kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

দিল্লির চিঠি

উগ্র হিন্দুয়ানার শক্তি যেন মাথাচাড়া না দেয়

জয়ন্ত ঘোষাল

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উগ্র হিন্দুয়ানার শক্তি যেন মাথাচাড়া না দেয়

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আবার একটি ঐতিহাসিক রায় দিলেন। ২৭ বছর আগে বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়। ওই মসজিদ ভাঙার ঘটনায় গোটা বিশ্বে ভারত নিন্দিত হয়েছে। সেই বাবরি মসজিদ ভাঙার জন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা এখনো চলছে। সে মামলাটি আলাদা। ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত এই তথাকথিত বাবরি মসজিদে নামাজ পড়া হতো—তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানালেন শীর্ষ আদালত। উল্টো প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগইয়ের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতি ঐকমত্যের ভিত্তিতে রামমন্দির নির্মাণের জন্য নতুন একটি ট্রাস্ট গঠন করতে নির্দেশ দিলেন।

আরো বলে দেওয়া হয়েছে, তিন মাসের মধ্যে ভারত সরকারকে মন্দির গড়ার পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। প্রধান বিচারপতি ১৭ নভেম্বর অবসর নিতে চলেছেন। এর আগে এই ঐতিহাসিক রায়ে আরো মেনে নেওয়া হলো আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। বল হলো, বাবর এ মসজিদ গড়েননি। গড়েছিলেন মির ওয়াসিম।

এখন প্রশ্ন হলো—অতঃ কিম? অর্থাৎ এর ফলে এখন বিজেপি কী করবে? বিজেপির রণকৌশল হলো, এখনই আর কাশী বা মথুরার মতো অন্য কোনো মন্দিরের ব্যাপারে রাজনীতির আন্দোলন না করে অযোধ্যায় এক বিশাল রামমন্দির নির্মাণ করা।

বিজেপির বিরোধী প্রতিপক্ষ অবশ্য মনে করছে যে পরবর্তী লোকসভা ভোটের আগে অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ করে বিজেপি ভোটে যাবে। এতে অর্থনীতি ও অন্য সব ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যাবে। মোদি অবশ্য বলছেন, রাম বাহিনী নয়, এ হলো দেশের জয়।

ভারতবর্ষে ৫০০ বছরের প্রাচীন এক বিবাদের নিরসন হলো। সুপ্রিম কোর্ট অবশেষে রামমন্দির বনাম বাবরি মসজিদ বিতর্কের অবসান ঘটালেন। রায়ে জানালেন, এই অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মিত হবে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর বিশ্বাসকে যেমন সুপ্রিম কোর্ট মর্যাদা দিলেন, ঠিক সেভাবে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার যে অনুসন্ধান প্রতিবেদন, তার তথ্য ও সিদ্ধান্ত—তাকেও গুরুত্ব দিলেন। এ ধরনের বিবাদ নিরসন খুব সহজ কাজ যে ছিল না, সে কথা নিশ্চয়ই সবাই স্বীকার করবেন। রাজীব গান্ধী চেষ্টা করেছিলেন। তিনি সফল হননি। নরসিমা রাও তো বাবরি মসজিদ ভাঙার পর সুপ্রিম কোর্টের কাঁধে বন্দুক রেখে এই বিপদ বৈতরণি থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন। মনে আসছে, প্রধানমন্ত্রী হয়ে চন্দ্রশেখর বলেছিলেন, তিন মাসের মধ্যে তিনি সমস্যার সমাধান করে দিতে পারেন, করতে পারেননি। তাঁর সরকারই পড়ে গেল, সমস্যা সমাধান তো দূর-অস্ত। আজ এত বছর পর যে এ সমস্যার সমাধান হলো, সুপ্রিম কোর্ট দায়িত্ব নিয়ে একটি রায় ঘোষণা করলেন, তাতে মানসিকভাবে যথেষ্ট শান্তি পাচ্ছি। যাঁরা বলেন, এই বিতর্ক ভারতের রাজনীতিতে অগ্রাধিকার পাওয়া কাম্য নয়। অগ্রাধিকার তো হওয়া উচিত অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, উন্নয়নে—তাঁদেরও তো স্বস্তি পাওয়া উচিত। অন্তত এই রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আর বৃদ্ধি পাওয়া কাম্য নয়।

দেখুন, এ ধরনের রায়ের পক্ষে ভারতের সব মানুষ থাকবে—এমনটি আশা করা উচিত নয়। এত বড় দেশ। কোটি কোটি মানুষ। সুপ্রিম কোর্টে পাঁচজন বিশিষ্ট বিচারপতি একত্রে এক অখণ্ড রায় দিয়েছেন ঐকমত্যের ভিত্তিতে। তবু রায়ের বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশের অধিকার আছে যেকোনো ভারতীয় নাগরিকের। কিন্তু মতপার্থক্য যা-ই হোক, সুপ্রিম কোর্টের এই এক হাজার ৪৫ পৃষ্ঠার রায় পর্যালোচনা করে বোঝা যাচ্ছে যে পাঁচ বিচারপতি প্রতিটি তথ্য খতিয়ে দেখেছেন। এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় ও সেই সময়কার দলিলগুলো তাঁরা খতিয়ে দেখেছেন। যেমন সুন্নি বোর্ডকে আদালত জানিয়েছেন, ১২ বছরের মধ্যে আইন মেনে দাবি না জানানোয় তাদের ওই জমির টাইটেল নিয়ে কোনো অধিকার নেই। আবার রামলালাকেও আইনি সত্তা নয় বলে সুপ্রিম কোর্ট তাদেরও মন্দির নির্মাণের অধিকার থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য, রামলালা ঈশ্বরের প্রতীক। আইনি শরিক জমির মালিক হবেন কী করে? সুপ্রিম কোর্ট এখন ভারত সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন একটি ট্রাস্ট গঠন করতে। সেই ট্রাস্ট তিন মাসের মধ্যে মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা রচনা করবে। এই ট্রাস্ট গঠনের ক্ষেত্রে নির্মোহি আখড়াকে কাজে লাগাতে পারে; কিন্তু নির্মোহি আখড়াও তাদের টাইটেল গ্রহণের ক্ষেত্রে ২০ বছরের মধ্যে দাবি না জানানোয় তাদের অধিকারও খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়াও কিন্তু খুব সহজ কাজ ছিল না। আমার তো এ জন্য ভালো লাগছে যে পাঁচজন বিচারপতি একত্র হয়ে এ ধরনের দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছেন।

নরসিমা রাও আদালতের দীর্ঘসূত্রতা চেয়েছিলেন; কিন্তু মোদি তো দ্রুত নিষ্পত্তি চান। রামমন্দির সম্পর্কিত বিজেপির অবস্থানের সঙ্গে আপনি একমত না হতেই পারেন। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস যখন এনডিএর শরিক ছিল, তখনো তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রামমন্দির নিয়ে কর্মসূচির বিরুদ্ধে ছিলেন। শরিকদের ভূমিকা তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, অটল বিহারি বাজপেয়িকে জোট সরকার চালানোর জন্য আপস করতে হতো। সে জন্য রামমন্দির, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ও ৩৭০—এসবই বিজেপিকে শিকেয় তুলে রাখতে হয়েছিল। আর মোদির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তিনি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য সরকার গঠন করেছেন।

দলীয় ইশতেহারে রামমন্দির নির্মাণের বিষয়টি নতুন নয়। আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, জনসংঘ—পরবর্তীকালে বিজেপির কোর ইস্যু এটি। ১৯৮৯ সালে লালকৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে রামমন্দির আন্দোলন শুরু হয়। হিমাচল প্রদেশে পালমপুরে বিজেপির জাতীয় কর্ম সমিতির বৈঠকে এই রামমন্দির আন্দোলনের বিষয়ে কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল। তাই মোদি যা করেছেন, তা দলীয় মতাদর্শ ও নীতি থেকে এক ইঞ্চিও সরে যাওয়া নয়, বরং রাজীব গান্ধী যখন অযোধ্যায় শিলান্যাস করার সিদ্ধান্ত নেন তখন নারায়ণ দত্ত তিওয়ারি লখনউয়ের মুখ্যমন্ত্রী। তখন তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুটা সিংহকে পাঠিয়েছিলেন অযোধ্যায়। মাচান বাবার আশীর্বাদ নিয়েছিলেন বুটা। গাছের ডালে বসে থাকতেন মাচান বাবা। তাই তাঁর নাম ছিল মাচান বাবা। বুটা তাঁর পা মাথার পাগড়ির ওপর রেখে ছবি তুলেছিলেন। আসলে মুলায়ম সিং বা লালুপ্রসাদ যাদব যেমন সংখ্যালঘু আর যাদব ভোটের রাজনীতি করতেন; কিন্তু হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরোধিতা করে মুসলিম ভোটকে দীর্ঘদিন অগ্রাধিকার দেন। কংগ্রেস কিন্তু চিরকাল তার বিরোধিতা করে। কংগ্রেস হিন্দু ভোটের সাবেকি দাবিদার। গান্ধী তো প্রথম রামরাজ্য গঠনের কথা বলেন। রামধুনকে জনপ্রিয় করেন। কংগ্রেস আজও হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়কেই কাছে টানতে চায়। আর এটি করতে গিয়ে ভারতীয় রাজনীতির মেরুকরণে কংগ্রেস বিপদে পড়ে। আমও গেল, ছালাও গেল কংগ্রেসের। আজও সুপ্রিম কোর্টের রায়কে কংগ্রেস স্বাগত জানিয়ে সমালোচনা করেছে বিজেপির রাজনীতির।

মোদি-অমিত শাহ যা করছেন, তাতে কিন্তু ধারাবাহিকতার কোনো অভাব নেই। কোনো দ্বিচারিতা নেই। কমিউনিস্ট তৃণমূল নেতারা, এমনকি কংগ্রেস এই হিন্দুত্ব রাজনীতির বিরোধিতা করতে পারে। আপনার মনে হতে পারে এটি ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, এটি সাম্প্রদায়িকতা। কিন্তু মোদি যা করছেন, তা কিন্তু করছেন নিজস্ব এবং দলীয় কনভিকশন থেকেই।

আজ এই রায়ের ঘোষণার পরও গোটা দেশে কিন্তু কোথাও কোনো অশান্তি বা উত্তেজনা দেখা যায়নি। রায়ে বলা হয়েছে, মুসলিম সমাজকেও অযোধ্যায় একটি মসজিদ নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হবে। এই মসজিদ নির্মাণ নিয়েও সরকার মুসলিম প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবে; যদিও অল ইন্ডিয়া মুসলিম ল বোর্ড এই রায়ে সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু এই বোর্ডের সব সদস্য একমত নন। সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে তাদের খোদ চেয়ারম্যানই অনুপস্থিত ছিলেন। আবার উত্তর প্রদেশ সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ড এই রায়ের বিরোধিতা করে ‘না’ বলেছে। আবার রায়ে বলা হয়েছে, বাবরি মসজিদ বাবর নির্মাণ করেননি। এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন মির ওয়াসিম। তিনি সুন্নি ছিলেন না। শিয়া ছিলেন। তাহলে সুন্নি সম্প্রদায়ের এই মসজিদ নির্মাণে কোনো অধিকার থাকবে কি না, তা নিয়েও মুসলিম সমাজের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে। নরেন্দ্র মোদি টুইট করে বলেছেন, কারো হার বা কারো বিজয় নয়—এ হলো দেশের জয়। মানুষের জয়।

আজ সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর একটিই প্রত্যাশা—দেশে কোনো অশান্তি যেন না হয়। উগ্র হিন্দুয়ানার শক্তিও যেন মাথাচাড়া না দেয়। দীর্ঘদিনের এক সমস্যার সমাধান হয়েছে—শুধু এ জন্য স্বস্তি পাওয়ার সময় এসেছে।

যেন একটি ফিল্মের ক্লাইম্যাক্স হলো! এক লম্বা সিনেমা শেষ হলো। শেষে বলা হলো হ্যাপি দি এন্ড।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা