• ই-পেপার

বরিশালে ৭ খাল খনন না করেই ৩ কোটি ৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা উত্তোলন

চট্টগ্রামে ছয় মাসে ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরির ১,৫০৬ মামলা

কাজী মনজুরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামে ছয় মাসে ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরির ১,৫০৬ মামলা

চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগের ১১ জেলায় একের পর এক ঘটছে ডাকাতি, ছিনতাই, সিঁধ কেটে চুরি ও চুরির ঘটনা। এসব ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, লুট হচ্ছে নগদ অর্থ ও মূল্যবান মালপত্র। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে চট্টগ্রাম বিভাগে এসব অপরাধে এক হাজার ৫০৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা ২৪৯টি। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় এবং বাংলাদেশ পুলিশের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে ছিনতাই বা চুরির শিকার অনেকেই মামলা করেন না। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরির ঘটনায় অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাঁদের মধ্যে অনেকে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা : পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ জুন রাতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারশত গ্রামের দীপক ডেইরি ফার্মে ১০ থেকে ১২ জনের একটি ডাকাতদল হানা দেয়। তারা খামারের মালিক ও কর্মচারীদের জিম্মি করে নগদ এক লাখ টাকা, প্রায় তিন ভরি স্বর্ণালংকার, পাঁচটি গরুসহ প্রায় ১৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকার মালপত্র লুট করে। এ ঘটনায় আনোয়ারা থানায় মামলা হয়। পরে ১৪ জুলাই আন্ত জেলা ডাকাতদলের সদস্য ইয়াছিন আরাফাত ও আল মামুন তুষার লিটনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইয়াছিনের বিরুদ্ধে ৯টি এবং তুষার লিটনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ তিনটি মামলা রয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

গত ১৯ জুন কুমিল্লার মুরাদনগরের অটোরিকশাচালক মাহাবুব আলম মাসুম বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। রাত ১০টার দিকে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে শেষবার ফোনে কোম্পানীগঞ্জে যাওয়ার কথা জানান। পরদিন বাঙ্গরা বাজার থানার টনকী ইউনিয়নের বৈলাবাড়ী এলাকা থেকে মাথা ও চোখ থেঁতলানো এবং শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্নসহ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বাঙ্গরা বাজার থানায় মামলা হয়। পরে কোম্পানীগঞ্জে অটোরিকশাটি বিক্রির সময় নাঈম ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এক সহযোগীকে নিয়ে মাসুমকে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অটোরিকশাটি উদ্ধারসহ সহযোগী আরমান সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত ১৩ জুন রাত ২টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানার দাইয়াপাড়া এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে একটি দলের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে দুটি স্টিলের টিপছোরা, একটি চাপাতি এবং ডাকাতির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

পরিসংখ্যানে যা দেখা যাচ্ছে : চট্টগ্রাম মহানগর এবং পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের আওতাধীন কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও চাঁদপুর—এই ১১ জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডাকাতি, ছিনতাই, সিঁধ কেটে চুরি ও চুরির ঘটনায় এক হাজার ৫০৬টি মামলা হয়েছে।

এর মধ্যে ডাকাতির মামলা ৭৩টি, ছিনতাইয়ের ১৭৬টি, সিঁধ কেটে চুরির ৪৩৬টি এবং চুরির ৮২১টি।

তথ্য অনুযায়ী, এক হাজার ৫০৬টি মামলার মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের ১৬ থানায় হয়েছে ২৪৯টি। আর চট্টগ্রাম রেঞ্জের অধীন ১১০ থানায় হয়েছে এক হাজার ২৫৭টি মামলা। সে হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৫১টি মামলা হয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য : চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, ‘ডাকাতি, ছিনতাই বা দস্যুতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বারবার একই ধরনের অপরাধ করে। পেশাদার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। যত বেশি অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা যাবে, ততই অপরাধ কমবে। তদন্তাধীন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করা গেলে ছিনতাই ও দস্যুতা আরো কমানো সম্ভব হবে।’

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের এক উপকমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ছিনতাই, চুরি বা ডাকাতির অভিযোগ পেলেই আমরা তদন্ত শুরু করি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নিয়মিত আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁদের অনেকেই কারাগার থেকে বের হয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।’

নগরবাসীর উদ্বেগ : স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাধারণত ভোর ও রাতে মানুষের চলাচল কমে গেলে নির্জন সড়কে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ঘুরে ছিনতাই, চলন্ত বাসে ছুরির ভয় দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া এবং রাতে পথরোধ করে টিপছোরার ভয় দেখিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। এ ছাড়া গৃহকর্মীর পরিচয়ে বাসাবাড়িতে চুরি এবং খালি বাসা বা দোকানের তালা ভেঙে চুরির ঘটনাও ঘটছে।

চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকার বাসিন্দা ফরহাদ ইসলাম বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমার এক আত্মীয় সকালে বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোড এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন। বাধা দিলে তাঁকে মারধর করে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়।’

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছিনতাইকারী ও দস্যুদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। টহল পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশও কাজ করছে। ছিনতাই বা চুরির ঘটনা ঘটলে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’

নড়াইলে পাওনা টাকা চাওয়ায় যুবককে হত্যা

৭ জেলায় ৪ খুন, ৪ লাশ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
নড়াইলে পাওনা টাকা চাওয়ায় যুবককে হত্যা

নড়াইলে পাওনা টাকা চাওয়ায় যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ময়মনসিংহের দুই উপজেলায় একই রাতে দুজন খুন হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে ঝগড়া থামাতে গিয়ে পিটুনিতে আহত বৃদ্ধ গতকাল মারা গেছেন। মাদারীপুরে পারিবারিক কলহে স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগে আটক হয়েছেন স্বামী।

এ ছাড়া ঢাকার সাভার, বরিশাল, রাজবাড়ী ও মুন্সীগঞ্জে পাওয়া গেছে চারজনের লাশ। কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

নড়াইল : লোহাগড়া উপজেলায় পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার রাতে ইতনা ইউনিয়নের কুমড়ডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত আলিনুর ফকির কুমড়ডাঙ্গা গ্রামের আব্দুল হাই ফকিরের ছেলে। তিনি পেশায় রাজমিস্ত্রি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একই গ্রামের জাহাঙ্গীর শেখের ছেলে রাজিব শেখের কাছে পাওনা টাকা চাইলে আলিনুরের সঙ্গে তাঁর বাগবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে রাজিব ছুরি দিয়ে আলিনুরের পেটে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ময়মনসিংহ : সদর ও গৌরীপুর উপজেলায় গত শনিবার রাতে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পুলিশ লাশ দুটি উদ্ধার করে গতকাল মর্গে পাঠিয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, গৌরীপুরের মইলাকান্দা ইউনিয়নের ডেংগা মোড় সংলগ্ন এলাকা থেকে আব্দুল মান্নান ওরফে মুন্নাফ (৬৫) নামের বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি শনিবার রাতে প্রতিবেশী মোস্তফার সঙ্গে ডেংগা মোড় থেকে বাড়িতে ফিরছিলেন। হঠাৎ মোস্তফা আড়াল হয়ে গেলে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা আব্দুল মান্নানকে লক্ষ্য করে চাকু দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে ময়মনসিংহের সদর উপজেলায় এক ইজি বাইকচালক রাজিব ইসলামকে (২৫) কুপিয়ে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাই করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। নিহত রাজিব ইসলাম নগরীর চর ঈশ্বরদিয়া সাইতন কান্দা এলাকার এবাদুল ইসলামের ছেলে।

সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) : ঝগড়া থামাতে গিয়ে পিটুনিতে আহত ফজলুল হক (৬০) দুই দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মারা গেছেন। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

তবে নিহতের পরিবারের দাবি, এক বছর আগে ছেলের হত্যা মামলার বাদী হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, গত ১৭ জুলাই রাতে সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল সৈয়দপাড়া ক্যানেলপাড় এলাকার ‘আহসান ভিলা (মিয়া বাড়ি)’র সামনে এই হামলার ঘটনা ঘটে।

কালকিনি (মাদারীপুর) : পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামীর বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় অভিযুক্তকে আটক করেছে পুলিশ।

শনিবার রাতে উপজেলার বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের আউলিয়ারচর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত জোবাদা বেগম (৬০) ওই গ্রামের সুলতান সরদারের স্ত্রী।

সাভার (ঢাকা) : আশুলিয়ায় নদীতে ভাসমান অবস্থায় ওয়েস্টেজ ব্যবসায়ী মঈনুল ইসলামের (৫৫) মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল সকালে শিমুলিয়া ইউনিয়নে নদী থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। এ সময় তাঁর কাছে থাকা ২৬ হাজার ৩৪০ টাকা, একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন ও বেশ কয়েকটি চাবি উদ্ধার করা হয়। নিহত মঈনুল ইসলাম গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রাপুর নামাপাড়া এলাকার মজিবুর রহমানের ছেলে।

বরিশাল : নগরীতে ঝুলন্ত অবস্থায় বৃদ্ধা সালেহা বেগমের (৬৮) মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল দুপুরে আলেকান্দা এলাকার বাসা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।

ওই বৃদ্ধার ছেলে রাজিব সিকদার সোহাগ জানান, তিন মাস আগে তাঁর মায়ের পেটের অপারেশন হয়েছে। এর পর থেকে তিনি প্রায়ই অসুস্থ। মাঝেমধ্যে ব্যথায় চিৎকার করতেন। রবিবার সকালে তিনি ও তাঁর স্ত্রী বাসার বাইরে যান। মা বাসায় একাই ছিলেন। তাঁরা বাসায় ফিরে দেখেন, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ, মাকে ডেকেও সাড়া পাচ্ছেন না। পরে পুলিশ ডেকে দরজা ভেঙে লাশটি উদ্ধার করা হয়।

রাজবাড়ী : কালুখালী উপজেলায় জসিম শেখ (২৮) নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত জসিম শেখ উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের গঙ্গানন্দপুর গ্রামের মৃত বিশু শেখের ছেলে।

গতকাল সকালে গঙ্গানন্দপুর গ্রামের রেললাইনের পাশে একটি পোলট্রি খামার থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। কালুখালী থানার ওসি মোস্তফা কামাল জানান, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

মুন্সীগঞ্জ : নিখোঁজের চার দিন পর খাল থেকে ভাসমান অবস্থায় লাকি বেগমের (৬৫) মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল সকালে সদর উপজেলার চরনুশুরা গ্রামের ঝাপটা এলাকায় লাশটি ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়।

পুলিশ জানায়, মৃতদেহটি মাঠপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহকারী শিক্ষিকা লাকি বেগমের। মুন্সীগঞ্জ শহরে তাঁর বাসা থেকে চার দিন আগে তিনি নিখোঁজ হন।

বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ

তাপপ্রবাহে বছরে ২৪ কর্মদিবস নষ্ট হতে পারে শ্রমিকদের

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
তাপপ্রবাহে বছরে ২৪ কর্মদিবস নষ্ট হতে পারে শ্রমিকদের

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশকে আরো উষ্ণ করে তুলছে না, বরং লাখ লাখ পরিবারকে আরো গভীর আর্থিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে বাংলাদেশে শ্রমিকদের আয় যেমন কমছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিকিৎসা খরচ। ‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং : আ কল ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জার্মানিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল।

গতকাল রবিবার প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে জলবায়ুজনিত চরম তাপপ্রবাহের সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ভারত ও নাইজেরিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশেও অনানুষ্ঠানিক শ শ্রমবাজারের আধিক্য, স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত উচ্চব্যয় ও সীমিত সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার কারণে ঝুঁকি আরো তীব্র হয়ে উঠছে। আটটি দেশের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার তথ্য প্রথমবারের মতো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে কিভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ একই সঙ্গে মানুষের আয় কমায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায়।

গবেষণার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা তাপজনিত কারণে বছরে গড়ে ২৩.৭৫ কর্মদিবস হারাতে পারেন। বর্তমানে এসব খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৬.২৮ শতাংশ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে ৯.৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময় সব খাত মিলিয়ে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৪.২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৮৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা, যাঁদের অসুস্থতাজনিত ছুটি, স্বাস্থ্যবীমা বা আয় সুরক্ষার সুযোগ নেই, তাঁরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন। সূত্র : ওয়েবসাইট

 

যাত্রীছাউনিতে যাত্রী নেই, হকারের দখলে

দায় এড়াতে একে অন্যকে দোষ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার অবকাঠামো

নিশাত বিজয়
যাত্রীছাউনিতে যাত্রী নেই, হকারের দখলে
ভাসমান দোকানিদের দখলে যাত্রীছাউনি। রাজধানীর শাহজাদপুর থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যাত্রীছাউনি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল নির্ধারিত বাসস্টপে যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক অপেক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে বেশির ভাগ যাত্রীছাউনি এখন সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছে না। কোথাও হকারের দখল, কোথাও ভবঘুরের আশ্রয়স্থল, কোথাও দোকান বা ময়লার স্তূপ। আবার অনেক যাত্রীছাউনিতে বাসই থামে না। ফলে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে বাসে ওঠানামা করছে।

গত কয়েক বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রাজধানীতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছে। এসব যাত্রীছাউনির পরিকল্পনা করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। আর নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানো নিশ্চিত করার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের। তবে সমন্বয়ের অভাব, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং নজরদারির দুর্বলতায় যাত্রীছাউনিগুলোর বড় অংশ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

 

২২৯ স্থানের পরিকল্পনা, নির্মাণ হয়েছে ১০৪টি

ডিটিসিএর বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির নকশা ও ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর ২২৯টি স্থানে যাত্রীছাউনি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১৬৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৬১টি স্থান নির্ধারণ করা হয়।

এ পর্যন্ত ডিএনসিসি তিন কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০টি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছে। প্রতিটির নির্মাণ ব্যয় গড়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা।

ডিএসসিসির অধীনে রয়েছে ৪৪টি যাত্রীছাউনি। আকারে তুলনামূলক ছোট এসব ছাউনি নির্মাণে প্রতিটির গড় ব্যয় প্রায় সাত লাখ টাকা।

এ ছাড়া ২০১৮ সালে বিমানবন্দর সড়কের দুই পাশে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি দৃষ্টিনন্দন যাত্রীছাউনি নির্মাণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ভিনাইল ওয়ার্ল্ড’।

 

হকার, দোকান, ময়লার স্তূপ

সরেজমিনে মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, গুলিস্তান, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, দোলাইরপাড়, মহাখালী, বিমানবন্দর সড়ক, কুড়িল, মালিবাগ ও আজিমপুর এলাকায় যাত্রীছাউনির একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।

অনেক যাত্রীছাউনির লোহার রেলিং খুলে নেওয়া হয়েছে, ভেঙে গেছে টেম্পার্ড গ্লাস, বেঞ্চ নেই। কোথাও ফল ও চায়ের দোকান, কোথাও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। আবার অনেক যাত্রীছাউনি ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

বছিলা এলাকায় একটি যাত্রীছাউনি প্রায় দুই বছর ধরে টেম্পোস্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সামনে রাখা হয়েছে ডিপিডিসির বড় আকারের কেবল রিল। ফলে ছাউনিটি প্রায় আড়াল হয়ে গেছে।

মোহাম্মদপুরের একটি যাত্রীছাউনির এক পাশে ডিএনসিসির ময়লার স্তূপ, অন্য পাশে মুদি ও সবজির দোকান। আল্লাহ করিম মসজিদের বিপরীত পাশের যাত্রীছাউনিও হকারদের দখলে।

ধানমণ্ডি-১৫, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব মোড়, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও মিরপুর সড়কের যাত্রীছাউনিগুলোর কোনোটিই কার্যকর বাসস্টপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। শাহবাগ ও রমনা পার্ক এলাকার যাত্রীছাউনিতে আশ্রয় নিয়েছে ভ্রাম্যমাণ মানুষ।

আবার অনেক স্থানে যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে নিয়মিত বাস থামে না বা যাত্রী চলাচল কম। বিপরীতে মিরপুরের আনসার ক্যাম্প, মতিঝিল, রামপুরা, বাড্ডাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় যাত্রীছাউনি কম।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, যাত্রীছাউনির উদ্দেশ্য হলো যাত্রীদের রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং নির্ধারিত স্টপেজ থেকে ওঠানামার ব্যবস্থা করা। কিন্তু রাজধানীর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস নির্ধারিত স্টপেজে না থামায় পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে।

 

একে অন্যকে দোষ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো

মোহাম্মদপুর-বিমানবন্দর সড়কে চলাচলকারী বাসচালক শহিদ মিয়া বলেন, যাত্রীরা বিভিন্ন স্থানে বাস থামাতে চাপ দেয়। আর যাত্রী তুলতে চালকরাও নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামান।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর অভিযোগ, চালকরা ইচ্ছাকৃতভাবে বাসস্টপ এড়িয়ে চলেন। কিছু যাত্রী নিয়ম না মানলেও সেটি দেখার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের। যাত্রীছাউনি দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন, ডিটিসিএ ও পুলিশের। কিন্তু কোনো সংস্থাই কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করছে না।

অন্যদিকে নিজেদের দায়িত্বের কথা স্বীকার করলেও বাসস্টপ সচল না থাকার জন্য ট্রাফিক পুলিশের দিকেই আঙুল তুলছে দুই সিটি করপোরেশন।

ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম রায়হান খান বলেন, মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, তবে নিয়মিত নয়। বাসস্টপে বাস না থামলে সেখানে দখল ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না।

ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং) রাজীব খাদেম বলেন, যাত্রীছাউনি নির্মাণ ও ট্রাফিক সাইন স্থাপনের কাজ করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযানও পরিচালিত হয়। কিন্তু পরে আবার দখল হয়ে যায়।

তবে উত্তর সিটি করপোরেশন স্বীকার করেছে, নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলছে, বাজেটসংকটের কারণে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান বলেন, বাস রুট ব্যবস্থাপনা ও স্টপেজ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক বাস পরিচালনাসহ বিভিন্ন কারণে এটি দ্রুত সমাধান করা যাচ্ছে না।

 

সমন্বয়ের দায়িত্ব ডিটিসিএর, সংকট জনবলে

ডিটিসিএ সূত্র জানায়, জনবল সীমিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, সমন্বয় ও বাসস্টপ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে যাত্রীছাউনি নির্মিত হলেও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। রাজধানীর সব যাত্রীছাউনির অবস্থা পর্যালোচনা করে যাত্রীদের ব্যবহারের উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।