধূপখোলা মাঠে। পাক্কা এক ঘণ্টা খেলার পর টের পেলাম, বলটা একবারও পা দিয়ে ছুঁতে পারিনি। ইউসুফ বিরক্ত হয়ে বলেছিল, তোর মতো খেলোয়াড় জীবনেও দেখিনি আমি।

তার পর থেকে ফুটবলের ওপর মনটা আমার একেবারেই উঠে গেল। আবুল হাসানের কবিতার মতো। আমি বুঝে গেছি, আমার হবে না। আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম সাহিত্য নিয়ে। বন্ধুরা যখন ধূপখোলা মাঠে ফুটবল খেলতে যায়, আমি যাই সীমান্ত গ্রন্থাগারে বই পড়তে। ফুটবল খেলা তো দূরের কথা, দেখারও আগ্রহ হয় না।

এই আগ্রহটা ফিরিয়ে দিলেন প্রথমত রবীন্দ্রনাথ, দ্বিতীয়ত ম্যারাডোনা।

প্রথমবার ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে এলেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ম্যারাডোনা। মিডিয়াগুলো এমন কাভারেজ দিল তাঁকে, ম্যারাডোনা ছাড়া যেন আর কোনো প্লেয়ারই নেই পৃথিবীতে। আমি তখন মাত্র ইউরোপজীবন শেষ করে ফিরেছি। ১৯৮৩-৮৪ সাল। মিডিয়ার কল্যাণে ম্যারাডোনাকে নিয়ে একটু উৎসাহিত হলাম। পত্রপত্রিকায় ছবিটবি দেখে ম্যারাডোনাকে কেন যেন খুব আপন মনে হতে লাগল। চেহারা-সুরত আমাদের মতোই। বেঁটে, মোটা ধাঁচের। এ রকম এক যুবক পৃথিবীশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়! দেখি তো কেমন খেলে?

ঠিক তখনই একটা বই এলো হাতে। ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ। ভূমিকা, অনুবাদ, অনুষঙ্গ কবি শঙ্খ ঘোষ। পড়ে ঘোর লেগে গেল। আর্জেন্টিনার মেয়ে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ভালোবাসতেন আমার ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথকে। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনেস এইরেসে গিয়ে ওকাম্পোর সান্নিধ্যে ছয় মাস ছিলেন কবি। ফ্রান্সে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন ওকাম্পো। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ছোট্ট কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বই লিখেছিলেন স্প্যানিস ভাষায়। বাংলা অনুবাদে সেই বইয়ের নাম সান ইসিদ্রোর শিখরে রবীন্দ্রনাথ। ওকাম্পোর বাংলা নাম করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ বিজয়া। তিনি তাঁর বিজয়াকে একবার লিখেছিলেন, পূরবীর কবিতাগুলো যারা পড়বে, তারা জানতেও পাবে না তোমার প্রতি কত তাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় ঘুরেফিরে যে বিদেশিনীর কথা বারবার এসেছে, তিনি ওকাম্পো। তোমায় বিদেশিনী সাজিয়ে কে দিল কিংবা আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী ওকাম্পোকে নিয়ে লেখা।

ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ বইতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওকাম্পোর দুখানা ছবি আছে। গাছতলার বেঞ্চে পাশাপাশি বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ আর ওকাম্পো। ওকাম্পোর একটি হাত রবীন্দ্রনাথের দিকে। আর একটি ছবি, চেয়ারে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর চেয়ারের পাশে ঘাসে বসে আছেন ওকাম্পো। এই ছবিতে ওকাম্পোর মুখ কালি দিয়ে লেপটানো। কবিকে ছবি পাঠানোর সময় নিজের মুখ কলমের কালিতে হিজিবিজি করে দিয়েছেন তিনি। আচরণটি ছেলেমানুষি।

প্রেমিক-প্রেমিকারা তো কখনো কখনো ছেলেমানুষই।

ওকাম্পো বিষয়ে জেনে আর্জেন্টিনা দেশটাকে আমি ভালোবেসে ফেললাম। রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেন যে দেশের মেয়ে, সেই দেশকে ভালো না বেসে পারেন কোন বাঙালি! সম্ভবত এই কারণে ম্যারাডোনাকেও আমার ভালো লেগে গেল। ওয়ার্ল্ড কাপে কোন জাদু দেখান ম্যারাডোনা দেখার জন্যই আমি আবার ফুটবলের প্রেমে পড়লাম।

সে বছর আর্জেন্টিনা ওয়ার্ল্ড কাপ নিয়ে গেল।

চার বছর পরের ওয়ার্ল্ড কাপে আবার খেলতে এলেন ম্যারাডোনা। টিমের অবস্থা ভালো নয়, তবু ফাইনালে গেল আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারল না। তার চার বছর পর আবার ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে এলেন ম্যারাডোনা, তত দিনে তাঁর জীবনের ওপর দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। ড্রাগ সেবনের দায়ে নিষিদ্ধ হলেন তিনি।

ম্যারাডোনার দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড কাপের সময় থেকেই তাঁর ওপর বিরক্ত হয়ে উঠছিলাম আমি। মাঠে নেমে এমন নখরা শুরু করেছিলেন, পায়ে বল এলে সেই বল কেউ ছিনিয়ে নিতে এলেই, ম্যারাডোনার পায়ে কেউ টাচ করেছে কি করেনি, অমনি মাঠে শুয়ে পড়লেন। বিরক্তিকর। অতি আদরে মাথায় উঠে যাওয়ার মতো। তবু, সবকিছুর পরও, ম্যারাডোনা ম্যারাডোনাই। ওকাম্পো ও ম্যারাডোনার কারণে আমি আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। এ বছর আর্জেন্টিনার টিম কেমন আমি জানি না। খেলাধুলার খবর সেভাবে রাখা হয় না। কত দূর যাবে আর্জেন্টিনা জানি না। তবু আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে তাদের খেলা দেখব। ওয়ার্ল্ড কাপ চলার সময় বন্ধ রাখব প্রায় সব কাজ।

আমাদের এই ছা-পোষা জীবনে আনন্দ-উৎসব খুব কম। ওয়ার্ল্ড কাপের কল্যাণে কিছুুদিন যদি আনন্দে থাকা যায়, যদি ভুলে থাকা যায় জীবনের জটিলতার কথা, যদি আমার দেশ থেকে এই কিছুদিনের জন্যও উঠে যায় যাবতীয় অকল্যাণ, যদি এই কিছুদিনের জন্যও দেশকে ভালোবেসে দেশের প্রতি নিবেদিত হয় মানুষ, আর আমার দেশও যেন একদিন ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপে খেলে বিশ্ব মাতাতে পারে, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা। ওয়ার্ল্ড কাপ যেন এইটুকু অন্তত দেয় আমাদের।

 

কোলাহল

লায়লা ফারজানা

কোলাহল

এভাবে ছিলাম আমরা

বাতাস আর নিশ্বাস জীবন আর মৃত্যুতে একক

কথা দিচ্ছিযা ভাবতে পারো শুধু সেটুকু ফেরত দিতে পারি

 

তাহলে কিভাবে ফিরে আসব এখানে,

কিভাবে বসব একে অপরের পাশে এই রাতে?

কত কষ্টের, কখন এর শেষ?

 

তারা কোথায় যে শিখিয়েছে?

কোথায় সে নক্ষত্র বলেছে অনিবার্য আমরা

 

বাইরে অন্ধকারে পাতারা তো জ্বলবেই,

বৃষ্টিতে পবিত্র শীতল আশীর্বাদের

অপেক্ষায় থাকবে মানুষ

 

শান্ত বাতাসে বিবর্ণ হবে ভঙ্গুর বিশ্বাস

কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ | কালের কণ্ঠ