বিভিন্ন স্থানে রসমালাই তৈরি হলেও কুমিল্লার রসমালাইয়ের তুলনা নেই। তার মধ্যে আবার সেরা হচ্ছে মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে শুধু কুমিল্লাতেই মাতৃভাণ্ডার নামে দোকান আছে কয়েক শ। আসলটার কথা জানাচ্ছেন আবুল কাশেম হৃদয় উনিশ শতকের শুরুর দিকে বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে বাহারি মিষ্টি সরবরাহ করত ত্রিপুরার ঘোষ সম্প্রদায়। সে সময় রসগোল্লার সঙ্গে মালাইকারির প্রলেপ দেওয়া এক ধরনের মিষ্টির চলও ছিল। কেউ কেউ একে মালাই রসগোল্লা বলত। পরে দুধ জ্বাল দিয়ে ক্ষীর বানিয়ে তার মধ্যে শুকনা রসগোল্লা ডুবিয়ে তৈরি করা হয় ক্ষীরসহ রসগোল্লা। নাম দেওয়া হয় ‘ক্ষীরভোগ’। রসমালাইয়েরই আদি সংস্করণ হলো এই ক্ষীরভোগ। তিরিশের দশকে এই রসগোল্লার আকার ছোট করে দুধের ক্ষীরের মধ্যে ডুবিয়ে পরিবেশন করা শুরু হয় এবং এর নামকরণ হয়ে যায় রসমালাই। ঐতিহ্যবাহী ও বিখ্যাত এই রসমালাই কুমিল্লায় শুরু থেকে তৈরি করে আসছে মনোহরপুরের মাতৃভাণ্ডার। ক্ষণী সেন ও মণি সেন নামের দুই ভাই মিষ্টির ব্যবসায় রসমালাই নিয়ে আসেন। খুব অল্প দিনের মধ্যে মাতৃভাণ্ডারের রসমালাইয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। রসমালাই হয়ে ওঠে কুমিল্লার ঐতিহ্যের অংশ। মাতৃভাণ্ডার ছাড়াও সুস্বাদু রসমালাই পাওয়া যায় ভগবতী পেড়া ভাণ্ডার, শীতল ভাণ্ডার, পোড়াবাড়ি, জলযোগসহ কয়েকটি মিষ্টির দোকানে। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় মনোহরপুরের মাতৃভাণ্ডার, ভগবতী, কান্দিরপাড়ের জলযোগ, জেনিস, পোড়াবাড়িতে মানুষ ভিড় জমায় রসমালাই কেনার জন্য। দোকানগুলোর মধ্যে মাতৃভাণ্ডারেই প্রতিদিন গড়ে পাঁচ-ছয় মণ রসমালাই তৈরি করা হয়। এই দোকানে প্রতিদিন ভোর ও বিকেলে পাঁচ-ছয়জন দুধ ব্যবসায়ী প্রায় ১০-১৫ মণ দুধ সরবরাহ করেন। তাঁদের প্রত্যেকে ৮০-১০০ কেজির মতো দুধ সরবরাহ করে থাকেন। শুধু মাতৃভাণ্ডারেই প্রতিদিন বিক্রি হয় প্রায় লাখ টাকার রসমালাই। বৃহস্পতি ও শুক্রবার প্রায় দেড় লাখ টাকা বিক্রি হয়। বিক্রির দিক থেকে মাতৃভাণ্ডারের পরই ভগবতী। দুটি আলাদা মিষ্টান্নের যোগে রসমালাই তৈরি। রসগোল্লা ও মালাইয়ের মিশ্রণ করা হয়। দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয়। প্রতি মণ দুধ দেড় ঘণ্টা জ্বাল দিয়ে ১০-১২ কেজি মালাই করা হয়। এ ঘনত্বের ওপরই রসমালাইয়ের স্বাদ ও বিক্রির মূল্যে তারতম্য দেখা যায়। ঘন মালাই চুলা থেকে নামিয়ে আলাদা তৈরি করা ছোট ছোট দানার আকারে মিষ্টি বড় গামলায় মেশানো হয়। তারপর ঠাণ্ডা হলেই পূর্ণতা পায় রসমালাইয়ে। তবে যে স্বাদ, গুণ আর ঐতিহ্যের কারণে রসমালাইয়ের খ্যাতি, সেই রসমালাই ভেজাল আর নকলের ভিড়ে জৌলুস হারাতে বসেছে। এখন কুমিল্লার আশপাশে অনেক দোকান মাতৃভাণ্ডারের নাম করে রসমালাই বিক্রি করে। মাতৃভাণ্ডারের সানী সেন জানান, মাতৃভাণ্ডারের কোনো শাখা নেই। মাতৃভাণ্ডারের নামের সামনে কুমিল্লা, কুমিল্লার, আদি, খাঁটি, মা, নিউ ইত্যাদি নাম ব্যবহার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে রয়েছে অনেক মিষ্টির দোকান। মাতৃভাণ্ডারের নাম ব্যবহার করে ভেজাল রসমালাই বিক্রি করে মানুষকে প্রতারিত করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে কুমিল্লার রসমালাইয়ের সুনাম। এক মণ দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন ক্ষীর করে তাতে ছোট গুটি বা শুকনো রসগোল্লা দিয়ে ১৪ কেজির মতো রসমালাই বানানো যায়। এক মণ দুধে এর বেশি তৈরি করলে রসমালাইয়ের আসল স্বাদ থাকে না। মাতৃভাণ্ডারের কারিগর জানান, ভারতীয় এক কেজি শক্তি বা মধু পাউডার দুধ দিয়ে ১০ কেজি দুধ বানানো যায়। এ কারণে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী গরুর আসল দুধ ব্যবহারই করে না। তা ছাড়া যে ছানা দিয়ে রসমালাইয়ের গুটি বানানো হয়, তাতে এক কেজি ছানায় এক ছটাক পরিমাণ ময়দার স্থলে এক পোয়া ময়দা মেশানো হয়। তাতে তিন কেজির জায়গায় চার কেজি গুটি হয়। কিন্তু এতে রসমালাইয়ের সত্যিকারের স্বাদ থাকার কোনো কারণ নেই।