kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

সংকটে ধুঁকছে পর্বতাভিযান

প্রথম বাংলাদেশি নারী নিশাত মজুমদারের এভারেস্ট জয়ের ৯ বছর

তৈমুর ফারুক তুষার   

১৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সংকটে ধুঁকছে পর্বতাভিযান

‘বেশ কয়েকজন ছেলে-মেয়ে এভারেস্ট অভিযানের জন্য প্রস্তুত। তাঁরা এই অভিযানের জন্য কয়েক বছর ধরে তৈরি করেছেন নিজেদের। কিন্তু স্পন্সরের অভাবে থমকে আছে তাঁদের পর্বতাভিযান। রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন পর্বতারোহণকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছে না, তেমনি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতাও খুব বেশি মিলছে না। ফলে মেধা ও সম্ভাবনা থাকার পরও তরুণ পর্বতারোহীরা হচ্ছেন বঞ্চিত।’ এভাবেই বলছিলেন খ্যাতিমান পর্বতারোহী নিশাত মজুমদার। বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টের চূড়ায় দেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন।

২০১২ সালের ১৯ মে নিশাত মজুমদার এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন। আজ সেই কীর্তি গড়ার ৯ বছর পূর্ণ হলো। সে উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে কথা হয় নিশাত মজুমদারের। পর্বতারোহণে তাঁর অভিজ্ঞতা, এ দেশে ক্রীড়া হিসেবে পর্বতারোহণের প্রতিবন্ধকতা, সম্ভাবনা, নবীন পর্বতারোহীদের জন্য পরামর্শসহ নানা বিষয় উঠে আসে আলাপচারিতায়।

২০১২ সালে তিন বাংলাদেশি পর্বতারোহী এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছে এ দেশের মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। এই তিনজনের মধ্যে দুজনই ছিলেন নারী। সেই সময় রোমাঞ্চপ্রিয় তরুণদের মধ্যে ক্রীড়া হিসেবে পর্বতারোহণ বেশ জনপ্রিয়তা পায়। দুর্গম পর্বতগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের নেশা পেয়ে বসে অনেককে। তৈরি হয় নতুন একটি ক্রীড়ার সম্ভাবনার ক্ষেত্র। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকা, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্পন্সরে অনাগ্রহের ফলে সম্ভাবনার এই ক্ষেত্র যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। দেশের পর্বতারোহীদের কাছে হিমালয়ের দুর্গম অভিযানের চেয়েও যেন কঠিন হয়ে উঠছে স্পন্সর সংগ্রহ। টাকার অভাবে গেল ৯ বছরে বাংলাদেশের একটি গ্রুপও এভারেস্ট অভিযানে যেতে পারেনি। ৯ বছরে মাত্র দুজন বাংলাদেশি পর্বতারোহী যেতে পেরেছেন এভারেস্ট অভিযানে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছে নামার পথে মারা যান পর্বতারোহী সজল খালেদ।

পর্বতারোহীদের পৃষ্ঠপোষকতার সংকট প্রসঙ্গে নিশাত মজুমদার বলেন, ‘আমাদের দেশে পর্বতারোহণকে এখনো সেভাবে স্পোর্টস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এটাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে নিতে হবে। রাষ্ট্রকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরো বেশি এগিয়ে আসতে হবে। নতুন একটি স্পোর্টস কোনো দিনও এসব পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া দাঁড়াতে পারবে না।’

তিনি বলেন, ‘পর্বতারোহণ বেশ ব্যয়বহুল একটি স্পোর্টস। ফলে ব্যক্তিগতভাবে এর ব্যয় বহন করা কষ্টসাধ্য। আর স্পোর্টসে তো মানুষ নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করার কথা নয়। আমাদের খুব কাছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও কিন্তু পর্বতারোহণে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাজেট রাখা হয়। প্রতিবছর অনেকে অভিযানে যান। কিন্তু আমাদের এখানে তা নেই। আমাদের এখানে করপোরেট স্পন্সর জোগাড় করাও কঠিন। প্রক্রিয়াটাও সম্মানজনক নয়। আমি নিজে একটি প্রতিষ্ঠানে স্পন্সর চাইতে গিয়ে শুনতে হয়েছে, আপনাকে টাকা দিয়ে লাভ কী। মোটকথা পর্বতারোহণ নিয়ে রাষ্ট্রের ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে।’

পর্বতারোহণের গুরুত্ব প্রসঙ্গে নিশাত মজুমদার বলেন, ‘যত বেশি তরুণ পর্বতারোহণে যুক্ত হবে, দেশের জন্য তা কল্যাণকরই হবে। স্পোর্টসে যুক্ত ছেলে-মেয়েরা কিন্তু মাদকে আসক্ত হয় না। তরুণদের মধ্যে কিন্তু রোমাঞ্চকর নানা অনুভূতি কাজ করে। তারা স্পোর্টসে যুক্ত হয়ে নানা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পেয়ে যায়। ফলে তাদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা কমে।’

নিজের পর্বতারোহণে যুক্ত হওয়া ও এভারেস্ট অভিযান প্রসঙ্গে নিশাত বলেন, ‘আমার অ্যাডভেঞ্চার ভালো লাগে। ২০০৩ সালে পর্বতারোহণের সঙ্গে যুক্ত হই। বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্র্যাকিং ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এভারেস্ট অভিযানের আগে দীর্ঘ ১০ বছর প্রস্তুতি নিই। এর মধ্যে ট্রেনিং, ছয় হাজার, সাত হাজার মিটার পর্বত অভিযান সম্পন্ন করি।’

এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানোর অনুভূতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এভারেস্ট নিয়ে আমার সবচেয়ে ভালো লাগার অনুভূতি হলো দেশে ফেরার পর। যখন দেখলাম এ দেশের অনেক নারীর মধ্যে নতুন এক ধরনের চিন্তার সাহস তৈরি হচ্ছে, তারা ভাবতে পারছে নারীরাও দুর্গম পর্বতে চড়তে পারে। তাদের চিন্তার এই পরিবর্তনটা আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছে।’

নিশাত মজুমদার জানান, বর্তমানে তিনি ওয়াসার প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে কর্মরত। অভিযাত্রী নামের একটি সংগঠন করছেন। এই সংগঠন থেকে ছেলে-মেয়েদের ক্রীড়াজগতের দিকে আগ্রহী হতে উদ্বুদ্ধ করছেন। পর্বতারোহণ, ট্র্যাকিং, সাইক্লিং, সাঁতারসহ নানা অ্যাডভেঞ্চারে ছেলে-মেয়েদের উৎসাহিত করছেন।

সংসার, চাকরি, পর্বতারোহণ—এসবের সমন্বয় করেন কিভাবে জানতে চাইলে নিশাত মজুমদার বলেন, ‘আসলে আমি কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী, সংসারে পরিবারের সদস্যদের খুবই সহযোগিতা পাই। এ জন্যই সব কিছু চালিয়ে যেতে পারছি।’