kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

দুর্বৃত্তচক্রের নিয়ন্ত্রণে ভৈরবের মেঘনাপার

পর্যটক, পুলিশসহ ১৬ খুন তিন বছরে

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুর্বৃত্তচক্রের নিয়ন্ত্রণে ভৈরবের মেঘনাপার

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের মেঘনাপারের এ জায়গাটি দৃষ্টিনন্দন। গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সেতুর পাশাপাশি নদীর তীরে ফেলা হয়েছে পাথর। প্রতিদিন ভিড় করছে পর্যটকরা। কিন্তু তাদের নিরাপত্তায় নেই কোনো ব্যবস্থা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র মেঘনা নদীর পার এখন ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণে। এখানে অহরহই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, এমনকি হত্যাকাণ্ডও ঘটছে। ছিনতাইকারী ও দুর্বৃত্তদের হাতে গত তিন বছরে এ এলাকায় অন্তত ১৬ জন খুন হয়েছে। নিহতদের বেশির ভাগ পর্যটক হলেও এ তালিকায় পুলিশ সদস্য এবং ছিনতাইকারীও রয়েছে। ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে শতাধিক পর্যটক আহত হয়েছে। পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভৈরবের মেঘনাপারে রেলওয়ের দুটি এবং সড়কপথে একটিসহ মোট তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু রয়েছে। মেঘনা নদীর পারজুড়ে বড় বড় পাথর ফেলা হয়েছে। এসব কারণে স্থানটি দিনে দিনে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠায় তা পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। প্রশাসন এ এলাকাকে কেপিআই (কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) অঞ্চল ঘোষণা করে। সেতুগুলোর নিরাপত্তায় এখানে আটজন পুলিশ সদস্যকে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে রাখা হয়। সরাসরি কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করে। তবে পর্যটক ও স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ওই অঞ্চলে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় না; যে কারণে মেঘনার পারে নানা অঘটন ঘটছে। আবার কেপিআই পুলিশ সদস্যদের ভাষ্য, মেঘনার পার অরক্ষিত থাকলেও তা দেখভালের দায়িত্ব তাঁদের নয়। শুধু সেতু পাহারার জন্য তাঁদের নিয়োগ করা হয়েছে। ফলে পর্যটকদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে চলছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত।

কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ‘বিষয়টি আমি জেনেছি। ওই এলাকায় আসা দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ভৈরব থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছি।’ 

পুলিশ জানায়, গত ১৩ আগস্ট দুপুরে মেঘনাপারের রেলওয়ে সেতু এলাকায় ছিনতাই শেষে মালামাল ভাগাভাগি নিয়ে ছিনতাইকারীদেরই একজনের ছুরিকাঘাতে বাপ্পী নামের এক ছিনতাইকারী ঘটনাস্থলে নিহত হয়। এ সময় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে চার শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। গত বছরের জুলাই মাসে ৯ দিনের ব্যবধানে নারী পর্যটকদের উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করতে গিয়ে দুই ব্যক্তি খুন হয়েছেন। তাঁরা হলেন নরসিংদীর রমজান মিয়া ও নবীনগরের জনৈক যুবক। গত বছরের ৩০ অক্টোবর ইমরান হোসেন নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। এর কিছুদিন পর সেতুর টোল প্লাজার কাছে ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হন ভৈরবের শ্রীনগরের অ্যাডভোকেট ইসমাইল হোসেন পলাশ। ২০১৫ সালে সেতু এলাকা থেকে বিলকিস আক্তার নামে এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত বছর রেল সেতু সংলগ্ন এলাকায় এক বখাটেকে আটক করতে গিয়ে কনস্টেবল আরিফুল ইসলাম ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হন। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে ডালিম মিয়া নামের এক পথচারী গুরুতর আহত হন। এর আগে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মোস্তাফিজুর রহমান ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হন। ঘটনার সময় তিনি এক ছিনতাইকারীকে আটক করলে ওই ছিনতাইকারী তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে।

মেঘনার পারে বেড়াতে আসা নারী দর্শনার্থীরা বরাবরই বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার হয়। প্রাণের ভয়ে দর্শনার্থীরা অপরাধীদের কিছু বলতে পারে না। বখাটেরা নদীর পারে প্রতিনিয়ত আড্ডা দেয়। বিশেষ করে প্রতিদিন বিকেলে অসংখ্য মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে মেঘনাপারে এলে দুর্বৃত্তরা তাদের স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়। মূলত দর্শনার্থীদের ঘিরেই এখানে দুর্বৃত্তচক্র গড়ে উঠেছে। কিন্তু পর্যটকদের নিরাপত্তায় পুলিশের কোনো তদারক কার্যক্রম না থাকায় প্রকৃত অর্থে মেঘনাপার অরক্ষিত হয়ে আছে। এ সুযোগে ছিনতাইকারীরা হয়ে উঠেছে বেপরোয়া। কেপিআই এলাকা পাহারায় থাকা পুলিশ সদস্যরাও যথাযথ দায়িত্ব পালন না করায় সেই এলাকাটিও অরক্ষিত।

গত ৩ সেপ্টেম্বর ভৈরবের এ পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরতে এসে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন ভৈরবের শিবপুর ইউনিয়নের ছনচরা গ্রামের আরিফুল হক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় পুলিশ নিয়োজিত থাকলে এ ধরনের ছিনতাই, হত্যাকাণ্ড বা ইভ টিজিংয়ের ঘটনা ঘটত না। তাই জরুরি ভিত্তিতে মেঘনাপারের ওই পর্যটনকেন্দ্রে পুলিশ নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।’ ভৈরব পৌরসভা মেয়র অ্যাডভোকেট ফখরুল আলম আক্কাছ বলেন, ‘জেলার আইন-শৃঙ্খলা কমিটিতে আমি বহুবার এসব ঘটনা তুলেছি। কিন্তু পুলিশ ভৈরবের মেঘনাপারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে বারবার ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে চলেছে।’

ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি মো. আবদুল মজিদ বলেন, ‘রেললাইনের ১০ গজের আওতাভুক্ত এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের (রেলওয়ে) থানার। এ এলাকার যেকোনো ঘটনা ঘটলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি। মেঘনাপার বা সেতু রক্ষা করা আমার পুলিশের দায়িত্ব নয়।’ ভৈরব থানার ওসি মো. মোখলেছুর রহমান জানান, সীমিতসংখ্যক পুলিশ দিয়ে তাঁকে ভৈরবের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হয়। এর পরও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। তিনি মেঘনাপারে বেড়াতে আসা লোকজনকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা