kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

পৃথিবী গোলাকার, নাকি সমতল?

৩০ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পৃথিবী গোলাকার, নাকি সমতল?

১৯. আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি, আর আমি তাতে সব কিছু উদ্গত করেছি সুপরিমিতভাবে। [সুরা : হিজর, আয়াত : ১৯ (তৃতীয় পর্ব)]

তাফসির : পৃথিবীর কাঠামো সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য গত দুই পর্বে উল্লেখ করা হয়েছিল। এ পর্বে বিজ্ঞান ও কোরআনের বক্তব্যের মূল কথা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। পৃথিবীর কাঠামো বোঝাতে পবিত্র কোরআনে ছয় থেকে সাতটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। শব্দগুলো ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহূত হলেও সেগুলো পৃথিবী বিস্তৃত ও সুপ্রশস্ত হওয়ার অর্থ বহন করে। অর্থাৎ কোরআন শুধু পৃথিবীর বিস্তৃতি ও প্রশস্ততার প্রতি জোর দিয়েছে। কোরআনে সরাসরি কোথাও বলা হয়নি যে পৃথিবী গোলাকার বা সমতল। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে পৃথিবী গোলাকৃতির। পবিত্র কোরআন এ তত্ত্ব নাকচ করে না। বরং কোরআনের একাধিক আয়াত থেকে এ তত্ত্বের সমর্থনে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আয়াতগুলো এখানে উপস্থাপন করা হলো—

এক. ‘...তিনি (আল্লাহ) রাত্রি দ্বারা দিবসকে আচ্ছাদিত করেন এবং দিবস দিয়ে রাত্রিকে আচ্ছাদিত করেন...।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫)। এ আয়াতে রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তনের বিষয়টিকে ‘ইকাউভিরু/ইউকাউ-ইরু’ শব্দ দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। কোরআনের অনুবাদকরা এ শব্দের জন্য ‘আচ্ছাদিত হওয়া’র অর্থ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু এটি ওই শব্দের সরাসরি অনুবাদ নয়, ভাব-স্থানীয় বা সমার্থক শব্দ। ওই শব্দের মূল অর্থ কোনো কিছু গোল বানানো। যেমন—মাথায় পাগড়ি পেঁচানো। এ শব্দ পৃথিবী গোলাকার হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। কেননা রাতকে দিন দ্বারা ও দিনকে রাত দ্বারা এভাবে আচ্ছাদিত করা তখনই সম্ভব, যখন পৃথিবীর আকার গোল হবে। আমরা দেখি প্রথমে ভোর, এরপর আস্তে আস্তে দুপুর, এরপর বিকেল, এরপর গোধূলি, এরপর সন্ধ্যা। একসময় দিন রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়, যেভাবে আস্তে আস্তে পাগড়ির একটা অংশ অন্য অংশের মধ্যে ঢুকে পড়ে। যদি পৃথিবী সমতল হতো, একটা লম্বা কাঠের মতো হতো, তাহলে এভাবে দিন-রাত্রি হতো না। তখন এই তো দিন, আবার চোখের পলকে রাত নেমে পড়ত। তাই এ আয়াতে মহান আল্লাহ রাতকে দিন দিয়ে, আর দিনকে রাত দিয়ে আচ্ছাদিত করার যে প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, সেটা তখনই সম্ভব যখন পৃথিবী গোলাকার হবে। সুতরাং কোরআন সরাসরি না বললেও ইঙ্গিত দিয়েছে যে পৃথিবী গোলাকার।

আধুনিক বিজ্ঞানের বহু আগে কোরআনের এ আয়াত পাঠ করে ইমাম ইবনে হাজম আন্দালুসি (রহ.) পৃথিবী গোলাকার হওয়ার কথা বলেছেন। তিনি একাদশ শতাব্দীতে (৩৮৪-৪৫৬ হিজরি) ইন্তেকাল করেছেন। (ইবনে হাজম, আল-ফিছাল ফিল মিলাল : ১/৩৫২)

দুই. অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত-প্রশস্ত করে দিয়েছি...।’ (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ৭)। অর্থাৎ পৃথিবী সব সময় বিস্তৃত ও সুপ্রশস্ত। মানুষ সারা জীবন চলতে থাকলেও পৃথিবীকে প্রশস্ত পাবে। আর এই অব্যাহত প্রশস্ততা কেবল তখনই সম্ভব যখন পৃথিবী গোলাকার হবে। অন্য কোনো আকৃতির হলে তা সম্ভব নয়। কেননা সে সময় তাকে একটা না একটা সীমান্তে পৌঁছতেই হবে। কিন্তু গোলাকার হলে এ প্রশস্ততা চলমান থাকবে।

তিন. অন্য আয়াতে এসেছে, ‘এরপর তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন।’ (সুরা : নাজিআত, আয়াত : ৩০)। এ আয়াতে পৃথিবীর বিস্তৃতি বোঝাতে ‘দাহা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অনুবাদকরা এখানেও ‘বিস্তৃত করা’র অর্থ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এটি তার মূল অর্থ নয়। আরবি ভাষার প্রাচীন ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য অভিধান ‘লিসানুল আরব’-এ রয়েছে, ‘দাহ্উন’ শব্দটি কোনো গোলাকার বস্তু নিয়ে খেলা করা অর্থেও ব্যবহূত হয়। এ শব্দমূল থেকে এসেছে ‘আদহা’ ও ‘ইদহা’। এর অর্থ কবুতরের ডিম। সুতরাং এ আয়াত থেকেও পৃথিবী গোলাকার হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ



সাতদিনের সেরা