kalerkantho

বুধবার । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭। ১২ আগস্ট ২০২০ । ২১ জিলহজ ১৪৪১

অধিকাংশ রোগী গাজীপুর থেকে ভাগিয়ে নেওয়া

‘রিজেন্ট হাসপাতাল ছিল পকেট কাটার মেশিন’

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘রিজেন্ট হাসপাতাল ছিল পকেট কাটার মেশিন’

করোনাভাইরাস পরীক্ষায় রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে ধরা খাওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের বেশির ভাগ রোগী ছিল গাজীপুর থেকে ভাগিয়ে নেওয়া। এই রোগীদের প্রায় পুরোটা নেওয়া হতো গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও টঙ্গী শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল থেকে। এই দুই হাসপাতাল থেকে রোগীদের ফুসলে ভাগিয়ে নেওয়ার কাজে ছিলেন রিজেন্টের নিয়োজিত ৬৫ দালাল, যাঁদের মধ্যে আছেন চিকিৎসকও। মোটা কমিশনের বিনিময়ে এই দালালরা নানাভাবে ফাঁদে ফেলে রোগীদের নিয়ে যেতেন রিজেন্টে। গতকাল বৃহস্পতিবার ওই দুই হাসপাতালের কর্মীরা এসব কথা জানান কালের কণ্ঠকে।

টঙ্গী শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের একজন নারী চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁদের হাসপাতালে গর্ভবতী মায়েদের এবং সাধারণ কাটা-ছেঁড়া সেলাই ছাড়া বড় অপারেশন হয় না। হৃদরোগসহ জটিল রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। নেই আইসিইউ বা ব্লাড ব্যাংক। তাই জটিল রোগীদের তাঁরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। এ সুযোগটাই কাজে লাগাতেন দালালরা। নানা সুযোগ-সুবিধা আর উন্নত চিকিৎসার কথা বলে তাঁরা রোগীদের টঙ্গীর কাছাকাছি উত্তরার ওই রিজেন্ট হাসপাতালে নিয়ে তুলতেন।

আহসানউল্লাহ মাস্টার হাসপাতালের এক আয়ার ছেলে আরিফ হচ্ছেন রিজেন্টের পক্ষে টঙ্গীতে থাকা দালালদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী। সেখানে তাঁর মতো সক্রিয় ছিলেন কমপক্ষে ৩১ দালাল। এই দালালদের তালিকায় রয়েছেন ডাক্তার, ডাক্তারের সহকারী, সিস্টার, ওয়ার্ড বয়, আয়া, অ্যাম্বুল্যান্সচালক, এমনকি নামসর্বস্ব পত্রিকা ও অনলাইন সাংবাদিকও। রোগীর চিকিৎসা খরচের ওপর নির্ভর করত কমিশন। তবে কোনো রোগী নিয়ে গেলেই তাত্ক্ষণিক মিলত সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা।

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে কথা হয় অ্যাম্বুল্যান্সচালক আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, এই হাসপাতালে রিজেন্টের হয়ে কাজ করতেন ৩৪ দালাল। তাঁদের মধ্যে অ্যাম্বুল্যান্সচালকই বেশি। করোনা হাসপাতাল ঘোষণার আগে ছোটখাটো অপারেশন ছাড়া জটিল রোগের চিকিৎসা পাওয়া যেত না তাজউদ্দীন হাসপাতালে। রোগীদের জরুরি বিভাগ থেকেই রেফার করা হতো ঢাকায়। অ্যাম্বুল্যান্সে ওঠানোর দুর্বল মুহূর্তে এই দালালরা শুভাকাঙ্ক্ষী সেজে রোগীর স্বজনদের কানে ‘রোগীর যা অবস্থা ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়ার আগেই খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে’, ‘সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেই’, ‘উত্তরায় ভালো হাসপাতাল আছে, খরচও কম’—গত্বাঁধা এসব কথা বলা শুরু করতেন। এই টোপে সহজেই ফাঁদে পড়ত রোগীর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত স্বজনরা। এরপর ঢাকা মেডিক্যালের বদলে অ্যাম্বুল্যান্স সোজা ছুটত রিজেন্টে। এ সময় রোগীর স্বজনদের সঙ্গে অবস্থান নেওয়া দালালরা রোগীর আর্থিক অবস্থা জেনে নিতেন এবং তা রিজেন্টকে দ্রুত জানিয়ে দিতেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নির্ধারণ করা হতো চিকিৎসা বিলের পরিমাণ। প্রত্যেক দালালের মূল টার্গেট থাকত হৃদরোগ বা অন্য ধরনের জটিল রোগী। সাধারণত অ্যাম্বুল্যান্সচালকরা এই রোগীদের ধরে নিয়ে গেলেও কমিশনের একটি অংশ পেতেন দালাল সিন্ডিকেটভুক্ত ওই হাসপাতালের ডাক্তাররাও।

রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া গাজীপুরের একটি উপজেলার পৌর মেয়র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিচিত এক চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি গত বছরের ডিসেম্বর মাসে রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে অকারণে নানা টেস্ট ও ভুল চিকিৎসায় তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। পাঁচ দিন ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় তাঁর বিল হয়েছিল পৌনে তিন লাখ টাকা। পরে অন্য একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থ হন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল নয়, রিজেন্ট ছিল রোগীর পকেট কাটার মেশিন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা