৬ জুন বিকেল ৪টা। ধামপুস বেইজ ক্যাম্পে আমরা আনন্দে মেতেছিলাম লিটল টুকুচের মতো দুর্গম চূড়ায় আরোহণ সফল করতে পারায়। একই সঙ্গে একটা আশঙ্কাও ছিল—এখন আমরা কী করব? আমরা এসেছি হিমালয়ের ধবলগিরি সার্কিট অভিযানে। আলপাইন স্টাইলে (পোর্টার ও গাইড ছাড়া) অভিযান চালাচ্ছি আমরা। ১০ দিন আগে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল মারফা গ্রাম থেকে। কিন্তু ধামপুস বেইজ ক্যাম্পে যেতেই আসতেই আমাদের রসদ প্রায় শেষের দিকে। কারণ আবহাওয়া আমাদের প্রতিকূলে ছিল। আমাদের কাছে এখন মোটে দুদিনের খাবার অবশিষ্ট আছে। তাই খুব হুঁশিয়ার থাকতে হচ্ছে। ধাউলাগিরি শেষ করতে যে কম করেও তিন দিন লাগবে। পথিমধ্যে আবার পেরুতে হবে একটি বিপজ্জনক হিমবাহ। তবে সুখের ব্যাপার এই শারীরিক ও মানসিকভাবে আমরা অনেক ফিট ছিলাম। তাই হিমালয়ের অমোঘ আকর্ষণের কাছে আমাদের সব আশঙ্কা, দুশ্চিন্তা হেরে গেল। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আজ রাতেই বেরিয়ে পড়ব ধামপুস চূড়া জয় করতে। এটি ছয় হাজার মিটার উঁচুতে। শেষ বিকেলের আলো থাকতে থাকতে রান্নাবান্না শুরু করে দিলাম। সন্ধ্যার মধ্যেই একটু ঘুমিয়ে নিতে হবে। তাই খেয়েদেয়ে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর ঢুকে গেলাম। কিন্তু উত্তেজনার মাঝে কী আর ঘুম আসে? তাও আবার অসময়ে। ছটফট করতে করতেই বাজল রাত ১২টা। পোশাক পরে, পায়ে জুতা গলিয়ে পুরো রেডি হয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে দেখি হালকা তুষার ঝরছে। আকাশও আগের রাতের মতো পরিষ্কার নয়। কেমন যেন ঘোলাটে। গুটিকয় নক্ষত্রের ক্ষীণ আলোই আমাদের ভরসা। কপাল খারাপ, সেগুলোও আবার লুকোচুরি খেলছে। তুষারপাতের মধ্যেই আমরা তিন আরোহী ধামপুস শৃঙ্গের দিকে ধাবমান হলাম। প্রচলিত পথে না গিয়ে আমরা রিজ লাইনে (পাহাড়ের সরু ধার) ওঠার চেষ্টা চালালাম। অন্ধকারে সেই খাড়া ঢালে পায়ের নিচে ছিল তুষার ঢাকা ঝুরঝুরে পাথর। প্রতি পদেই ছিল রোমাঞ্চ। রিজ লাইনের অনেক কাছেই আমরা চলে যেতে পারলাম, তবে বেশ হ্যাপা পোহাতে হলো। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থামতেই আমাদের চোখ চলে গেল নীলগিরি পর্বতে। সেখানে তুমুল বজ্রপাত হচ্ছিল। নীলচে বিদ্যুতের ঝলক চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছিল পাহাড়ের গায়ে। সেই আলোয় মাথা উঁচিয়ে থাকা অন্নপূর্ণা দৃশ্যমান হচ্ছিল। নীল আলোয় ধরণীকে ভুতুড়ে আর ভয়ংকর দেখাচ্ছিল। একবার মনে হয়েছিল, ফিরে যাই। কিন্তু ধামপুস যে ডাকছে। ভোরের প্রথম আলো যখন আকাশ চিড়ে বেরিয়ে এলো তখন মোহগ্রস্তের মতো থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমাদের চারপাশের প্রকৃতি তখন স্নিগ্ধ। সব শ্বেত চূড়ায় সোনালি তিলক। আরো দূরে মুসতাংয়ের বাদামি পাহাড়। চোখ সরাতে পারছিলাম না কিছুতেই। আরো ঘণ্টাখানেক পর রিজ লাইনের ওপর একটি পাথরের দেয়ালের সামনে গিয়ে আটকে গেলাম। পাশের আইস ফিল্ড দিয়ে দেয়ালটা পেড়িয়ে যাব কি না ভাবতে ভাবতেই দেখি এক সঙ্গী দেয়াল বেয়ে ওপরে ওঠা শুরু করে দিয়েছে। হাতে গ্লাভস থাকায় প্রথম দিকে কিছুটা আড়ষ্ট থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যে রক ক্লাইম্ব করে মজা পেতে লাগলাম। একসময় আমরা দেয়ালটি টপকেও গেলাম। এর পরই শৃঙ্গে পৌঁছানোর দীর্ঘ রিজ লাইন। ধীরে ধীরে আমরা শুভ্র তুষার মাড়িয়ে আকাশের দিকে উঠে যেতে থাকি। অবশেষে সকালের প্রথম প্রহরের শেষলগ্নে আমরা ধামপুস শৃঙ্গের শীর্ষে পৌঁছে যাই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এখন আমরা ছয় হাজার মিটার ওপরে দাঁড়িয়ে আছি। দূরে চতুর্দিকে মাথা উঁচিয়ে আছে আরো আরো উঁচু নীল বরফে মোড়া নামি-বেনামি পর্বতশৃঙ্গ। নিচ থেকে মেঘমালা কুণ্ডলী পাকিয়ে আমাদের পাশ দিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। সব কিছু শূন্য লাগছিল। কোনো বাঁকেই সেই শূন্যতা বোঝানো সম্ভব বলে মনে হয় না। শুধু বিলীন হয়ে যাওয়ার ইচ্ছাটা মাথাচাড়া দেওয়ার আগেই ভাবলাম, এবার নেমে যেতে হবে। ছবি : আরিফুর রহমান