kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘রক্ষাকবচ’ সুন্দরবনকে রক্ষার উদ্যোগ নেই

আট বছর ধরে ঘুরছে জনবল কাঠামোর প্রস্তাব<>শূন্য পদ ২৫২৩

আরিফুর রহমান   

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘রক্ষাকবচ’ সুন্দরবনকে রক্ষার উদ্যোগ নেই

ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলার পর বুলবুলের তাণ্ডবের সময়ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন নিজের বুক চিতিয়ে দিয়েছে। বরাবরই মায়ের মতো আগলে রেখেছে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের। ফলে উপকূলজুড়ে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। সরকারসহ দেশ-বিদেশের সব মহল এখন সুন্দরবনকে ‘রক্ষাকবচ’ বলে স্বীকৃত দিয়েছে। কিন্তু সোয়া ছয় হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশ্বের সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় বন সুন্দরবন রক্ষার বেলায় দেখা যায় যত অনীহা ও অবহেলা। সুন্দরবনে বন্য প্রাণীর পাচার ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো, শিকার বন্ধ, ঝড়-পরবর্তী সময়ে বিশেষ কর্মপরিকল্পনাসহ সুন্দরবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়াতে ২০১১ সালে বন বিভাগ কিছু প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। বাড়তি জনবল চেয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে এ প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অনুমোদন পায়নি। ফলে সীমিত জনবল নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। বন বিভাগে সর্বশেষ ২০০০ সালে বড় আকারে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১৯ বছর নতুন কোনো জনবল নেওয়া হয়নি।

সারা দেশেই বন উজাড় হচ্ছে; বনের জমি জবরদখল হচ্ছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে স্বীকার করেছেন একাধিক কর্মকর্তা। অবশ্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ড. বিল্লাল হোসেন বলেছেন, জনবল নিয়োগের বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। শিগগিরই নতুন জনবলকাঠামো চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে।

বন বিভাগ থেকে ২০১১ সালে প্রথম যখন জনবলকাঠামোর প্রস্তাব পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় তখন বিভিন্ন পদের বিপরীতে ১৯ হাজার ৯৬৩ জন জনবল চাওয়া যায়। ২০১৫ সালে একটি সভায় সেটি কমিয়ে ১৭ হাজার ৮২০ জন করা হয়। ২০১৭ সালে ওই প্রস্তাবে জনবল আরো কমিয়ে এক হাজার ৭০০ করা হয়। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ওই প্রস্তাব থেকে লোকবল আরো কমতে পারে বলে আভাস দেন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. বিল্লাল হোসেন। ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল—এই সময়ের মধ্যেও কেন জনবলকাঠামো অনুমোদন পায়নি এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘২০১১ সাল থেকে যে জনবলের প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে, সেটি আমার জানা নেই। আমি অনেক পরে এসেছি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে। জনবলকাঠামো ঠিক করে আমরা প্রস্তাবটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তারপর অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিয়ে যাব। এত জনবল কেন দরকার, সেটি ওই দুই মন্ত্রণালয়কে বোঝাতে হবে। তারপর মিলবে চূড়ান্ত অনুমোদন।’ তবে বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, বন বিভাগে নতুন জনবল কেন দরকার, কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা পরিবেশ মন্ত্রণালয় বুঝতে চায় না। গুরুত্বও অনুধাবন করতে চায় না।

বন বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে সুন্দরবনের। সুন্দরবন রক্ষার জন্য কাজ করে এমন অনুমোদিত পদ আছে এক হাজার ১৭৩টি। এর মধ্যে সুন্দরবন পশ্চিম (খুলনা-সাতক্ষীরা অংশ) ও সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ (বাগেরহাট) মিলিয়ে মোট কর্মরত আছেন ৭৯৪ জন। পদ শূন্য আছে ৩৭৯টি। সুন্দরবন রক্ষায় যাঁদের ওপর মূল দায়িত্ব থাকে সেই ফরেস্ট রেঞ্জারের পদ সুন্দরবনের জন্য অনুমোদিত আছে ৩০টি। এর মধ্যে এখন কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। বাকি ২৬টি পদই খালি পড়ে আছে। আরেক গুরুত্বপূর্ণ পদ ডেপুটি রেঞ্জারের মঞ্জুরি করা পদ আছে ৪৫টি; এখন সব পদই খালি। অর্থাৎ এই পদে কোনো কর্মকর্তাই নেই। আর ফরেস্টার পদ আছে ১০৫টি, সেখানে কর্মরত আছেন ৬৭ জন। শূন্যপদ আছে ৩৮টি।

সুন্দরবনের সোয়া ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা রক্ষার দায়িত্ব খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মঈনুদ্দিন খানের। জনবল সংকটের কারণে তাঁকে প্রতিনিয়ত কী ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় জানতে চাইলে একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন অপরাধে সুন্দরবন এলাকা থেকে গত শুক্রবার ১১২ জনকে আটক করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, আটক করার পর তাদের বন আদালতে নিয়ে যেতে হয়। বন আদালত বাগেরহাটে। এতজন অপরাধীকে বন আদালতে নিয়ে যেতে বন বিভাগের যে জনবল দরকার তা নেই। মঈনুদ্দিন খান বলেন, ‘গত এক দশকে সুন্দরবন এলাকায় কাজের ব্যাপ্তি বেড়েছে। প্যাট্রলিংয়ের হার বেড়েছে। পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় বাসিন্দাদের সহব্যবস্থাপনার কার্যক্রমও বেড়েছে। কিন্তু সেই হারে তো আমাদের জনবল একজনও বাড়েনি। সীমিত জনবল নিয়ে এত বিশাল একটি এলাকা (সুন্দরবন) রক্ষা করা খুবই কঠিন কাজ।’

প্রধান বন সংরক্ষক সফিউল আলম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, বন বিভাগের জনবল বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন। শিগগিরই অনুমোদন পাবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা