এবার গভীর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের রোকনপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে পুনর্ভবা নদীপথে নৌকাযোগে ১৫ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। সেই চেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করেছে বিজিবি। পরে বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়েছে বলে ধারণা করছে বিজিবি। এ ছাড়া গভীর রাতে মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সীমান্তে জড়ো করে বিজিবিকে পুশ ইন ঠেকাতে সাহায্য করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। গত ১০ দিনের মধ্যে গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশ ইনের এটি ছিল বিএসএফের দ্বিতীয় চেষ্টা। এ ছাড়া লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের পুশ ইন ব্যর্থ করেছে বিজিবি ও স্থানীয়রা। কুষ্টিয়া সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক সিদ্ধান্ত ছাড়া শেষ হওয়ার কারণে ওই সীমান্তের শূন্য রেখায় নারী ও শিশুসহ ১২ জন এখনো খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে।
গোমস্তাপুর সীমান্ত : গোমস্তাপুর সীমান্তের ঘটনা সম্পর্কে বিজিবি জানায়, গত শুক্রবার রাত পৌনে ১টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোকনপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকার প্রধান আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ২২০/এমপির কাছ দিয়ে ৮৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কোটালপুর ক্যাম্পের সদস্যরা পাঁচ শিশু ও আট নারীসহ ১৫ জনকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক টেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। নদীপথে একটি নৌকায় তাদের বাংলাদেশের দিকে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। কিন্তু নৌকাটি শূন্য রেখায় আসার পরপরই বিজিবির বাধা পায়। বিজিবির বাধার মুখে পরে রাত পৌনে ৩টার দিকে বিএসএফের ৮৮ ব্যাটালিয়নের কোটালপুর সীমান্ত ফাঁড়ির সদস্যরা পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার ভবানীপুর এলাকা দিয়ে ভারতের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তাদের।
সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, রাত ১টার দিকে খবর পেয়ে এলাকায় মাইকিংয়ের মাধ্যমে লোক জড়ো করে বিজিবিকে পুশ ইন ঠেকাতে সাহায্য করা হয়েছে। গ্রাম পুলিশসহ এলাকাবাসী সারা রাত ক্লান্তিহীন পাহারার পর এখনো সতর্ক রয়েছে। সম্মিলিত চেষ্টায় পুশ ইনের চেষ্টা করা ১৫ জনকে হটিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গতকাল ভোর পৌনে ৫টার দিকে দায়িত্বশীল নওগাঁ ব্যাটালিয়নের (১৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুল ইসলাম মাসুম জানান, বিজিবি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সীমান্তে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহল অব্যাহত রয়েছে। নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে পুশ ইন, অবৈধ অনুপ্রবেশ, অবৈধ পারাপার প্রতিরোধে বিজিবি সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছে এবং পেশাদরির সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এ ধরনের কোনো অপতৎপরতা প্রতিহত করতে বিজিবি বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি।
এর আগে গত ৪ জানুয়ারি গোমস্তাপুরের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ২৮ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। কিন্তু বিজিবির কঠোর প্রতিরোধের মুখে টানা দুই দিন সীমান্তে অবস্থানের পর ওই ২৮ জনকে সীমান্ত থেকে ভারতের ভেতরে সরিয়ে নেয় বিজিবি। এর আগে গত ৬ এপ্রিল রোকনপুর সীমান্ত দিয়ে দুই নারীকে পুশ ইন করে বিএসএফ। গোমস্তাপুর সীমান্ত থেকে মালদহ কাছে হওয়ায় এই সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ পুশ ইনের চেষ্টা করে বলে জানিয়েছেন লে. কর্নেল মাসুম।
কুষ্টিয়া সীমান্তে শিশুসহ ১২ জন এখনো শূন্য রেখায় : কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বিলগাথুয়া সীমান্ত দিয়ে পুশ ইনের চেষ্টার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকটি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। ফলে নারী ও শিশুসহ ১২ জন এখনো সীমান্তের শূন্য রেখায় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় বিলগাথুয়া সীমান্তের ১৫০/৩-এস সীমান্ত পিলার সংলগ্ন এলাকায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে এই পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিজিবির পক্ষে কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির উপ-অধিনায়ক নুরুল হুদার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল এবং বিএসএফের পক্ষে রানীনগর কম্পানি কমান্ডার সুনিল কুমার ইয়াদবের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়।
বিজিবি সুত্র জানায়, বৈঠকে বিএসএফ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের অভিযোগ অস্বীকার করে। একই সঙ্গে শূন্য রেখায় অবস্থানরত ওই ১২ জনকে নিজেদের হেফাজতে ফিরিয়ে নিতেও অস্বীকৃতি জানায়। এ অবস্থায় বিজিবি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানালে বিএসএফ বিষয়টি তদন্ত করে পরে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে বলে জানায়। ফলে আপাতত ওই ১২ জনকে শূন্য রেখাতেই খোলা আকাশের নিচে মানবেতরভাবে অবস্থান করতে হচ্ছে।
গত শুক্রবার (১২ জুন) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নারী ও শিশুসহ এই ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেন। পরে তারা ভারতের অভ্যন্তরে শূন্য রেখার কাছাকাছি অবস্থান নেয়। পুশ ইনের শিকার ব্যক্তিদের দাবি, ভারতের কেরালা রাজ্য থেকে তাদের আটক করা হয়েছিল। পরে বিএসএফ তাদের বিলগাথুয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বিএসএফ কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে পুশ ইনের বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং তদন্ত করে দেখার জন্য সময় চেয়েছে। তিনি আরো বলেন, সীমান্ত রক্ষায় বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং দেশের স্বার্থসংশ্ল্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
লালমনিরহাট সীমান্তে পুশ ইন চেষ্টা ব্যর্থ : লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে বিএসএফের ‘পুশ ইন’ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার আমঝোল সীমান্তের ৯০৬ নম্বর প্রধান পিলারের ৮ নম্বর সাব-পিলারসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে আমঝোল সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার গেটের কাছে ১০ থেকে ১২ জনকে একটি গাড়িতে করে নিয়ে আসেন বিএসএফের ৭৮ ব্যাটালিয়নের পাগলামারী ক্যাম্পের সদস্যরা। অভিযোগ রয়েছে, তাদের জোর করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়।
সীমান্তে বিএসএফের এমন অস্বাভাবিক তৎপরতা টের পেয়ে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গ্রামবাসীকে একত্র করে। তারা স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পকে বিষয়টি জানায় এবং খবর পেয়ে বিজিবি সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, কয়েক শ গ্রমবাসী ও বিজিবি সদস্যরা শূন্য রেখায় যৌথভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুললে বিএসএফ তাদের পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা ওই ব্যক্তিদের শূন্য রেখা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে এই পুশ ইনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ধারণা করছে স্থানীয়রা।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম জানান, সীমান্তে যেকোনো ধরনের পুশ ইন, অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
কালের কণ্ঠের সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা প্রতিবেদনটিতে অবদান রেখেছেন।