মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, রবিবারই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি হবে। পাকিস্তান, কাতার, মিসর ও তুর্কি কূটনীতিকরা ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে চুক্তি সম্পাদনে বেশ তৎপরতা দেখালেও ইরানের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বরং ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, চুক্তি শিগগিরই হচ্ছে না। ইরান অবশ্য শনিবারই জানিয়ে দিয়েছিল, রবিবার চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হচ্ছে না। অন্যদিকে সমঝোতা তৎপরতার মাঝেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের শীর্ষ আলোচক ও স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পূরণের সদিচ্ছা অথবা সক্ষমতার অভাব রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থাকে সবুজ সংকেত দিয়ে কোনো ছাড় আদায় করা যাবে না। ভালো পুলিশ ও খারাপ পুলিশের খেলা এখন সেকেলে হয়ে গেছে। নিজের প্রতিশ্রুতি পূরণের সদিচ্ছা ও সামর্থ্য না থাকলে, সেই পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা ঠিক নয়।’ উল্লেখ্য, দক্ষিণ বৈরুতের একটি ভবনে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত তিনজন নিহত ও ১৫ জন আহত হওয়ার পর গালিবাফ এক্সে এই মন্তব্য করেন।
এদিকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে ইরানের সুপ্রিম কমান্ডের সদস্যরা ভার্চুয়াল বৈঠকও এড়িয়ে চলছেন। তাই তাঁদের সম্মতি আদায় করে নেওয়াটাও মূলত সময়ের ব্যাপার। বিশেষত দেশটির কট্টরপন্থীরা হরমুজ প্রণালিতে ইরানি কর্তৃত্বে ছাড় দিতে নারাজ। অস্ট্রিয়া সরকারের সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে পুশতাই বলেন, “জব্দকৃত সম্পদ ইরানের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইরানের এটি প্রয়োজন, এটি অর্থনীতির জন্য অক্সিজেনের মতো। হরমুজ এমন একটি হাতিয়ার, যা ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্র, এই অঞ্চলের অন্যান্য রাষ্ট্র এবং অবশ্যই পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ব্যবহার করতে পারে। তারা এটা ছাড়তে চায় না। এমনকি যদি তারা এখনই বলে, ‘হ্যাঁ, আমরা চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে কোনো অর্থ না নিয়েই প্রণালিটি সবার জন্য খুলে দেব,’ তার মানে এই নয় যে তারা ভবিষ্যতেও এই কথা রাখবে।” তিনি আরো বলেন, ‘এই সংঘাতে আমরা আমেরিকান, ইরানি এবং ইসরায়েলি—তিনটি পক্ষেই দেখেছি, কেউ কিছু বললেই তার মানে এই নয় যে আগামীকালও ঠিক সেভাবেই ঘটবে। তবে এই মুহূর্তে ইরানের রাজধানীতে এমন ধারণা প্রচলিত আছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিটি প্রায় চূড়ান্ত, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি দেননি। শুধু ধারণা দিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে এটি দূর থেকেই সম্পন্ন হতে পারে। এদিকে এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো কাতারের একটি প্রতিনিধিদল ইরান সফর করার ঘটনাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানের রাজধানীতে উভয় পক্ষের মধ্যে বার্তা বিনিময় এবং কূটনৈতিক পথ এখনো পুরোদমে সক্রিয় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উভয় পক্ষই সমঝোতা স্মারকে যা আছে তার সঙ্গে তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যগুলো গুলিয়ে ফেলছে। কারণ উভয় পক্ষই বিষয়টি জনসাধারণের কাছে এবং সম্ভবত আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করছে। অথচ সমঝোতা স্মারকটি কেবল প্রথম ধাপ এবং এটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।
চুক্তির কিছু অমীমাংসিত বিষয় : কয়েক দশক ধরে চলা বৈরিতার পরও তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিবাদের প্রধান বিষয় হয়ে রয়েছে। দ্য ওয়াশিংটন টাইমসের প্রতিবেদক টিম কনস্ট্যান্টাইন বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন প্রতিরোধকারী যেকোনো চুক্তিকেই ট্রাম্প বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। আর যদি তিনি দেখাতে পারেন যে এটি একটি চূড়ান্ত বা পরিমাপযোগ্য এবং বলবেযাগ্য বিষয়, তাহলে তিনি বিজয় দাবি করতে পারেন। এবং আমি মনে করি মার্কিন জনগণ তা মেনে নিতে ইচ্ছুক হবে।
উল্লেখ্য, ইরান নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার অবসানের ওপর জোর দিয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র পর্যায়ক্রমে ও শর্তসাপেক্ষে তা তুলে নেওয়ার বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে, কিন্তু এটি কিভাবে করা হবে তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিদেশে জব্দ করা শত শত কোটি ডলারের ইরানি তহবিলের ভাগ্য আরেকটি বড় অমীমাংসিত বিষয়। এ ছাড়া লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকায় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ ও দখলদারি মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনার একটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা এবং তেহরান একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত মার্কিন মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি দক্ষিণ লেবাননে বোমা হামলা বা স্থল অভিযান এক দিনের জন্যও থামাতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান : ইরানের সঙ্গে একটি আসন্ন চুক্তির প্রত্যাশা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের কাছ থেকে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে কিছু আইন প্রণেতা তেহরানের সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন এবং বলেছেন, দেশটিকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র রাখার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। রিপাবলিকান সিনেটর রন জনসন বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘অস্তিত্বের সংকট’ সৃষ্টি করবে। ডেমোক্রেটিক আইন প্রণেতারাও ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের প্রত্যাশিত শান্তিচুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর অ্যাডাম শিফ এক্সে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বলছেন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। আমি আশা করি তিনি ঠিকই বলছেন। কিন্তু আমরা এই কথা আগেও শুনেছি। সেই সঙ্গে একগাদা ভঙ্গ হওয়া প্রতিশ্রুতিও। তিনি নতুন যুদ্ধ শুরু করেছেন, কিন্তু খরচ কমাননি। আর তা আমেরিকান জনগণের গভীর ক্ষতি করেছে।’ এদিকে ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসম্যান সেথ মল্টন সম্ভাব্য চুক্তিটিকে ‘মূলত একটি আত্মসমর্পণ দলিল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা, আনাদোলু


