kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

রংপুরে ধান-চাল সংগ্রহে ভাটা

‘ধানেই হামার সম্বল’

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘ধানেই হামার সম্বল’

‘এবার দাম কত বেশি হয় হউক, ধান বেচপার নও বাহে। করোনায় যে দিনকাল হইচে, কার ডাক কায় শোনে। আবাদি ধান ঘরোত থাউক, ধানেই হামার সম্বল। বউ-ছইল নিয়া নুন-ভাত খ্যায়া হইলেও তো বাঁচি থাকা যাইবে।’ এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগের চাষি আকবর আলী।

শুধু তিনিই না, রংপুর অঞ্চলে এবার বোরো ধানের আশানুরূপ ফলন হলেও চাষিরা ধান না বেচে করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় ঘরে আটকে রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁরা বলছেন, অন্য সব আয়ের পথ বন্ধ হয়েছে। তাই আপাতত কষ্ট হলেও উৎপাদিত ধানই তাঁদের ভরসা।

অন্যদিকে বিগত কয়েক বছরে ধানের দাম না থাকায় লোকসান গুনতে হয়েছে চাষিদের। এ বছর বাজারে ধানের দাম ভালো পাওয়ায় চাষিরা খুশি। তাই তাঁরা নানা ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে সরকারি গুদামে ধান দিতে আগ্রহী হচ্ছেন না। অন্যান্য বছরের অভিজ্ঞতা থেকে কেউ কেউ খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা, অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানাবিধ কারণকে দায়ী করছেন। ফলে শস্যভাণ্ডার বলে পরিচিত রংপুর অঞ্চলে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে ভাটা পড়েছে। তবে সরকারি মূল্যের চেয়ে বাজারে ধান-চালের দাম বেশি এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে এমনটি হয়েছে বলে মনে করছেন খাদ্য কর্মকর্তারা।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ২৬ এপ্রিল থেকে সারা দেশে বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু, কৃষকের তালিকা প্রস্তুতকরণসহ বিভিন্ন কারণে বিলম্ব হওয়ায় রংপুরে নির্ধারিত তারিখের ২১ দিন পর এই কার্যক্রম শুরু হয়। এ বছর ৩৬ টাকা দরে সিদ্ধ চাল, ৩৫ টাকা দরে আতপ চাল ও ২৬ টাকা দরে ধান কিনবে সরকার। সংগ্রহ অভিযান চলবে আগস্ট পর্যন্ত। খাদ্য অফিস সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলায় দুই লাখ ৩২ হাজার ২২৮ টন চাল এবং এক লাখ ৪৩ হাজার টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে গত ২ জুলাই পর্যন্ত ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৫৩ হাজার টন এবং চাল সংগ্রহ হয়েছে আট হাজার টন। তবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সংগ্রহ অভিযান চলবে।

সরেজমিনে এই অঞ্চলের হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় ধানের দাম বেশি হলেও বিক্রেতা কম। চাষিরা জানান, করোনাকালে নিজেদের জন্য মজুদ করায় একান্ত দায়ে না পড়লে তাঁরা ধান বিক্রি করছেন না। বর্তমান সময়ে প্রায় সর্বত্র প্রতি মণ ধান ৮০০ টাকা থেকে ৯২০ টাকা দরে বেচা হচ্ছে। একইভাবে মোটা চালের খুচরা বাজারে এলাকা ভেদে ৩৯ থেকে ৪১ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। অথচ এই চালের সরকারি সংগ্রহ মূল্য কেজি প্রতি ৩৬ টাকা। এই হিসাবে দেখা যায় প্রতি মণ চালের সরকারি সংগ্রহ মূল্য প্রতি কেজিতে তিন থেকে পাঁচ টাকা কম। সে কারণে তালিকাভুক্ত অনেক চাষিই এখন পর্যন্ত সরকারি গুদামে ধান-চাল সরবরাহ করেনি।

গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টার চাষি শরিফুল ইসলাম, জোনাব আলী, পীরগাছা উপজেলার কল্যাণীর সাইদুর রহমান, মহিবুল ইসলাম, রংপুর সদরের গঞ্জিপুরের নয়া মিয়া ও শুকুর আলী অভিযোগ করেন, খাদ্যগুদাম কর্মকর্তারা ধান কেনার চেয়ে মিলারদের কাছ থেকে চাল কিনতে বেশি উৎসাহী। গুদামে ধান নিয়ে গেলে ময়েশ্চারের দোহাই দিয়ে তা কিনতে অনীহা প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া ‘উপরি’ তো দিতেই হয়। অন্যদিকে হাসকিং মিল ও অটোমেটিক রাইস মিলের কয়েকজন জানিয়েছেন, এবার বাজারে ধানের দাম বেশি। ফলে গুদামে চাল সরবরাহ করতে গেলে কেজিপ্রতি দুই টাকা লোকসান হয়। ফলে তাঁরা ইচ্ছে থাকলেও চাল দিতে পারেননি।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে রংপুর অঞ্চলের খাদ্য নিয়ন্ত্রক আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমরাও মহাবিপদে আছি। ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান নিয়ে ওপর মহলের চাপ আছে।’ পরিস্থিতি যথেষ্ট অনুকূলে থাকায় সংগ্রহ অভিযান সফল হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা