kalerkantho

বুধবার । ২৯ জানুয়ারি ২০২০। ১৫ মাঘ ১৪২৬। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের জমি দখলের পাঁয়তারা

আজিম হোসেন, বরিশাল   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ শীর্ষক ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা অমর এ গানের সুরকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের জমি দখলের পাঁয়তারা করছে বরিশালের একটি প্রভাবশালী মহল। ৪৭ বছর আগে নগরের হাসপাতাল রোডে ‘শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ১০ শতাংশ অর্পিত সম্পত্তি ইজারা নিয়ে সংগীত বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হলেও এত বছর পর বিদ্যালয়ের জমি নিজেদের বলে দাবি করছেন অমৃত গ্রুপের স্বত্বাধিকারী বিজয় কৃষ্ণ দে। এরই মধ্যে তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে বরিশাল যুগ্ম জেলা জজ আদালতে একটি মামলা করেছেন। এ আদালত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনাল হিসেবে কার্যকর।

এ ঘটনায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সর্বমহলে। এরই মধ্যে জমিটি রক্ষা করতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন, অবস্থান ও বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছে। মামলাটি জরুরিভাবে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে জেলা প্রশাসনের ভেস্টেড প্রপার্টি (ভিপি) সেলের আইনজীবী মোতালেব হাওলাদারকে চিঠি দিয়েছে বরিশাল জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শহীদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, শহীদ আলতাফ মাহামুদের নামে প্রতিষ্ঠিত সংগীত বিদ্যালয়টি নিয়ে বরিশালের মানুষ সোচ্চার। বিষয়টি স্পর্শকাতরও বটে। তাই মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, বরিশাল জেলা শাখার সদস্যসচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৯৭২ সালে বরিশালে শহীদ আলতাফ মাহমুদের নামে সংগীত বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে বরিশাল নগরের বগুড়া-আলোকান্দা মৌজার ১৩৪ নম্বর খতিয়ানের ১০ শতাংশ জমি ও একতলা পাকা ভবন শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের নামে ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। সেই থেকে হাসপাতাল রোডের ওই পুরনো একতলা ভবনে শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। কিন্তু নগরের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তি বিজয় কৃষ্ণ দে তাঁর স্ত্রীর নামে জমিটির দখল নিতে চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, এ সংগীত বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ভাষাসৈনিক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ মাহমুদ ও তাঁর অমর সৃষ্টি সম্পর্কে জানতে পারছে নতুন প্রজন্ম। তাঁরা এটি রক্ষায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন।

বরিশাল শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক অধ্যাপক মহসিন-উল ইসলাম হাবুল বলেন, ১৯৯৯ সালে নগরের রূপাতলীর রফিক উদ্দিন আহমেদ রফিজসহ কয়েকজন মিলে ওই জমি নিজেদের এবং তাঁদের ভোগদখলে রয়েছে দাবি করে জিয়াউদ্দিন হাসান কবিরকে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেন। কিন্তু জিয়াউদ্দিন হাসান কবির ওই জমির দখলে যেতে পারেননি। ২০০৭ সালে ওই জমি সরকারি গেজেটভুক্ত হয়। ২০০৮ সালে ওই পক্ষটি ব্যবসায়ী বিজয় কৃষ্ণ দের স্ত্রী শৈল দের কাছে জমিটি ১৬ লাখ টাকায় রেজিস্ট্রিমূলে বিক্রি করে। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের বাধার মুখে বিজয় কৃষ্ণ দে ওই জমি ভোগদখলে যেতে পারেননি। ২০১২ সালে বিএস রেকর্ডেও ওই সম্পত্তি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জমিটি একসনা হিসেবে ইজারা দেওয়া। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর ইজারা নবায়ন করে আসছে।

জানা গেছে, ব্যবসায়ী বিজয় কৃষ্ণ দে তাঁর স্ত্রী শৈল দেকে বাদী করে ২০১২ সালে বরিশালের যুগ্ম জেলা জজ আদালতে জমি দাবি করে মামলা করেন, যার নম্বর ৩০০/১২। মামলায় বরিশাল জেলা প্রশাসককে বিবাদী করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আদালতে দাখিল করা জবাবে বলা হয়েছে, এ জমি ও একতলা ভবন শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ১৯৭২ সালে ইজারা নিয়ে সেখানে সুনামের সঙ্গে বিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছে। এ জমিতে সরকারপক্ষে ইজারা ছাড়া অন্য কারো দখল নেই। তফসিলভুক্ত ভূমিতে ইজারাদার শহীদ আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যালয় স্থাপন করে বিদ্যুৎ বিল ও সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স দিয়ে আসছে। এ জমি নগরের প্রাণকেন্দ্রে হওয়ায় জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র সৃষ্টি করে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তির মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের সংগীত শিক্ষক বীণা সেন শহীদ আলতাফ মাহমুদের স্মৃতি রক্ষার্থে ওই ভবনটিতেই সংগীত বিদ্যালয়টি যাতে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা পায়, সে জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনন্যা বিশ্বাস ও হিমাদ্রি সরকার বিদ্যালয়টি যাতে বর্তমান ভবনে থাকে তার জন্য সরকারের উচ্চ মহলের সুদৃষ্টি চেয়েছেন।

এ ব্যাপারে বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ভিপি সেলের কৌঁসুলিকে চিঠি দিয়েছি, যাতে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য আদালতে লড়াই করেন।’ শিগগিরই এর সমাধান হবে বলেও জানান তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা