kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন

সহিংসতার নেপথ্যে আ. লীগের কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তার

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সহিংসতার নেপথ্যে আ. লীগের কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তার

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৯৪ সালে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ মহানগরে ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ২১ বছরে অনুষ্ঠিত পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে প্রথম তিনটি ও সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মেয়র নির্বাচিত হন। শুধু ২০১০ সালের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন। প্রতিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এসব নির্বাচনের আগে-পরে কোনো সহিংসতা দেখেনি নগরবাসী। নির্বাচনকে ঘিরে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, কাদা ছোড়াছুড়ি চললেও রক্তারক্তির পরিস্থিতি ছিল না।

আগামী ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে চসিকের ষষ্ঠ নির্বাচন। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই দফায় (গত বছরের ২৯ মার্চ নির্বাচনের আট দিন আগে ২১ মার্চ করোনাজনিত কারণে স্থগিত হয়) গণসংযোগ-প্রচারণা চলাকালে নির্বাচনী সহিংসতায় ক্ষমতাসীন দলের তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। বেশির ভাগ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও দলের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে। এসব সংঘাতে অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। হঠাৎই দলের মধ্যে সহিংসতা বাড়ায় কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম নগরের নেতারাও বিব্রত।

নির্বাচনী সহিংসতা বাড়ার নেপথ্যে কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, কাউন্সিলর পদে যাঁরা দলের সমর্থন পেয়েছেন তাঁরা জয় পেতে যেমন মরিয়া হয়ে উঠেছেন, তেমনি দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও চাইছেন যেকোনো মূল্যে জয়ী হতে। তাঁদের অনেকেই ভোটারদের রায়ের ওপর নির্ভর করতে চাইছেন না। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টার জেরেই সহিংস হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূলে নিজেদের মধ্যের দ্বন্দ্বও এখন অনেকে নির্বাচনী মাঠে টেনে আনছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, দল টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় দল ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের অনেকে আখের গুছিয়েছেন। এ সময় সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে যত না বিরোধ-দ্বন্দ্ব রয়েছে, তার চেয়ে বেশির ভাগ নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছেন। এসব বিরোধে এখন যার যার ইচ্ছামতো কাউন্সিলর নির্বাচন নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। নিজ নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্যই অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। গতবারের ১৪ জন কাউন্সিলর এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন না পাওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ ওয়ার্ডে প্রায় প্রতিদিনই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। এর বাইরে নগরে আরো অনেক সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডেও নিজেদের মধ্যে নির্বাচনী সংঘাতের কারণে ভোটে নেতিবাচক প্রভাব পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।     

এক আওয়ামী লীগ নেতার মতে, দিনে দিন যেভাবে নির্বাচনী মাঠ রক্তাক্ত হচ্ছে তাতে অনেক কাউন্সিলর প্রার্থীও শঙ্কিত। দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার চট্টগ্রামে এসে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিজেদের প্রচার থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন গত কয়েক দিন ধরে নির্বাচনী প্রচারণা ও সাংগঠনিক সভাগুলোতে বিদ্রোহী ও তাঁদের অনুসারীদের নানাভাবে নির্দেশ দিলেও তাতেও কাজ হচ্ছে না। তাঁদের পাশাপাশি দল সমর্থিত বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরও বেপরোয়া হয়ে বিভিন্ন ঘটনা ঘটাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন থেকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে সামনে ঘটনা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নোমান আল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এগুলো নির্বাচনী সহিংসতা নয়, রাজনৈতিক কারণেও ার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নগরের ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল হাসনাত মো. বেলালের অনুসারীদের সঙ্গে মনোনয়নবঞ্চিত ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুমের অনুসারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নেপথ্যে ওই দুই নেতার প্রায় পাঁচ বছরের বিরোধ। গত সিটি নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন কারণে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে বেলাল দলের সমর্থন পেলে বিরোধ আরো চাঙা হয়ে ওঠে। এলাকার আধিপত্য নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে কয়েক দিন না যেতেই লালখান বাজার এলাকায় বিবদমান এ দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ লেগেই রয়েছে। দলের মনোনীত মেয়র প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরী প্রচারণায় আসার আগমুহূর্তে বিবদমান এ দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে।

জানতে চাইলে দিদারুল আলম মাসুম বলেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে বেলাল যদি নিজের ভোটের কথা চিন্তা করত তাহলে প্রতিপক্ষের (বিএনপি) প্রার্থী নিয়ে ভাবত। আমি ওয়ার্ডে নৌকা প্রতীকে আমাদের দলের মেয়র প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব। আমি তো নিজের প্রার্থিতা (কাউন্সিলর পদে) প্রত্যাহার করেছি। কিন্তু তার পরও আমার অনুসারীদের ওপর হামলার অর্থ হচ্ছে বেলাল নতুন করে এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য এ ঘটনা ঘটিয়েছে।’

এ ব্যাপারে আবুল হাসনাত মো. বেলাল বলেন, ‘২০১৫ সালের নির্বাচনের পর থেকে উনার সঙ্গে আমার দূরত্ব থাকলেও ২০১৭ সালের অক্টোবরে ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত হত্যার ঘটনার পর থেকে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। আমি সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যার বিচার চেয়ে আন্দোলন করেছি। উনি (মাসুম) সব সময় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছেন এলাকায়। আমাকে দল থেকে সমর্থন দেওয়ায় তিনি সহ্য করতে পারছেন না। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য আমাদের ওপর হামলা করেছে।’

এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে নগরের ২৮ নম্বর পাঠানটুলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নজরুল ইসলাম বাহাদুর ও বিদ্রোহী সাবেক কাউন্সিলর আবদুল কাদেরের সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর অনুসারী আজগর আলী বাবুল নিহত হয়েছেন। নির্বাচনী এ সহিংসতায় আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নিহতের পরিবার থেকে দায়ের করা মামলায় কাদেরসহ ১১ জন এখন কারাগারে।

জানা যায়, বাহাদুর ওই ওয়ার্ডে সাবেক তিনবারের কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। অভিযোগ উঠেছে, গত নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করে আবদুল কাদের বিজয়ী হয়েছেন! পাঁচ বছর ধরে কাদেরের একক আধিপত্যে ওই ওয়ার্ডে কয়েক লাখ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ে। বাহাদুর দলের সমর্থন পেলেও নির্বাচনী মাঠ থেকে সরেননি কাদের। এলাকায় প্রচারণায় দলীয় প্রার্থীর জনপ্রিয়তা দেখে কাদেরের নেতৃত্বে তাঁর অনুসারীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুর বলেন, ‘গত পাঁচ বছর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল কাদের। তার সঙ্গে সাংগঠনিক কোনো বিরোধ নেই আমার। কিন্তু এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখার জন্য ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি আমার নির্বাচনী প্রচারণায় এ হামলা চালিয়েছে। এখন কারাগারে থাকলেও সেখান থেকে তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে নানাভাবে ভোটার ও আমার কর্মী-সমর্থকদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে।’

গত ৮ জানুয়ারি প্রচারণা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নগরের বাকলিয়া থানার দেওয়ানবাজার ভরা পুকুর পার এলাকায় হামলা-ছুরিকাঘাতে আশিকুর রহমান রোহিত (২০) নামে এক ছাত্রলীগকর্মী গুরুতর আহত হন। গত শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। এলাকায় মাদকবিরোধী লিফলেট লাগানোকে কেন্দ্র এ ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। তবে এ দিন মেয়র প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে ফেরার পর এ ঘটনা ঘটিয়েছে দলের প্রতিপক্ষ।

এর আগে গত বছরের ১৮ মার্চ নগরের হালিশহর থানাধীন ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মো. ইসমাইলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত একদল সন্ত্রাসী বিদ্রোহী প্রার্থী সদ্যবিদায়ি কাউন্সিলর মোরশেদ আকতার চৌধুরীর অনুসারী আনোয়ার জাহির তানভীরকে (৪০) ছুরিকাঘাতে খুন করে বলে অভিযোগ রয়েছে। মোরশেদের বাড়ির সামনে নির্বাচনী কার্যালয়ে তানভীর নিহত হলেও এ হত্যাকাণ্ডে এজাহারভুক্ত একাধিক আসামি (জামিনপ্রাপ্ত) এখন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থনে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

গত ৮ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরুর পর থেকে নগরের অনেক ওয়ার্ডে দল সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ি, সংঘর্ষ লেগেই আছে। আসন্ন এ নির্বাচনে সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড মিলে এখনো ৪৭টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে দলের ৮৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থী। সমর্থিত ও বিদ্রোহীদের অনেকে বেপরোয়া হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান কারণ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার বলে মনে করছেন দলীয় নেতারা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা