চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগের ১১ জেলায় একের পর এক ঘটছে ডাকাতি, ছিনতাই, সিঁধ কেটে চুরি ও চুরির ঘটনা। এসব ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, লুট হচ্ছে নগদ অর্থ ও মূল্যবান মালপত্র। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে চট্টগ্রাম বিভাগে এসব অপরাধে এক হাজার ৫০৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা ২৪৯টি। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় এবং বাংলাদেশ পুলিশের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে ছিনতাই বা চুরির শিকার অনেকেই মামলা করেন না। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরির ঘটনায় অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাঁদের মধ্যে অনেকে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা : পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ জুন রাতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারশত গ্রামের দীপক ডেইরি ফার্মে ১০ থেকে ১২ জনের একটি ডাকাতদল হানা দেয়। তারা খামারের মালিক ও কর্মচারীদের জিম্মি করে নগদ এক লাখ টাকা, প্রায় তিন ভরি স্বর্ণালংকার, পাঁচটি গরুসহ প্রায় ১৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকার মালপত্র লুট করে। এ ঘটনায় আনোয়ারা থানায় মামলা হয়। পরে ১৪ জুলাই আন্ত জেলা ডাকাতদলের সদস্য ইয়াছিন আরাফাত ও আল মামুন তুষার লিটনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইয়াছিনের বিরুদ্ধে ৯টি এবং তুষার লিটনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ তিনটি মামলা রয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গত ১৯ জুন কুমিল্লার মুরাদনগরের অটোরিকশাচালক মাহাবুব আলম মাসুম বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। রাত ১০টার দিকে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে শেষবার ফোনে কোম্পানীগঞ্জে যাওয়ার কথা জানান। পরদিন বাঙ্গরা বাজার থানার টনকী ইউনিয়নের বৈলাবাড়ী এলাকা থেকে মাথা ও চোখ থেঁতলানো এবং শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্নসহ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বাঙ্গরা বাজার থানায় মামলা হয়। পরে কোম্পানীগঞ্জে অটোরিকশাটি বিক্রির সময় নাঈম ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এক সহযোগীকে নিয়ে মাসুমকে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অটোরিকশাটি উদ্ধারসহ সহযোগী আরমান সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত ১৩ জুন রাত ২টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানার দাইয়াপাড়া এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে একটি দলের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে দুটি স্টিলের টিপছোরা, একটি চাপাতি এবং ডাকাতির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
পরিসংখ্যানে যা দেখা যাচ্ছে : চট্টগ্রাম মহানগর এবং পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের আওতাধীন কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও চাঁদপুর—এই ১১ জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডাকাতি, ছিনতাই, সিঁধ কেটে চুরি ও চুরির ঘটনায় এক হাজার ৫০৬টি মামলা হয়েছে।
এর মধ্যে ডাকাতির মামলা ৭৩টি, ছিনতাইয়ের ১৭৬টি, সিঁধ কেটে চুরির ৪৩৬টি এবং চুরির ৮২১টি।
তথ্য অনুযায়ী, এক হাজার ৫০৬টি মামলার মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের ১৬ থানায় হয়েছে ২৪৯টি। আর চট্টগ্রাম রেঞ্জের অধীন ১১০ থানায় হয়েছে এক হাজার ২৫৭টি মামলা। সে হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৫১টি মামলা হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য : চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, ‘ডাকাতি, ছিনতাই বা দস্যুতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বারবার একই ধরনের অপরাধ করে। পেশাদার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। যত বেশি অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা যাবে, ততই অপরাধ কমবে। তদন্তাধীন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করা গেলে ছিনতাই ও দস্যুতা আরো কমানো সম্ভব হবে।’
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের এক উপকমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ছিনতাই, চুরি বা ডাকাতির অভিযোগ পেলেই আমরা তদন্ত শুরু করি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নিয়মিত আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁদের অনেকেই কারাগার থেকে বের হয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।’
নগরবাসীর উদ্বেগ : স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাধারণত ভোর ও রাতে মানুষের চলাচল কমে গেলে নির্জন সড়কে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ঘুরে ছিনতাই, চলন্ত বাসে ছুরির ভয় দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া এবং রাতে পথরোধ করে টিপছোরার ভয় দেখিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। এ ছাড়া গৃহকর্মীর পরিচয়ে বাসাবাড়িতে চুরি এবং খালি বাসা বা দোকানের তালা ভেঙে চুরির ঘটনাও ঘটছে।
চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকার বাসিন্দা ফরহাদ ইসলাম বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমার এক আত্মীয় সকালে বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোড এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন। বাধা দিলে তাঁকে মারধর করে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়।’
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছিনতাইকারী ও দস্যুদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। টহল পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশও কাজ করছে। ছিনতাই বা চুরির ঘটনা ঘটলে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’

