• ই-পেপার

বৈশ্বিক আধিপত্য, বিপন্ন বিশ্বশান্তি ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে করণীয়

  • ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, অধ্যাপক, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভোটাধিকার প্রয়োগ হোক ভয়ের ঊর্ধ্বে

মিমোসা সাহা,শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ (মাস্টার্স) পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভোটাধিকার প্রয়োগ হোক ভয়ের ঊর্ধ্বে

আমি এমন একটি নির্বাচন চাই, যা হবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক। নির্বাচনে যেন সত্যিকার অর্থে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয় এবং ভোটের ফলাফল নিয়ে যেন কোনো সন্দেহ বা প্রশ্ন না থাকে। আমি চাই, ভোটাধিকার প্রয়োগ হবে ভয়ের ঊর্ধ্বে থেকে, যেখানে একজন নারী ভোটার বা প্রার্থী হিসেবে কাউকে আলাদা করে চিন্তা করতে হবে না।

নির্বাচনের পরিবেশ অবশ্যই শান্তিপূর্ণ, সহিংসতামুক্ত ও নিরাপদ হওয়া দরকার। বিশেষ করে নারী ভোটার ও সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে কিংবা ভোট দেওয়ার সময় এবং ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় যেন কোনো ধরনের হয়রানি, হামলা, ভয়ভীতি বা প্রভাব বিস্তারের শিকার হতে না হয়। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভোটাধিকার প্রয়োগ হোক ভয়ের ঊর্ধ্বেনির্বাচনের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পেশিশক্তির ব্যবহার, কালো টাকার প্রভাব, ভোট কারচুপি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানো এবং নারী প্রার্থীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিএসব বড় সমস্যা। অবৈধ অস্ত্র, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও সরকারবিরোধী পক্ষের বাধাএসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

গণভোট ও সংস্কার নিয়ে আমার ভাবনা হলো, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার, যেমননির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।

নির্বাচিত সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ সৃষ্টি করে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো পরিবেশ তৈরি করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়। একটি দায়িত্বশীল সরকারই পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মব দমন, দুর্নীতি কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রাধিকার চাই। একটি স্বনির্ভর, সুন্দর, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত, ধর্মনিরপেক্ষ, শক্তিশালী অর্থনীতির নতুন একটি বাংলাদেশ চাই।

বিক্রয়যোগ্য নাগরিকই ক্রীতদাস

ইফতেখার শারিকুল, শিক্ষার্থী, আর্কিটেকচার বিভাগ পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বিক্রয়যোগ্য নাগরিকই ক্রীতদাস

আমি এমন একটি নির্বাচন চাই, যেখানে পাঁচ বছর পর পর যে হুল্লোড়টি আমাদের দেশে হয়—ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও সংগঠনের মধ্যকার ক্ষমতায় আরোহণের সংগ্রাম, গদি ভাগাভাগির বোঝাপড়া এবং ভোট কেনার প্রতিযোগিতা—তা আর হবে না। গণতন্ত্র যে অধিকারের ভিত্তিতে নাগরিকদের নেতা নির্বাচন করার সুযোগ দেয়, সেই অধিকার যেন বিক্রয়যোগ্য না থাকে। ভোটাধিকার বিক্রি হয়ে গেলে নাগরিক প্রজায় পরিণত হয়। ফলে এই বদ্বীপের স্বাধীনতার পরেও এখানকার বাসিন্দারা নাগরিক হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েও প্রজাই থেকে গেছে। রাজা কিংবা জমিদারের পদগুলো দখল করেছে নব্য তালুকদাররা। এই তালুকদারদের সংসদে আইন প্রণয়নের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখা যায় না। তারা তাদের পাইক-পেয়াদা দিয়ে মাঠঘাট, হাট-বাজার থেকে খাজনা আদায়ের সংস্কৃতি অব্যাহত রেখেছে।

বিক্রয়যোগ্য নাগরিকই ক্রীতদাসনির্বাচনের পরিবেশ এমন হওয়া দরকার, যেখানে সংসদ সদস্যরা কী করতে পারেন এবং কী পারেন নাতা স্পষ্ট থাকে। আজকের বাস্তবতায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরা নির্বাচনী এলাকায় যেসব সড়ক ও সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন, তা স্থানীয় সরকারের আওতায় এবং তা পূরণ করার পদাধিকার সংসদ সদস্যদের নেই। এই মিথ্যাচারের সংস্কৃতি থেকে নির্বাচনী পরিবেশকে বের করে আনা জরুরি।

নির্বাচনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো গোত্রপ্রধানদের পরিবর্তে উপযুক্ত আইন প্রণেতাদের জন্য সংসদের আসন নিশ্চিত করা। সংসদের উচ্চকক্ষের সংযুক্তি এই লক্ষ্যে কিছুটা অগ্রগতি আনতে পারে, তবে সেটিও যদি বিভিন্ন রাজপরিবারের মনমর্জির ওপর নির্ভর করে, তাহলে সংকট থেকেই যাবে।

গণভোট ও সংস্কার নিয়ে আমার ভাবনা খুব সরল। অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূসের সরকারের সেইফ এক্সিটের ফ্যান্সি নাম হচ্ছে সংস্কার। এই জনপদের মানুষের মুক্তির লড়াই বিভিন্ন রাজপরিবারের বিবেচনার দারস্থ করেছে সংস্কারবিষয়ক জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। আর গণভোটের ব্যাপারে বলতে গেলে শূন্যের সঙ্গে যা-ই গুণ করা হোক, ফল শূন্যই থাকে।

নির্বাচিত সরকার তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে বাধ্য নয়। কারণ নির্বাচনী জনসভার সঙ্গে যাত্রাপালার মঞ্চের গুণগত তেমন তফাত নেই। এবং এই গ্লোরিফায়েড যাত্রাপালার অভিনেতারাও কিন্তু বেশির ভাগই বিক্রয়যোগ্য। এদের অনেকে আবার ভাড়ায় চালিত।

নির্বাচিত সরকারের কাছে আমার কোনো প্রত্যাশা নেই। তবে নির্বাচনে ভোটদানকারী জনগণের কাছে কিছু চাওয়ার আছে। আপনারা নিজেদেরকে আপনাদের নেতাদের মতো বিক্রয়যোগ্য করে তুলবেন না। কারণ যে জনগণ পাঁচ বছরে এক দিন সামান্য কিছু নগদ পয়সা, বিরিয়ানি, ফুস-পানির (কোল্ড ড্রিকংস) লোভ সামলাতে পারে না, তাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসা কোনো লোক হাজার কোটি টাকার লোভ সামলাবেসে আশা করাই পাপ। নেতা নির্বাচন একটি সামাজিক ইবাদত। নিজেদের বিক্রি করে সেই ইবাদত সম্ভব নয়। নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় সমাজের বেশির ভাগ মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত থাকলে পুরো সমাজকেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।

একান্ত সাক্ষাৎকারে খাগড়াছড়ি মং সার্কেলের অষ্টম রানি উখেংচিং মারমা

ষড়যন্ত্রের কথা বলে মূল সমস্যাগুলো আড়াল করা হয়

জন্ম খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চোংড়াছড়ি গ্রামে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) লিঙ্গুইস্টিক অ্যান্ড ফিলোসফি বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। বাংলাদেশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এমআইটিতে মাস্টার্স করা প্রথম ব্যক্তি উখেংচিং মারমা। খাগড়াছড়ি মং সার্কেলের অষ্টম রানি তিনি। এমআইটিতে পড়া, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর ভাষা, শিক্ষা, রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে এই গবেষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

ষড়যন্ত্রের কথা বলে মূল সমস্যাগুলো আড়াল করা হয়

নৃগোষ্ঠী

 

কালের কণ্ঠ : এমআইটিতে ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে পড়েছেন। সেখানে যা শিখেছেন, সেটা নিজের জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কিভাবে কাজে লাগাচ্ছেন?

ষড়যন্ত্রের কথা বলে মূল সমস্যাগুলো আড়াল করা হয়উখেংচিং মারমা : এমআইটিতে ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সুবাদে নিজ ভাষাটা আরো ভালোভাবে বোঝার সুযোগ হয়েছে। সেখানে গবেষণা করতে গিয়ে মারমা ভাষার ব্যাকরণের অভাব বুঝতে পেরেছি, যেটা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাজ করা দরকার। ভাষা রক্ষা করা একজনের কাজ নয়, এ জন্য সমাজের সব স্তরের মানুষের এগিয়ে আসা জরুরি। নিজের জায়গা থেকে আমরা ভাষা নিয়ে কাজ করার জন্য সবাইকে উত্সাহিত করি, পলিসি রিফর্মেশনে আমাদের বিভিন্ন ইনপুট থাকে। আমাদের একটা টিম আছে, যেখানে আমরা বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলে বসবাসরত বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ভাষা পলিসি নিয়ে কাজ করার উদ্যোগ নিচ্ছি। কারণ বাংলাদেশে আমাদের ভাষাগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট পলিসি নেই। গত বছর আমরা ইউনেসকোর ইন্টারন্যাশনাল ডিকেড অব ইনডিজেনাস ল্যাঙ্গুয়েজ  (International Decade of Indigenous Languages)-এর আয়োজনে অংশ নিয়েছি। আশা করি, ভবিষ্যতেও আমরা কাজ অব্যাহত রাখব।

 

কালের কণ্ঠ : পাহাড়ের শিশুদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভাষা একটা বড় বাধা। কয়েক বছর আগে সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রিএই পাঁচ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা কতটা কাজে দিচ্ছে?

উখেংচিং মারমা : বিগত সরকারের সময়ে পাঁচটি জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও বিতরণের উদ্যোগ অবশ্যই অনেক প্রশংসার দাবিদার।ষড়যন্ত্রের কথা বলে মূল সমস্যাগুলো আড়াল করা হয় কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। সমাজের বিশিষ্ট ও বুদ্ধিজীবীমহল অনেক দিন ধরেই বলে আসছে, শুধু পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও বিতরণ করলেই তো হবে না, সেটা বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্নমুখী যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বেশির ভাগ শিক্ষকই নিজ ভাষায় লিখতে-পড়তে পারেন না। সে ক্ষেত্রে তাঁদের অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ বছর মাতৃভাষার বইগুলোতে প্রতিবর্ণীকরণ যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিবর্ণীকরণ বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই আমরা এটা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছি। কারণ মারমা ভাষার কথা যদি আমরা ধরি, এটি একটি টোনাল ও তিব্বত-বর্মী ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ভাষা। মারমা ভাষার নিজস্ব ধ্বনিতাত্ত্বিক কাঠামো, উচ্চারণব্যবস্থা এবং লিখনরীতি রয়েছে, যা বাংলা থেকে আলাদা। বাংলা ভাষার মতোই মারমা লিপিতে বিভিন্ন ধ্বনিচিহ্ন বা স্বরচিহ্ন রয়েছে, যা মূল অক্ষরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উচ্চারণগত, স্বর বা ধ্বনিগত পার্থক্য নির্দেশ করে। ২০২৬ সালের নতুন পাঠ্যপুস্তকে চাকমা ও মারমা ভাষার বইগুলোতে সংশ্লিষ্ট ভাষার লিপির পাশাপাশি বাংলা লিপির বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবর্ণীকরণের মাধ্যমে এই দ্বৈত বর্ণমালার পদ্ধতি শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জনে এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে চরমভাবে বিঘ্ন ঘটাবে বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন। এটি করার সময় কমিউনিটির সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। কমিউনিটি কনসেন্ট ছাড়াই এত বড় একটা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আমাদের শিশুদের নিয়ে সিদ্ধান্তে তো কমিউনিটির মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। কারণ প্রতিবর্ণীকরণের মাধ্যমে শিশুরা কখনো টোন-অ্যালফাবেট ইন্টার্যাকশন শিখবে না। এমনকি যে শিক্ষকরা নিজ ভাষায় অদক্ষ, তাঁরাও শিশুদের এই প্রতিবর্ণীকরণের মাধ্যমে ভুলভাবে মাতৃভাষায় পাঠদান করবেন।

 

কালের কণ্ঠ : পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হলেও যোগ্য শিক্ষক কি মিলছে? না হলে সমাধান কী?

উখেংচিং মারমা : শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কমিউনিটি লেভেলে অনেক সংস্থা আছে, তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করে ভাষার জন্য আলাদা শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। সরকার যদি সময় নিয়ে যথাযথভাবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, তাহলে অবশ্যই এই প্রণয়নকৃত পাঠ্যপুস্তকের সঠিক ব্যবহার হবে। না হলে আগামী কয়েক দশকেও মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতির কোনো উন্নয়ন হবে না।

 

কালের কণ্ঠ : পাহাড়ে উন্নয়ন নিয়ে নানা কথা হয়। অনেকে বলেন, সবকিছু পর্যটনকেন্দ্রিক। পর্যটন, না শিক্ষাপাহাড়ে কোনটা বেশি জরুরি?

উখেংচিং মারমা : গত কয়েক দশকে পাহাড়ের উন্নয়নকে নিখুঁত পরিকল্পনা করেই পর্যটনকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলা হয়েছে। এবং অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ের ভূমিপুত্রদের উচ্ছেদ করে সেখানে পর্যটন স্পট গড়ে তোলা হয়েছে। বাস্তবতার নিরিখে আসলে পর্যটন স্পটগুলোর আশপাশে যাদের বসতি, তাদের শিক্ষাসহ অন্যান্য জীবনমান উন্নয়নে অবশ্যই স্থানীয় সরকারকে আরো নজর দিতে হবে। সেখানে যারা বাস করছে, তাদের ইকোট্যুরিজমের ওপর প্রশিক্ষণ দিতে দেওয়া যায়। আবার পাহাড়ে যেসব পর্যটক ঘুরতে আসছেন, অনেক সময় তাঁরা স্থানীয়দের ধর্ম-সংস্কৃতিকে সম্মান করছেন না। পাশাপাশি তাঁরা আরো বেশি প্লাস্টিকদূষণ করে পরিবেশের ক্ষতি করে চলে যাচ্ছেন।

পাহাড়ের উন্নয়নে অবশ্যই শিক্ষাকে জোর দিতে হবে। পার্বত্যবাসীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য দুর্গম এলাকায় ভালো স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সুচিকিত্সার জন্য হাসপাতাল গড়ে তোলাও জরুরি। পাহাড়ের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা দরকার, কারণ সেটাই শিশুদের ভিত্তি। পাশাপাশি আমরা এখন হাই স্কুলের পরেও অনেক ঝরে পড়া শিক্ষার্থী দেখছি, যাদের কর্মসংস্থানের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সরকারকে কাজ করা দরকার।

কালের কণ্ঠ : চাকমা, মারমা কিংবা গারোদের তুলনায় খুমি, ম্রো, লুসাই কিংবা খিয়াংয়ের মতো নৃগোষ্ঠীগুলো বেশ পিছিয়ে। তাদের মূল স্রোতে ফেরাতে করণীয় সম্পর্কে বলুন।

উখেংচিং মারমা : এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে চাকমা, মারমাদের চেয়ে বাকি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ পিছিয়ে আছে। জনসংখ্যার দিকেও তারা কম। বাকি যে জনগোষ্ঠীগুলো পিছিয়ে আছে, তাদেরও সাম্যের দৃষ্টিতে দেখতে হবে সবাইকে। বাকিরা পিছিয়ে থেকে একটা জনগোষ্ঠী এগিয়ে গেলেই তো হবে না। আমরা যেমন মং রাজার কার্যালয় থেকে ২০২০ সাল থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সঙ্গে সমন্বয় করে ১০০ জনের মতো ছাত্রী ভর্তি করিয়েছি। আমরা সাম্যের দিক থেকে বিচার করে মারমা-চাকমা বাদেও অন্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে আনতে অ্যাডভোকেসি করেছি। এখন সেখানে চাক, ম্রো, বম, খিয়াং, সাঁওতাল ছাত্রীরাও পড়াশোনা করছে।

 

কালের কণ্ঠ : নানা কারণে বিভিন্ন সময় পাহাড় অশান্ত থাকছে। সেখানে কিছু ঘটলেই অনেকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বলেন। আসলে এর নেপথ্যে কী আছে বলে মনে করেন?

উখেংচিং মারমা : পাহাড়ের ঘটনাগুলোকে মব সৃষ্ট ঘটনার সঙ্গেই তুলনা করা যায়, যেখানে প্রতিটি ঘটনায় একটা পক্ষই হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হতাহতের শিকার হয়ে আসছে। আর মব ঘটনার মতোই এই ঘটনাগুলোর কোনো বিচার পাওয়া যায় না; এবং কয়েক দশক ধরে সহিংসতার চক্র চলমান রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল পরিস্থিতি বলতে আমাদের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বনাম বাস্তবতা বুঝতে হবে, যেখানে ভূমি নিয়ে বিরোধ বড় একটা বিষয়। সঙ্গে আরো অনেক কিছু তো জড়িত আছেই। যে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়, সেটা আসলে মূল সমস্যাগুলোকে আড়াল করে। যখনই পাহাড়ে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটে, বিদেশি হাত বা বিচ্ছিন্নতাবাদী চক্রান্তর কথা বলে মূল বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়। অনেক সময় অনেক প্রিন্ট এবং অন্যান্য যে মিডিয়া আছে, সেগুলোও সেভাবেই পাহাড়িদের বিরুদ্ধে এই ন্যারেটিভ উপস্থাপন করে। সহিংসতার ঘটনায় কারা আক্রমণ করল, কেন বিচার পেল না, কাদের স্বার্থে এই সহিংসতাএই প্রশ্নগুলোর উত্তর এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের মধ্যে হারিয়ে যায়।

 

কালের কণ্ঠ : একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বম জনগোষ্ঠীর অনেকে দীর্ঘদিন ধরে বন্দি। জামিন পাওয়ার যে নাগরিক অধিকার, তাদের ক্ষেত্রে এটার বাস্তবায়ন নিয়েও অনেকের প্রশ্ন আছে?

উখেংচিং মারমা : বম জনগোষ্ঠীর অনেক নিরীহ ও নির্দোষ ব্যক্তি এখনো ৬৫০ দিনের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের ক্ষেত্রে জামিনের প্রক্রিয়াটা খুব ধীরে হচ্ছে। তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের আরো সদয় হওয়ার আহ্বান আমাদের সবার। অনেক স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বম ছেলেমেয়ে বিনা দোষে এখনো কারাগারে রয়েছে, তাদের শিক্ষাজীবন এখন হুমকির মুখে।

 

কালের কণ্ঠ : ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে কী ধরনের অঙ্গীকার প্রত্যাশা করেন?

উখেংচিং মারমা : পুরো বাংলাদেশের মতো পাহাড়ও জাতীয় নির্বাচনের জন্য অপেক্ষায়। প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার আগে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে আশ্বস্ত করেন যে পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সব সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থান নিশ্চিত করবেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পরে সেটার বাস্তবায়ন খুব কম দেখা যায়।

আবার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে শুধু ভোটব্যাংকের মতো ব্যবহার না করে তাদের প্রকৃত অধিকার ও দাবি বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার আমরা আশা করি মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই তাদের পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিতে হবে। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর এর বাস্তবায়ন তেমন একটা দিয়ে দেখা যায় না। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো যেন পাহাড়ি সম্প্রদায়গুলোকে ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার না করে, প্রকৃত দাবি ও অধিকার রক্ষায় তাদের পাশে থাকে। 

 

 

 

 

 

ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ কি আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন যুগের সূচনা?

আরিয়াপালা যথীন্দ্র, ত্রিনকো সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (টিএসএসটি) প্রধান এবং শ্রীলঙ্কাভিত্তিক একজন স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ কি আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন যুগের সূচনা?

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনায় তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। বর্তমানে মাদুরো নিউইয়র্ক সিটিতে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক আইনের দ্বারা নয়, বরং বৃহত্ শক্তি ও তাদের জোটের স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেও কেউ কেউ এই ঘটনাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পুতিনায়ন’ (Putinization) বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে আরো গভীর প্রশ্ন হলো, কোনো একক প্রেসিডেন্ট কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উপেক্ষা করে জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, নাকি এসব পদক্ষেপ আসলে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন আধিপত্যের ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন?

 

ঐতিহাসিক তুলনা : পানামা ও ভেনেজুয়েলা

ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ কি আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন যুগের সূচনা?পরাশক্তির প্রতিযোগিতার ইতিহাসে চোখ রাখলে বিস্ময়কর মিল পাওয়া যায়। ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশ পানামায় আগ্রাসনের নির্দেশ দেন এবং স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে অভিযুক্ত করেন। বুশ প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপের পক্ষে যুক্তি ছিল পানামা খাল চুক্তি লঙ্ঘন, মাদকপাচার এবং এক মার্কিন মেরিন কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে নরিয়েগা ফলাফল বাতিল করে নিজের এক সহপাঠীকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করলে ওয়াশিংটন কঠোর পদক্ষেপ নেয়।

৩৬ বছর পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে প্রায় একই পথে হাঁটলেন। জাতিসংঘ এই পদক্ষেপকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে নিন্দা করলেও ওয়াশিংটন তাতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। পুরো পরিস্থিতি যেন আগে পদক্ষেপ, পরে স্থিতিশীলতা নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে। পানামা কিংবা ইরাকের মতোই, নতুন রাজনৈতিক সংকটের ঢেউ এলে এই ঘটনাও হয়তো দ্রুত আড়ালে চলে যাবে।

তবে দুটি ঘটনার মধ্যে পার্থক্যও আছে। পানামার ক্ষেত্রে নরিয়েগার জাতীয় পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ভেনেজুয়েলায় মাদুরো কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন, যা নরিয়েগার কৌশলেরই প্রতিধ্বনি। উভয় ক্ষেত্রেই সামরিক হস্তক্ষেপের আগে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ ব্যর্থ হয়েছিল। রিগ্যান প্রশাসন নরিয়েগাকে সরাতে কূটনীতির আশ্রয় নিলেও তত্কালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট বুশ আপসের বিরোধিতা করেন। একইভাবে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা মাদুরোকে সরাতে ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন শক্তি প্রয়োগে যায়।

 

সংঘাতের পথে ভেনেজুয়েলা

ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েনের শুরু হুগো শাভেজের উত্থানের পর, ১৯৯০-এর দশকে। তাঁর সমাজতান্ত্রিক নীতি ও মার্কিনবিরোধী বক্তব্য, পাশাপাশি চীন, ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে তীব্রভাবে টানাপোড়েনে ফেলে। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এক অভ্যুত্থান শাভেজকে উত্খাত করতে ব্যর্থ হয়। ২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো সেই নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন এবং সংকট আরো গভীর হয়। ২০১৮ ও ২০২৪দুই নির্বাচনেই কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখেন তিনি প্রবল বিরোধিতার মধ্যেও। ট্রাম্প ২০২৫ সালের শেষ দিকে মাদুরোকে সরে দাঁড়াতে সতর্ক করলেও নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন সামরিকভাবে শাসন পরিবর্তনের পথ বেছে নেয়।

এসব পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে এটি পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। লাতিন আমেরিকায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ওয়াশিংটনের জন্য বড় উদ্বেগ। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ কথা স্পষ্ট করে বলেন, এটি পশ্চিম গোলার্ধ। এখানেই আমরা বাস করি এবং আমরা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুদের এখানে ঘাঁটি গড়তে দেব না।

মাদুরোকে আটকের কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।

২০১৭ সালে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল চীনকে কেন্দ্র করে মহাশক্তির প্রতিযোগিতায় মনোযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে মাদুরো অপসারণকে মনরো নীতির পুনর্জাগরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়, যাকে বলা হচ্ছে ট্রাম্প করোলারি। সেখানে বলা হয়েছে, বহু বছরের অবহেলার পর যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে তার শ্রেষ্ঠত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, অ-গোলার্ধীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের এখানে শক্তি মোতায়েন বা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেওয়া হবে না।

 

মনরো নীতি ও তার উত্তরাধিকার

১৮২৩ সালে ঘোষিত মনরো নীতি ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে আমেরিকায় হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করেছিল। ১৯০৪ সালে থিওডোর রুজভেল্ট এটি সম্প্রসারণ করে যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক পুলিশি ক্ষমতা প্রদান করেন। পরে ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট গুড নেইবার নীতির কথা বললেও শীতল যুদ্ধের বাস্তবতায় তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

সিআইএ লাতিন আমেরিকাজুড়ে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে একাধিক সরকার উত্খাত করে সোভিয়েত প্রভাব ঠেকাতে চেয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলা প্রথম নয়, এবং সম্ভবত শেষও নয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো নেতাকে উত্খাতে ভূমিকা রাখল।

 

আঞ্চলিক আধিপত্য : পুরনো ধারা, নতুন বাস্তবতা

প্রশ্ন হলো, ভেনেজুয়েলাতেই কি ওয়াশিংটনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেমে যাবে, নাকি এটি শীতল যুদ্ধ পরবর্তী সময়কার আঞ্চলিক আধিপত্যে ফেরার ইঙ্গিত? ইতিহাস বলে, ছোট রাষ্ট্রগুলো ভালো প্রতিবেশী হিসেবে আচরণ না করলে বড় শক্তির হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে। দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্দিরা গান্ধীর সময় ভারতের হস্তক্ষেপগুলো এই বাস্তবতার উদাহরণ। হেনরি কিসিঞ্জারের ভাষায়, শৃঙ্খলা তৈরি করতে হলে আগে অঞ্চলভিত্তিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলায় ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ শুধু একটি কৌশলগত আঘাত নয়, বরং আঞ্চলিক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্পষ্ট বার্তা। আবারও যেন সেই দরজা খুলে গেল, যেখানে খারাপ প্রতিবেশী তকমা পেলেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সামরিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া হয়। (অনূদিত) 

 

 

 

 

 

,