kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

আসবাব চক্কর

চেয়ার

পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস বুনেছে চেয়ার। বিভিন্ন দেশে তার নানা চেহারা। জানতে চেয়েছিলেন আরিবা রেজা

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চেয়ার

একটি আর্ট ন্যুভো চেয়ার

চার পায়ের চেয়ারের গোড়ার ইতিহাস পাওয়া যায় মিসরে। নকশায় ও উপকরণে চেয়ারগুলো আকর্ষণীয় হতো। হাতির দাঁতও ব্যবহৃত হয়েছে কোনো কোনো চেয়ারে। ফারাও খুফুর মা হেটেফেরেসের চেয়ারও পাওয়া গেছে। আসিরীয় সভ্যতার শহর নিনেভের একটি স্তম্ভে একটি চেয়ারের ছবি দেখা যায়, যার পাগুলো সিংহের থাবার মতো। রোমান চেয়ারগুলো হতো মার্বেলের। সাধু পিটারের চেয়ারটিও বেশ পুরনো। এটি রোমের সাধু পিটারের ব্যাসিলিকায় আছে। কাঠের তৈরি চেয়ারটি ষষ্ঠ শতকের। মধ্য যুগের চেয়ারগুলোর মধ্যে নামকরা হলো ল্যুভে রাখা চেয়ার অব ড্যাগোবার্ট। ড্যাগোবার্ট (মৃত্যু ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ) ফ্রাঙ্কদের রাজা ছিলেন। প্যারিসে ছিল তাঁর রাজধানী। চেয়ারটিতে শেষবারের মতো বসেছেন ১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। চীন চেয়ার নিয়ে অনেক কারিকুরি করেছে। চিং রাজবংশের সময় মানে আঠারো শতকে শিকড় দিয়ে তৈরি চীনা চেয়ার পাওয়া গেছে। আঠারো শতকেই চেয়ারকে পাতলা চেয়ার বানানোর প্রতিযোগিতা শুরু হলো, বিশেষ করে ইউরোপে। এখানে জর্জ হ্যাপেলহোয়াইট, টমাস সেরাটন ও রবার্ট অ্যাডামের নাম আসে। ফ্রান্সের চেয়ারচর্চা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। ১৭৬০ সালের দিকে প্যারিসিয়ান নিওক্লাসিক্যাল চেয়ারের দেখা পাওয়া যায়। ওই সময়ে লুই ডেলানয়, জঁ ক্লদ সেন, জর্জ জ্যাকব চেয়ারের পেছনে বেশ খাটুনি দিয়েছেন। উনিশ শতকে আর্ট ন্যুভো শিল্প আন্দোলন চেয়ারের ওপরও ছাপ পেলে। কম কারুকাজের চেয়ার আর্ট ন্যুভোরই ফল। বিশ শতক উপহার দিল ফোল্ডিং চেয়ার, প্রজাপতি চেয়ার বা ডিম চেয়ার। এই শতকে ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইটের মতো স্থপতিও চেয়ারে নকশা করেছেন।

 

বই লিখেছেন ভিটল্ড

কানাডিয়ান আমেরিকান স্থপতি ভিটল্ড রিবজিনস্কি ‘নাউ আই সিট মি ডাউন’ নামের চেয়ার নিয়ে বই লিখেছেন। তিনি বলেছেন, ‘চেয়ারের ইতিহাস পাঁচ হাজার বছরের কম নয়। আমার একটি দারুণ চেয়ার ছিল; কিন্তু আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন আমার চেয়ার কেড়ে নিল। বলল, ডায়াবেটিস আর হৃদরোগ থেকে যদি বাঁচতে চাও, তো চেয়ার ছাড়ো। আমি মেনে নিয়েছি এই ভেবে যে উইনস্টন চার্চিল আর আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো লোক দাঁড়িয়েই বেশি কাজ করেছেন। তাই বলে বসে কাজ করার মতো লোকের সংখ্যা হাতে গোনা ভাববেন না। জর্জ ওয়াশিংটন আর বেনজামিন ফ্রাংকলিনের কথাই ধরুন। তাঁরা যে রকম চেয়ারে বসতেন তার নাম উইন্ডসর চেয়ার।’ ষোলো শতকে চেয়ারটি প্রথম দেখা গেছে বাকিংহামশায়ারে। জাহাজে চড়িয়ে লন্ডনে আনা হতো। ইংরেজরাই চেয়ারটিকে আমেরিকায় নিয়ে আসে। প্যাট্রিক গর্ডন নামের একজনের কথা জানা যায়, যিনি উইন্ডসর চেয়ার আমদানি করতেন। ১৭২৬ সালে তিনি পেনসিলভানিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর হয়েছিলেন। ১৭৩০ সাল থেকে আমেরিকায়ই চেয়ারটি বানানো হতো।

ভিটল্ড বলেছেন, ‘পুরনো চেয়ার কিন্তু পুরনো মোবাইল ফোনের মতো নয়। সময় গেলে বরং আকর্ষণ বাড়ায়। চেয়ার ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। যেমন—প্রাচীন রোমান ডাইনিং কাউচ (দিনের বেলায় বসা বা শোয়ার জন্য গদি আঁটা আসন) দেখলে বুঝে যাবেন সম্পদশালী রোমানদের অনেক ভৃত্য ছিল। তাঁরা কাউচে শুয়ে যখন পাস্তা খেতেন, কেউ একজন দাঁড়িয়ে থাকত পাত্র হাতে।’

ভিটল্ডের দেখা সবচেয়ে বেশি বয়সী চেয়ারটি আছে একটি ভাস্কর্যে। গ্রিসের একটি দ্বীপে মিলেছে। একজন নারীকে একটি কিচেন চেয়ারে বসে হার্প বাজাতে দেখা যাচ্ছে। খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০ থেকে ২৭০০ অব্দে তৈরি হয়েছে এ ভাস্কর্য। চার পায়ের চেয়ারটির পিঠ রাখার জায়গাটি সোজা। পঞ্চম শতকে গ্রিকরা ক্লিসমস নামের একটি চেয়ার আবিষ্কার করে। এর পিঠ রাখার জায়গাটি বাঁকানো। চেয়ারটি প্রাচীন গ্রিসের নারী-পুরুষ, সংগীতশিল্পী, শ্রমিক-মালিক সবারই প্রিয় ছিল। ভিটল্ড বলেছেন, ‘মধ্য যুগেই সম্ভবত চেয়ারের শ্রেণিভেদ তৈরি হলো। জমিদার আর প্রজার চেয়ার ভিন্ন হয়ে গেল। যেসব চেয়ারে পিঠ রাখার ব্যবস্থা আছে, সেগুলোয় আর প্রজার অধিকার রইল না। ষোলো শতকের চিত্রকর পিটার ব্রুগেল কৃষকজীবনে যেসব ছবি এঁকেছেন, সেগুলো দেখলে আর কষ্ট হয় না বুঝতে। এখনকার অফিসে যেমন ব্যবস্থাপকের জন্য এক রকম আবার সেক্রেটারির (একান্ত সচিব অর্থে) জন্য আরেক রকম চেয়ার। পৃথিবীতে মানুষ আসলে দুই রকম—এক দল চেয়ারে বসে, অন্য দল মেঝেতে বসে। আপনি হয়তো ভাবছেন শীতপ্রধান দেশের লোকেরা মেঝেতে বসতে কষ্ট পায় বলে চেয়ারে বসে; কিন্তু জাপানের লোক তো প্রচণ্ড শীতেও মেঝেতেই বসে থাকে। খেয়াল করলে দেখবেন যারা চটের ওপর বসে তারা ঘুমায়ও চটের ওপর, আর যারা চেয়ার বসে তারা পালঙ্কে ঘুমায়। চেয়ারে বসা লোকজনই নানা পদের আসবাব বানিয়েছে। তাদের ডাইনিং টেবিল, ড্রেসিং টেবিল, কফি টেবিল, সাইডবোর্ড ইত্যাদি লাগে। ভারতের অনেক লোকই ট্রেন স্টেশনের বেঞ্চিতে অনেক সময় কাটায়। তারা চেয়ারে বসতে আরাম বোধ করে না।’

নামকরা চেয়ারগুলো

ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের নামে একটি চেয়ার চালু আছে, নাম লুই ফঁতেইন। এর পিঠ বাঁকা। তুলনামূলকভাবে হালকা। ১৭৫৫ সালে এটি তৈরি হয়েছে। ১৮৩০ সালে জার্মানির আসবাব নির্মাতা মাইকেল থনেট কাঠ বাঁকিয়ে দারুণ একটি চেয়ার উপহার দেন। এর নাম বেন্টউড আর্মচেয়ার। ১৯২৫ সালে এলো ভাসিলি চেয়ার। এর নকশা করেছেন মার্সেল ব্রুয়ার। তিনি চিত্রকর ভাসিলি কান্দিনিস্কিকে সম্মান জানিয়ে এর নাম রাখেন ভাসিলি চেয়ার। চেয়ারটি সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রসর ছিল।

অল্পই অধিক—কথাটি যিনি চালু করেছেন, সেই লুদভিগ মিজ ভ্যানডার রোহকে আধুনিক স্থাপত্যকলার জনকও বলা হয়। তিনি একটি চেয়ারের নকশা করেন, যার নাম বার্সেলোনা চেয়ার। ১৯২৯ সাল। বাণিজ্যিকভাবে দারুণ সফল হলো এ চেয়ার। ১৯৪৮ সাল। যুদ্ধ শেষ করে মানুষ ঘরে ফিরেছে মাত্র। তারা আয়েশ করে বসতে চাইল। ফিনিশ-আমেরিকান নকশাকার এরো সার্টনেন তেমন একটি চেয়ার বানিয়ে ফেললেন। লোকে ডাকল ওম্ব (গর্ভ) চেয়ার। এর আবেদন আজও একই রকম আছে বলে মত দিচ্ছেন গবেষকরা।

এরো সার্টনেন ১৯৫৬ সালে আরেকটি চেয়ার বাজারে ছাড়লেন। এটি দেখতে যেমন, কাজেও সে রকম। চেয়ারটির নাম টিউলিপ চেয়ার।

শেষ হোক প্যান্টন চেয়ার দিয়ে। ১৯৬০ সালে ভার্নার প্যান্টন চেয়ারটি বাজারে ছাড়েন। এই চেয়ারটি পৃথিবীতে পপ আর্টের সূচনা করে। প্যান্টন চেয়ারটির আইডিয়া (ভাবনা) পান একটি প্লাস্টিক কারখানায়, যারা বালতি ও হেলমেট তৈরি করত। এই চেয়ারের কোনো পা নেই। ভোগ সাময়িকীর প্রচ্ছদে জায়গা পেয়েছিল চেয়ারটি। চেয়ারটি বাজারে আসার পর থেকে এখনো পর্যন্ত জায়গা দখল করে আছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা