৪ এপ্রিল ছিল শনিবার। রাত সাড়ে ১১টা হবে। ফোন বেজে উঠল। পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন হামজা ইসলাম। উঠে গিয়ে রিসিভ করলেন। শুনলেন, একজন কেউ অঝোরে কাঁদছেন। পরে লোকটি জানান, তাঁর মা মারা গেছেন। সন্দেহ করা হচ্ছে তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। এখন কী করবেন বুঝতে পারছেন না। কেউ এগিয়ে আসছে না। আত্মীয়-স্বজনও নয়। হামজা ইসলাম আল মারকাজুল ইসলাম বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক। দেরি না করে তাঁর মাদরাসার তিনজন শিক্ষককে সঙ্গে যেতে অনুরোধ করেন। পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) পরে চারজন রওনা হয়ে গেলেন নিজেদের লাশবাহী অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে। মোহাম্মদপুর থেকে কেরানীগঞ্জ পথ কম নয়। রাত ২টায় তাঁরা মৃতের বাড়িতে পৌঁছান। হামজা ইসলাম বলছিলেন, ‘মৃহদেহটি একা পড়ে ছিল। ভাবছিলাম এই মানুষ জীবনে কত কত মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। কত মানুষকে আপন করেছেন। আজ করোনা তাঁর কাছ থেকে সবাইকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা এখন প্রায় প্রতিদিনই পাঁচ-ছয়টি করোনা রোগীর লাশ দাফন করছি।’ শুরুর কথা ‘করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির লাশ দাফন করার প্রস্তাবটি প্রথম দেন আমার চাচা সম্পর্কীয় একজন। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ বৈঠকেও অংশ নিলাম। বৈঠকের কর্তাব্যক্তিরা আমাকে বলেন, ইসলামী নিয়ম-নীতি মেনে আমরা লাশ দাফন করতে পারব কি না। আমি বললাম, নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে আমরা এ কাজ করতে প্রস্তুত আছি। তারপর আমরা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের মাধ্যমে কাজ শুরু করি। প্রথম দিকে আমাদের সংস্থার পরিচালিত মাদরাসার চারজন শিক্ষক ও আমি ছিলাম দলে। পরে আমাদের সঙ্গে নিজ আগ্রহেই যুক্ত হয়েছেন আরো ১০ জন। তাই দুটি দলে ভাগ হয়ে যেতে পারলাম আমরা। লাশ দাফনের পরপরই পিপিই কবরস্থানেই পুড়িয়ে দিই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আমাদের পিপিই সরবরাহ করে যাচ্ছে,’ বলছিলেন হামজা ইসলাম। চোখের পানিটা ফেলতেও আসে না কেউ সাধারণত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকেই হামজা ইসলামের মুঠোফোনে খবর আসে। আইইডিসিআরের কাছেও তাঁদের নম্বর দেওয়া আছে। মৃতের খবর পাওয়ার পর একটি দলকে হাসপাতালে পাঠান হামজা। একবার এক বৃদ্ধের লাশ নিতে গিয়ে দেরি করতে হচ্ছিল। কারণ তাঁর ছেলে বাবাকে দেখতে আসবেন বলে জানিয়েছিলেন। দুই ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ছেলেটি এলেন না। সবাই ফোন করে করে হয়রান। শেষে ছেলেটি ফোন বন্ধ করে দেন। তারপর মারকাজুলের কর্মীরা তালতলা কবরস্থানে নিয়ে যান বৃদ্ধের মৃতদেহ। হামজা ইসলাম বলছিলেন, ‘আমরা সতর্ক থেকেই কাজটি করছি। আমাদের কর্মীরা পরিবার থেকে দূরে থাকছে। আমাদের অফিসে কয়েকটি কক্ষ থাকার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। লাশবাহী গাড়িগুলো অফিসের সামনে অ্যালকোহল ছিটিয়ে পার্ক করছি। ’ ছবি: শেখ হাসান