একসময় ‘ধর্মঘট’ ছিল স্রেফ মত প্রকাশের একটা মাধ্যম। প্রতিবাদের সর্বোচ্চ অহিংস ভাষা। আধুনিককালে তা দাবি আদায়ের সহজতম অব্যর্থ অস্ত্র। চুন থেকে পান খসলেই এখন ধর্মঘট। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল সম্ভবত পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়েছে গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বরে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বিরোধিতার মুখে সেই আইন ‘অচল মুদ্রা’ হয়ে থাকল প্রায় ১৪ মাস। অবশেষে গত মাসে ঠিক হলো ১ নভেম্বর থেকে আইনটি কার্যকর হবে। জনসচেতনতার নামে আচমকা সেই তারিখও পেছানো হলো আরো দুই সপ্তাহ। ১৭ নভেম্বর যেই সেতুমন্ত্রী আইনটি প্রয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন, অমনি পরদিনই বিভিন্ন জেলায় বিনা নোটিশে শুরু হয়ে গেল ‘পরিবহন ধর্মঘট’। দাবি আদায়ের সেই পুরনো খেলা চলল টানা চার দিন। ২০ নভেম্বর যোগ হলো নতুন মাত্রা—ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক-শ্রমিকদের ‘অনির্দিষ্ট কালের’ ধর্মঘট। তাতে অচল হয়ে পড়ল গোটা দেশ। জিম্মি হয়ে পড়ল জনগণ। তড়িঘড়ি করে ওই দিন রাতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনার ডাক। টানা চার ঘণ্টার দেন-দরবারে মধ্যরাতেই মিলল ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা। বিনিময়ে নেতাদের ৯ দফা দাবির বিষয়ে মন্ত্রীর আশ্বাস আর ৩০ জুন, ২০২০ পর্যন্ত আইনটির ফের ‘কাগুজে বাঘ’ মর্যাদা। এ দেশে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরাই সম্ভবত একমাত্র গোষ্ঠী, তারা যা চায়, বরাবরই তা পায়। তাদের খামখেয়ালির কাছে সরকারগুলোর যেন ‘চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য থাকিব’ দশা। তাদের ‘দেশ অচলের হুমকি’র কাছে প্রতিটি সরকার যেন ‘কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা’। না হলে বেপরোয়া যান চালিয়ে মানুষ হত্যার যে সাজা ১৯৮৩ সালেও ছিল ১৪ বছর, তিন বছরের মাথায় দুই দফায় কমে তিন বছরে ঠেকে কী করে? ‘দায়গ্রস্ততা’র আরো দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির কথা। দুটি পৃথক সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় চালক-হেলপারের বিরুদ্ধে সাজার রায় হয়। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো ‘পরিবহন ধর্মঘট’। রায় বাতিলের দাবিতে ৩৯ ঘণ্টা বন্ধ থাকল দেশের চাকা। বেপরোয়া চালককে সাজা দেওয়ার ‘গোস্বা’তে দেশ কোমায় থাকল দুই দিন। মন্ত্রী-আমলা-নেতাদের তখন কী দৌড়-ঝাঁপ! দফায় দফায় মিটিং-সিটিং, বক্তৃতা-বিবৃতি। অনেক কষ্টে পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের মনভজন। তারপর রাহুমুক্তি। তা ছাড়া ওই ধর্মঘটে পরিবহন শ্রমিকদের আচরণও ছিল খুবই মারমুখী। ওই সময় পেটের দায়ে যেসব চালক রাস্তায় নেমেছে, প্রত্যেকে তাদের হাতে নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়েছে। জরুরি পণ্য সরবরাহে নিয়োজিত ১০ জন ট্রাকচালককে ট্রাক থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে ট্রাকের তপ্ত ইঞ্জিনের নিচে শুইয়ে রাখার ঘটনাও তারা ঘটিয়েছে। এমনকি অ্যাম্বুল্যান্সের চালকরাও রেহাই পায়নি। ওই ঘটনার কিছুদিন আগে বাস ভাড়ার নৈরাজ্য ঠেকাতে সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জেল-জরিমানা করলে তখনো একই কাণ্ড হয়। চালক-মালিকরা পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি দেয়। ফলে থেমে যায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরের কথা। চালক-হেলপারদের পাঁচটি মামলা দণ্ডবিধির ৩০২ থেকে ৩০৪ ধারায় স্থানান্তরসহ আট দাবি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি টেবিলে রেখে শুরু হলো দর-কষাকষির বৈঠক। তাতে সিদ্ধান্ত হয়, সড়ক দুর্ঘটনার মামলাগুলো এখন থেকে আর দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় (মৃত্যুদণ্ডযোগ্য) মামলা নেওয়া হবে না। নেওয়া হবে ৩০৪-খ ধারায় (তিন বছর কারাদণ্ডযোগ্য)। পুরনো মোটরযান আইন মতে, পাঁচ বছর পর ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নে চালকদের পুনরায় পরীক্ষা দিতে হতো। শ্রমিক নেতাদের আবদারে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, এখন থেকে শুধু চোখ পরীক্ষা করেই লাইসেন্স নবায়ন করা হবে। এরই মধ্যে দুর্ঘটনার যেসব মামলা ৩০২ ধারায় নেওয়া হয়েছে, বৈঠকে তাও প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। ওই সব সিদ্ধান্তের পর শ্রমিক নেতারা ২৩ সেপ্টেম্বর আহূত দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘট সাময়িকভাবে স্থগিত (পূর্ণ স্থগিত নয়) করেন। তার পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মৃত্যুদণ্ডযোগ্য ওই পাঁচ মামলাকে তিন বছর কারাদণ্ডযোগ্য মামলায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে পিটিয়ে হত্যা, বাস-ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা মামলাও ছিল। তাতে সেখানে চালক-হেলপারের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত হয়েছিল (প্রথম আলো, ১৯ সেপ্টেম্বর ও ৫ অক্টোবর ২০১৩)। এই হচ্ছে বেপরোয়া যান চালক-মালিকদের বিরুদ্ধে আমাদের সরকারের অবস্থান। কার্যত পরিবহন শ্রমিকদের কাছে আমরা যে কতটা জিম্মি, কতটা অসহায়—সাম্প্রতিক পরিবহন ধর্মঘটই তার প্রমাণ। ধর্মঘটের বার্তা কী এই, পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা প্রচলিত আইন-কানুন ও রীতি-নীতির ঊর্ধ্বে? তারা ‘গতি নিয়ন্ত্রকহীন’, ফিটনেসহীন গাড়ি নিয়ে স্বেচ্ছাচারী ‘রাস্তার রাজা’ হবে, নিরীহ মানুষ পিষবে; কিন্তু গায়ে ফুলের আঁচড়টিও লাগানো যাবে না। চালকের আসনে বসে তারা যত বড় খুনি হোক না কেন, তাদের বিচার বা সাজা দেওয়া যাবে না! তারা যখন যাকে ইচ্ছা গাড়িচাপা দেবে, কিন্তু টুঁ শব্দটি করা যাবে না। চালকরা যতই অদক্ষ, অপেশাদার কিংবা লাইসেন্সবিহীন হোক না কেন, তাতে যত বড় অঘটনই ঘটুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত পদক্ষেপ চলবে না। তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো আইন-কানুন প্রণয়ন করা যাবে না? তা ছাড়া চালকরা যেন কোনো কিছুতে বা কোনোভাবে যেন সতর্ক হওয়ার বান্দাও নয়। তাদের ধর্মঘট উল্টা বারবার সরকারকেই সতর্ক করে দেয়। তাদের ভাবটা যেন এমন, ‘ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা...’। ধরলে ১৬ কোটি মানুষ আর তার সরকারকেই ধরিয়ে দেবে! পরিবহন শ্রমিকদের এত দৌরাত্ম্য, এত ঔদ্ধত্য, এত স্বেচ্ছাচার; অথচ তার পরও তাদের বিরুদ্ধে সরকারগুলোর এত নতজানুদশা। তাতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, এ জিম্মি দশার শেষ কোথায়? কোথায় দশ ও দেশের মুক্তি? মুক্তি আদৌ আছে, নাকি এটাই আমাদের অনিবার্য নিয়তি? লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট aftabragib2@gmail.com