১৯৭১ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় সদস্য ছিলাম। ওই সময় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সভা আয়োজন হতো। ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরাও সক্রিয় থাকত। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ৩ মার্চ বসার কথা ছিল। কিন্তু অধিবেশনের দুই দিন আগে ১ মার্চ তা স্থগিত করা হয়। এর প্রতিবাদে ময়মনসিংহসহ সারা দেশে আগুন জ্বলে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল বের হয়। ছাত্রলীগের ইয়াসিন ভাই, সামসুল হক তালুকদার ভাই, নূর মোহাম্মদ তালুকদার ভাই ও রাজ্জাক ভাই (সাবেক খাদ্যমন্ত্রী) মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন। ছাত্রছাত্রীরা সবাই তেজোদীপ্ত ছিল। কিছু লাঠি ও বাঁশ ছিল আমাদের হাতে। তখন ময়মনসিংহের কিছু জায়গায় পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্প করেছিল। সেসব জায়গায় তারা বাংকার বানিয়েছিল। ছাত্রদের একটি দল ছদ্মবেশে দিনের বেলায় জায়গাগুলো রেকি করত। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা ঢাকায় গিয়েছিলেন। ফিরে এসে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সভা করেন। পরবর্তী সময়ে স্টুডেন্ট অ্যাকশন কমিটি গঠন করেন। কমিটির উদ্যোগে ২৫ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন ক্যাম্পাসে গোপনে সভা হতো। রাতের বৈঠকগুলোর কেন্দ্রস্থল ছিল ঈশা খাঁ হল। ২৫ মার্চ হামলার পরের দিন ছাত্র-শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে গোপন বৈঠকে বসেন। ছাত্রদেরও একটি গ্রুপ প্রশিক্ষণ নিতে ভারত যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আমি ক্যাম্পাসের পাশের একটি ইপিআর ক্যাম্পের এক বাঙালির কাছ থেকে ৪০টি গুলি সংগ্রহ করি। ইচ্ছা, গ্রামের বাড়ি ফিরে যুদ্ধে অংশ নেব। গুলিগুলো বালিশের খোলে লুকিয়ে বিছানাপত্রের সঙ্গে বেঁধে বরগুনার তালতলীর উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ি। গাজীপুরের শ্রীপুরে পাকিস্তানি বাহিনী ট্রেন তল্লাশি করে। কিছু সময় আমি টয়লেটে গিয়ে লুকিয়ে থাকি। কমলাপুর নেমে সদরঘাট যেতে থাকি। রাস্তার চিত্র ছিল ভয়াবহ। প্রথমে ভয় পাই, তারপর ক্ষুব্ধ হই। ভাবি, ট্রেনিং নিতে ভারত যাব। কিন্তু কমলাপুর থেকে ভারত যাওয়া ছিল অসম্ভব। রাতে লঞ্চযোগে বরিশাল যাই। রাত কাটাই নৌবন্দরে। সকালে খালাতো বোনের সঙ্গে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে দেখা করি। নেনিয়ে চিন তখন মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। আমি তাকে নিয়ে লঞ্চযোগে তালতলী যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। লঞ্চে উঠে বুকিং দেওয়া কেবিনে দেখি পাকিস্তানি বাহিনীর তিন সদস্য। তারা আমাকে দেখে পরিচয় জানতে চায়। আমি নিজেকে চায়নিজ বৌদ্ধ ছাত্র পরিচয় দিই। তারা কিছু একটা চিন্তা করে বারান্দায় গিয়ে বসে। তালতলী পৌঁছে দেখি, বিরাট বিশৃঙ্খল অবস্থা। চুরি-ডাকাতি খুব বেড়েছে। পাড়ার যুবকরা রাত জেগে পাহারা দিয়েও ঠেকাতে পারছে না। যা হোক, আমরা যুবকরা ইপিআরের সুবেদার হাতেম আলীর সঙ্গে আলোচনা করে আগা ঠাকুরপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প গঠন করি। যুদ্ধ শুরু হলে আমার গ্রামের বাড়ি আগা ঠাকুরপাড়ার প্রতিটি ঘর একেকটি ক্যাম্প হয়ে ওঠে। সুবেদার হাতেম আলী রাখাইনদের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দিতেন। নেনিয়ে চিন যুদ্ধাহতদের চিকিৎসা দিত। তাকে সাহায্য করত থয়চা অং মাস্টারের মেয়ে এথিন রাখাইন। তখন সে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সংবাদ আদান-প্রদানেরও কাজ করত সে। পরে এথিন সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। আগা ঠাকুরপাড়া পাকিস্তানি হানাদাররা ঘিরে ফেলেছিল শেষদিকে। সেটি ১০ ডিসেম্বর। কলাপাড়া থেকে পাকিস্তানি সেনারা আন্ধারমানিক হয়ে গানবোটে এসে মুক্তিসেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তখন দুপুর ১টা ৪৫ মিনিট। মুক্তিসেনারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দুই ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখযুদ্ধে মুক্তিসেনা হাবিবুর রহমান (ছাত্র) ও মোকলেসুর রহমান (পুলিশ) শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম (ঝালকাঠি) ও কেতাব আলীকে (সাজু) পাকিস্তানি সেনারা ধরে নিয়ে যায়। পরে কলাপাড়া থানায় হামলা চালিয়ে রুস্তম ও সাজুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। আগা ঠাকুরপাড়া যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা পাড়ার বিভিন্ন রাখাইন পরিবার, আসমত আলী চৌকিদার ও কেরামত চৌকিদারের বাড়ি লুট করে মালামাল নিয়ে যায়। আগা ঠাকুরপাড়ার এ সম্মুখযুদ্ধে সুবেদার হাতেম আলীর নেতৃত্বে আমরা ৩০-৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করি। অনুলিখন : রফিকুল ইসলাম