kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

বঙ্গবন্ধুর শেষ ছবি

১১ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর শেষ ছবি

১৫ই আগস্ট বাঙালির কষ্টের দিন। ১৯৭৫ সালের ওই দিনটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাণ হারান। বুলেটবিদ্ধ বঙ্গবন্ধু পড়ে ছিলেন সিঁড়িতে। সেই ছবি অনেক দিন দেখতেই পায়নি বাঙালি। ১৯৮১ সালে যখন দেখল তখন কেঁদে উঠেছিল বাংলাদেশ। তিনজন ফটোসাংবাদিক গোলাম মাওলা, ওয়াসে আনসারী ও স্বপন সরকার যুক্ত ছিলেন ছবিটির সঙ্গে। সেসব ঘটনা শুনেছেন মোহাম্মদ আসাদ

 

গোলাম মাওলা তুলেছিলেন সে ছবি

জন্ম ১৯৩৫ সালে ফেনী জেলার সোনাপুর উপজেলায়। ১৯৬৫ সালে দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় ফটোসাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। দেশ স্বাধীন হলে পত্রিকাটির নাম হয় দৈনিক বাংলা। গোলাম মাওলা তার প্রধান আলোকচিত্রী। অনেক ছবি তুলেছেন জীবনে, তবে কখনোই ভাবেননি ১৫ই আগস্টে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহের ছবি তাঁকে তুলতে হবে। মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলেন। ১৯৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

 

ওই কালো দিন

গোলাম মাওলা ১৪ আগস্ট রাতে অফিসেই ছিলেন। সকাল হয়ে এলে সেনাদের একটি দল দৈনিক বাংলা অফিসে হানা দেয়।   গোলাম মাওলাকে নিয়ে যায় ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। গিয়ে দেখেন বুলেটবিদ্ধ বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ পড়ে আছে সিঁড়ির ওপর। বন্দুকের নল তাক করা ছিল তাঁর দিকে। ছবি তোলা শেষে অফিসে এসে আর কাজ করার শক্তি পাননি গোলাম মাওলা। ডার্করুমের (ছবি প্রিন্ট করার) কাজ করতে দিয়েছিলেন সহকর্মী ওয়াসে আনসারীকে।

 

তিনি ছবি বানাতে লাগলেন

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যাবেন বঙ্গবন্ধু। ওয়াসে আনসারী ছবি তোলার দায়িত্ব (অ্যাসাইনমেন্ট) পেয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন বলে বাড়ির উঠান থেকে মোটরসাইকেল বের করছিলেন। তখনই রেডিওতে ঘাতকদের ঘোষণা শুনলেন। তারপর আর দেরি না করে সোজা চলে গিয়েছিলেন অফিসে (দৈনিক বাংলা)। গিয়ে শুনলেন গোলাম মাওলাকে সেনারা নিয়ে গেছে। তারপর একসময় ক্লান্ত, বিধ্বস্ত গোলাম মাওলা ফিরে এলেন। বললেন, ‘আনসারী, আমি যা দেখে এলাম, ছবি বানাতে পারব না। তুমি ফিল্মগুলো নাও, ডেভেলপ করো।’

 

আবার ঠক ঠক

ডার্করুমে ঢোকার পরপরই আনসারী ঠক ঠক শব্দ শুনতে পেলেন। ‘দরজা খুলে দেখি বন্দুক হাতে কয়েকজন সেনা দাঁড়িয়ে আছে।

তারা বলল, কী করছেন?

—ছবি বানাচ্ছি।

—দেখি তো কী ছবি বানাচ্ছেন। বলে ভেতরে ঢুকল।

আমি বাতি নিভিয়ে ফিল্মগুলো ডেভেলপ করলাম। ওয়াশ করে ক্লিপ দিয়ে ঝুলিয়ে দিলাম।  আমার কাছে জানতে চাইল, ‘এখন আপনি কী করবেন?’

—বললাম, আগে শুকাব। তারপর ছবি বানাব। কিছুক্ষণ পর বললাম, এখন শুকিয়েছে, ছবি বানাতে পারব।

—তারা বলল, ছবি বানান।

—বললাম, এখন আবার লাইট নিভিয়ে দিতে হবে।

—বলল, বারবার লাইট নিভান কেন? বললাম, ‘লাইট না নেভালে তো ছবি হবে না। লাইট নিভিয়ে প্রিন্ট করলাম।’

—ওরা বলল, ‘আরো করেন, আরো করেন।’ বলতে বলতে সব কটা ছবি প্রিন্ট করাল। তিন অথবা চার রিল ছিল। ছবিগুলো দেওয়ার আগে দু-একটা ছবি এদিক-ওদিক ফেলে দিলাম। তারা বলল, ‘এগুলো ফেললেন কেন?’ বললাম, ‘ওয়েস্টেজ, ভালো হয়নি।’

—ওরা বলল, খারাপটাও দিয়ে দেন। ভেজা সেই ছবিগুলো গাট্টি বেঁধে নিয়ে চলে গেল।

অনেক দিন পর আর্মিরা আবার এসে গোলাম মাওলাকে ধরল। বলল, ‘বাইরে ছবি পাওয়া গেছে। আপনি কেন ছবি দিলেন?’ তখন গোলাম মাওলা রেগে গিয়ে বললেন, ‘ছবি একটাও রাখতে দিলেন না। নষ্ট ছবিগুলো পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। এখন বলছেন, আমরা বাইরে ছবি দিয়েছি! এটা কী ধরনের কথা? ছবি আপনারাই নিছেন, আপনারাই দিছেন। মাওলা ভাইয়ের চোটপাট দেখে তারা থেমে গেল।’ বলছিলেন ওয়াসে আনসারী।

তারপর অনেক দিন চলে গেল। শেষে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরলে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধুর সিঁড়িতে পড়ে থাকা ভয়াবহ সেই ছবির ফিল্ম।

 

নেত্রীও এলেন ডার্করুমে

স্বপন সরকারের কর্মজীবন শুরু ১৯৭৩ সালে সাপ্তাহিক সিনেমা পত্রিকার মাধ্যমে। বাংলার বাণী পত্রিকাগোষ্ঠীর একটি কাগজ ছিল সেটি। ১৯৮১ সালে নতুন করে চালু হয় বাংলার বাণী। স্বপন সরকার তাতে যোগ দিয়েছিলেন। বলছিলেন, ‘১৯৭৫ সালে বাংলার বাণী পত্রিকাগোষ্ঠীর সব কাগজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে যখন আবার সেলিম ভাই (শেখ ফজলুল করিম সেলিম) বাংলার বাণী বের করলেন তখন আমি ছাড়া আর কোনো ফটোসাংবাদিক নেই। এক-দুই বছর একাই চালিয়েছি।  ১৭ মে নেত্রী (শেখ হাসিনা) দেশে এলে সেখানেও আমি ছিলাম। একদিন সেলিম ভাই বললেন, ‘কাজ শেষ করে চলে যাস না, থাকিস। আমি চুপচাপ বসে আছি। নেত্রী এলেন সেলিম ভাইয়ের কাছে। সেলিম ভাই আমাকে বললেন ডার্করুমে যেতে। দোতলায় ডার্করুমে গেলাম। নেত্রীও এলেন ডার্করুমে। পার্সের (ছোট থলে) ভেতর থেকে দুটি কাটা নেগেটিভ বের করে দিলেন। মেশিনে উঠিয়ে প্রিন্ট করলাম চার-পাঁচটা।’ তখনো কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে গোপনীয়তা ছিল। যাহোক প্রিন্ট করে দিলাম। ভেজা ছবি নিয়েই সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে নেত্রী চলে গেলেন। শুনেছিলাম, নেত্রী ওই নেগেটিভ লন্ডন থেকে এনেছিলেন। তারপর পোস্টার, ব্যানারের মাধ্যমে সে ছবি ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ দেখতে পায় বঙ্গবন্ধুকে কত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা