ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় লাইসেন্স বাতিলের চতুর্থ দিনেও পুরোপুরি খালি হয়নি রাজধানীর আদ-দ্বীন উইমেনস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ১৫২ জন রোগী ভর্তি রয়েছে বলে জানিয়েছেন আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল।
তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সংকটাপন্ন নবজাতক ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিত্সার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনেক স্বজন এখনই হাসপাতাল ছাড়তে রাজি নন। এসব রোগীর বেশির ভাগই আইসিইউ বা এনআইসিইউতে ভর্তি। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা দেয়। সে সময় হাসপাতালটিতে ভর্তি ছিল ৪১৫ জন রোগী। পরবর্তী দুদিনে ১৭৩ জন রোগী হাসপাতাল ত্যাগ করে। গত শনিবার আরো ৯ জন ছাড়পত্র নিয়ে চলে যায়। আর সর্বশেষ গতকাল রবিবার ৮২ রোগী হাসপাতাল ছাড়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুন এনআইসিইউতে ভর্তি থাকা ৬০ নবজাতকের মধ্যে এখনো ৩২ জন চিকিত্সাধীন। এ ছাড়া আইসিইউতে ২০ জন রোগীর মধ্যে হাসপাতাল ছেড়ে গেছে ১৩ জন। তবে সিসিইউতে চারজন রোগীর সংখ্যা অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যরা বিভিন্ন অপারেশন শেষে সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিত্সা নিচ্ছে। রোগীদের স্বজনরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নবজাতক ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই তাঁরা হাসপাতাল ছেড়ে যাচ্ছেন না।
গতকাল সন্ধ্যায় আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল জানান, বহির্বিভাগে রোগী দেখা, নতুন ভর্তি নেওয়া বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে যারা ভর্তি রয়েছে তাদের আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ছয় হাসপাতালে চিকিত্সা নেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছি। রোগীর স্বজনরা সরকারি হাসপাতালে এনআইসিইউ বা আইসিইউ ব্যবস্থা করতে না পারায় হাসপাতাল ছাড়ছেন না।
গতকাল সরেজমিনে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় হাসপাতালের পরিবেশ অনেকটাই ফাঁকা ও নীরব। নতুন রোগী ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বহির্বিভাগেও রোগীদের উপস্থিতি নেই। কেউ কেউ দূর-দূরান্ত থেকে চিকিত্সার জন্য এসে ফিরে যাচ্ছে।
এদের একজন সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দা আব্দুল ওয়াব (৪৭)। তিনি হূদরোগ জটিলতা নিয়ে এখানে চিকিত্সার জন্য এসেছিলেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অতীতে অনেকবার চিকিত্সা নিয়েছি। তাই অনেক দূর থেকে আসা। হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেছে এ তথ্য আমার জানা ছিল না।’
লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের পর রোগীদের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব খরচে রোগীদের সরকারি হাসপাতালে বা রোগীর পছন্দমতো জায়গায় রেফার (স্থানান্তর) করতে হবে। তবে রোগীদের হুট করে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, সর্বশেষ তথ্য মতে এখনো শতাধিক রোগী সেখানে ভর্তি রয়েছে। এরা খুবই সংকটাপন্ন রোগী, যেমন—আইসিইউ বা এনআইসিইউতে থাকা এক দিন বা তিন দিনের শিশু যাদের স্থানান্তর করা জীবনঝুঁকির কারণ হতে পারে, তাদের ক্ষেত্রে কয়েক দিন চিকিত্সা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা কমছে।
এদিকে আদ-দ্বীন উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের (এনএইচএ) আহ্বায়ক প্রফেসর শাদরুল আলম ও সদস্যসচিব ডা. মো. আব্দুল আহাদ। এনসিপি সমর্থিত চিকিত্সকদের এই সংগঠনের নেতারা ১৩ জুন এক যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প ব্যয়ে চিকিত্সাসেবা প্রদানকারী এই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হলে দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে গেলে লাখো সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত গর্ভবতী মা, নবজাতক ও জরুরি চিকিত্সা প্রত্যাশী রোগীরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।