kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

বিশেষজ্ঞ মত

কেমন হলো সরকারের রপ্তানি সহায়তা প্যাকেজ?

মামুন রশীদ

৪ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কেমন হলো সরকারের রপ্তানি সহায়তা প্যাকেজ?

বিদেশের অর্থনীতি বিষয়ে পাঠদানরত আমার এক বন্ধুর সেদিনকার এক লেখায় দেখলাম ভীষণ ধুয়েছেন তিনি তোপখানায় কার্যরত আমাদের ভাই-বন্ধুদের। তাঁদের কারণেই নাকি মতিঝিলে কর্মরত আমাদের অন্য ভাই-বন্ধুরা তাঁদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে পারছেন না। লেখার একটু ভেতরে গিয়ে বুঝতে পারলাম, তোপখানা বোঝাতে তিনি বুঝিয়েছেন আমাদের আমলাতন্ত্রের হেডকোয়ার্টার বা পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যালয়, আর মতিঝিল বলতে তিনি বুঝিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তরকে। তাঁর যুক্তির স্বপক্ষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডের প্রধান এবং ভারতের আরবিআইয়ের সাবেক গভর্নরের স্বাধীনচেতা মনোভাবের কথা বলেছেন। লেখাটি সম্ভবত ছিল করোনার মতো আপৎকালীন তারল্য সহায়তায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের সীমাবদ্ধতার পর্যালোচনা। সরকারি আমলা আর পেশাজীবীদের দ্বন্দ্ব বা রেশারেশি আমাদের মতো দেশগুলোয় নতুন কিছু নয়। তবে আমার বন্ধু বোধ হয় আমাদের নামকরা  অধ্যাপকদের শেখানো ‘বিশেষ সময় বিশেষ ব্যবস্থার দাবি রাখে’ বাণীটি ভুলে গিয়েছিলেন। ভুলে গিয়েছিলেন ভারতের ‘আধার’ নিয়ে মুম্বাই হাইকোর্টের একটি রায়—‘সরকারের সুবিধা ভোগ করতে হলে সরকারের মতো করে কিছু শর্তও মানতে হয়।’ কারণ মাননীয় হাইকোর্ট মনে করেছেন সরকার মানেই সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ।

আমি অবশ্য অপেক্ষা করছিলাম সরকারে (আমলাতন্ত্রে নয়) পোশাক ব্যবসায়ীদের আধিক্য ও আধিপত্য বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত কেমন জানি হয় আপৎকালীন সরকারের রপ্তানি সহায়তা? এই সুযোগে সরকার আবার রবীন্দ্রনাথের (দুই বিঘা জমি) ‘সেই বেশি চায় আছে যার ভূরিভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি’র মতো কিছুসংখ্যক লোকের জন্য ‘সব কটা জানালা খুলে দাওনা’র মতো করবেন না তো?

না, তা হয়নি। আমার বন্ধুটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বিপন্নে যতই আমলাতন্ত্রকে দায়ী করুন না কেন, এ ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সঙ্গে নিয়ে বেশ ভালো কাজ করেছে। পাঁচ হাজার কোটি টাকা যাবে সরকারের বাজেট বরাদ্দ থেকে, ঋণ হিসেবে। তারল্য ও মুনাফা সংকটে পীড়িত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। ব্যাংকগুলো এ কাজটি করার জন্য ২ শতাংশ কমিশন পাবে। বিনিময়ে তাদের রপ্তানি খাতের শিল্পগুলোর (যাদের ৮০ শতাংশ উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি হয়) শ্রমিকদের আগের তিন মাসের বেতন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় পরবর্তী তিন মাসের বেতন দেওয়া হবে। সেই টাকা আবার দেওয়া হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকে শ্রমিকদের নিজস্ব অ্যাকাউন্ট বা বিকাশ কিংবা রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে। ব্যাংকগুলোকে সেই টাকা দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনর্ভরণ করবে। সুবিধা বা ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেই টাকা ছয় মাস অন্তে ১৮ মাসের কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। এসংক্রান্ত নির্দেশনামা এটাও বলেছে, শুধু রপ্তানি খাতের চলমান কারখানাই এই সুবিধা পাবে।

আমার কাছে এই নির্দেশনামা বেশ ভালোই মনে হয়েছে। মনে হয়েছে বেশ উর্বর চিন্তাপ্রসূত। অনেকটা উন্নত দেশের আপৎকালীন প্রাধিকার খাতে তারল্য-সহায়তার মতো।

আমরা অবশ্যই কান পেতে আছি, অভ্যন্তরীণ খাতসহ বিভিন্ন শিল্প, ব্যবসা ও সেবা খাতে সরকারের ‘মৃতসঞ্জীবনী’ সুধার মতো অন্যান্য সহায়তা বা প্রণোদনা প্যাকেজের অপেক্ষায়। যদিও বিজিএমইএ সভাপতি আগামী রবিবারও তাঁর সম্মানিত সহকর্মীদের আরো অনেক সুখবর দিতে পারবেন বলে অনেকে আশাবাদী। আমার মনে হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সরকারের অন্যদের সঙ্গে মনোযোগ দেবেন—অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারে। অবশ্যই দুই কোটি দিনমজুর, সাময়িক বেকার বা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কথা তিনি বা তাঁর সহকর্মীরা ভুলবেন না। তবে বৃহৎ আকারের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ সৃষ্টি করাই হবে তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু হবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত। তার পাশে অতি দরিদ্র ও বঞ্চিতদের জন্য বাড়াতে হবে সরকারের সামাজিক রক্ষা বন্ধনী। এ ক্ষেত্রে কার্যরত এনজিওগুলোকেও কিছু ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেওয়া যায়। ন্যূনতম ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা অন্যরা ভুললেও কর্তাব্যক্তিরা আর ভুলবেন না নিশ্চয়ই। অন্যান্য ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হয়ে মূল মূল জায়গায় টাকার সংস্থান করতে হবে। সময়ে ধারণ করতে হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুদ্রমূর্তি। মাঝপথে রণেভঙ্গ দেওয়ার এবার আর সুযোগ নেই। তাহলে অর্থনীতি হবে বিপর্যস্ত আর আমাদের নিক্ষিপ্ত হতে হবে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা