kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

নববর্ষের অনুষ্ঠানও বাতিল

হাজার কোটি টাকার ক্ষতি

প্রণোদনার দাবি

আরিফুর রহমান   

১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হাজার কোটি টাকার ক্ষতি

করোনাভাইরাসের প্রভাবে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব নববর্ষ এ বছর যে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যাপন করা সম্ভব হবে না, তা মার্চের শুরুতেই আঁচ করা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নববর্ষের সব অনুষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। দুর্যোগকালীন এই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পহেলা বৈশাখকে ঘিরে প্রতিবছর অর্থনীতিতে যে প্রাণচাঞ্চল্য চলে তা এক ভয়াল মহামারি থামিয়ে দিল। লাখ লাখ ছোট পুঁজির উদ্যোক্তা পণ্যের পসরা নিয়ে রাস্তায় বসার যে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন তাঁরা।

ছোট পুঁজির উদ্যোক্তারা তাঁদের পণ্য তৈরির কাজও সেরে ফেলেছিলেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উৎপাদিত পণ্যের কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তাঁরা। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পহেলা বৈশাখে দেশে কত টাকার বাণিজ্য হয়, এর সঠিক পরিসংখ্যান কিংবা গবেষণা নেই। তবে সব কিছু হিসাব করে ক্ষতির একটি ধারণা পাওয়া গেছে। তাতে দেখা গেছে, এ বছর নববর্ষে অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো। কেউ ব্যাংকঋণের কিস্তি দিতে পারবেন না, কেউ শ্রমিকের মজুরি দিতে পারবেন না। কেউ আবার গ্যাস-বিদ্যুতের বিল দিতে পারবেন না। ফলে কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে প্রকট। বিশাল এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পোশাক শ্রমিকদের মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের শ্রমিকদের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার দাবি তুলেছেন অর্থনীতিবিদ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতিনিধিরা।

অবশ্য পোশাকশিল্পের মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্যও প্রণোদনা দেওয়ার আলোচনা চলছে সরকারের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঁচজন সচিব বৈঠকে বসেছিলেন এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে। ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি তৌফিক এহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নববর্ষ উদ্যাপন করতে প্রতিবছর আমরা প্রচুর কার্ড ছাপাই। এই কার্ড ছাপার সঙ্গে অনেক শ্রমিক জড়িত। এ বছর কার্ড ছাপানো হয়নি। ফলে শ্রমিকরা অলস সময় পার করছেন। বেকার হয়ে পড়েছেন। বৈশাখের এই সময়ে প্রচুর ইলিশের বাণিজ্য হয়। সেটিও বন্ধ হয়ে গেল। ঢাকা মহানগরীতে আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ৩৭টি বাজার আছে। করোনাভাইরাসের কারণে নববর্ষের উদ্যাপন বাতিল হওয়ায় আমাদের আড়াই লাখ শ্রমিক জীবন-জীবিকার হুমকিতে পড়লেন।’ এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যাংকের সুদ মওকুফের দাবি জানান তিনি। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের গ্যাস-বিদ্যুতের বিল মওকুফের দাবি জানান।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে প্রথমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান সীমিত করেছিল সরকার। পরবর্তী সময়ে ২৬শে মার্চের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। সবশেষ গতকাল বাঙালির সর্বজনীন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হলো।

নববর্ষের দিনকে সামনে রেখে এপ্রিলের প্রথম দিন থেকে বিশাল চাহিদা তৈরি হয় পান্তা-ইলিশের। অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করা ইলিশ-পান্তার সঙ্গে যেসব ছোট উদ্যোক্তা সম্পৃক্ত, তাঁরা পড়েছেন বিপাকে। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বছরজুড়েই প্রস্তুতি নেন বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের উদ্যোক্তারা। স্বল্প আয় ও শ্রমজীবীদের কথা মাথায় রেখে অনেক ছোট পুঁজির উদ্যোক্তা কম দামে পহেলা বৈশাখের পোশাক তৈরি করেন ফুটপাতে বিক্রির জন্য। দেশের আনাচকানাচে নববর্ষের পোশাক বিক্রি হয় প্রচুর। এ বছর বড় ধরনের ধাক্কা খেলেন ফ্যাশন হাউসের উদ্যোক্তারা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর পহেলা বৈশাখ ও ঈদুল ফিতরের উৎসব না থাকলে ফ্যাশন হাউসগুলোর ক্ষতি হবে চার হাজার কোটি টাকার মতো।

পহেলা বৈশাখকে ঘিরে প্রতিবছর গ্রামগঞ্জে, এমনকি শহরেও চুড়ি, মালা, দুল, মাটির তৈরি পণ্য, ঢুগঢুগিসহ কুটিরশিল্পের অনেক পণ্য তৈরি করেন ছোট পুঁজির উদ্যোক্তারা। এবারও তৈরি করা হয়েছে এসব পণ্য। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে তাঁদের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। পহেলা বৈশাখে হালখাতাকে ঘিরে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর মিষ্টি, মুড়ি, সন্দেশ, দই বিক্রি হয়। নববর্ষের দিনে পাড়ায়-মহল্লায় বিভিন্ন বাসাবাড়িতে আত্মীয়-স্বজন মিষ্টি, দই নিয়ে যান। এই দিনকে ঘিরে মিষ্টি দইয়ের একটি বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। এ বছর এসব খাতেও বেচাকেনা বন্ধ।

নববর্ষকে ঘিরে অর্থনীতির বড় একটি অনুষঙ্গ যোগ হয় বুটিকশিল্প। এ বছর এই খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ল। সেটিও হুমকিতে। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে অন্তত ৬০ থেকে ১০০ কোটি টাকার ফুল বাণিজ্য হয়। এ বছর ফুল বাণিজ্যেও ধস নেমেছে। বাঙালির সর্বজনীন উৎসবে মানুষ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরতে যায়। পার্ক, উদ্যানে ঘুরতে যায়। কভিড-১৯-এর প্রভাবে পর্যটন খাতেও ধস নেমেছে। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে অর্থনীতির এসব ছোট ছোট খাতের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত এখন তাদের মাথায় হাত।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর পহেলা বৈশাখকে ঘিরে বাংলা একাডেমিতে ১০ দিনের মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ওই মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেড় শতাধিক উদ্যোক্তা স্টল দিয়ে বসেন। ওই ১০ দিনে একজন উদ্যোক্তা এক থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা করেন। কিন্তু এবার ওই মেলা বাতিল হয়ে যাওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন স্টল দেওয়ার সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। জানতে চাইলে বিসিকের চেয়ারম্যান মোস্তাক হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে মেলাটি হচ্ছে না। সারা দেশে আমাদের ৭৬টি শিল্পনগরী আছে। সেসব জায়গায়ও মেলা হচ্ছে না। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বুটিক থেকে শুরু করে জামদানি শাড়ি, ফার্নিচার, জুতা বিক্রি করেন। গ্রামগঞ্জে যেসব তাঁত মেলা হওয়ার কথা, সেগুলোও হবে না।’

গতকাল ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী নববর্ষের সব অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘নববর্ষের অনুষ্ঠান আমরাই শুরু করেছিলাম। কিন্তু তাও আমাদের বন্ধ রাখতে হচ্ছে। মানুষের কল্যাণেই এ অনুষ্ঠান না করার অনুরোধ আপনাদের।’ বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে যাঁরা সম্পৃক্ত তাঁরা। শুধু পোশাক খাতের জন্য তহবিল ঘোষণা না করে সব খাতের জন্য একটি সমন্বিত প্রণোদনা তহবিল গঠন করা জরুরি। এই মুহূর্তে ছোট উদ্যোক্তারা বেশি লোকসানে পড়বেন। কর্মচারী ছাঁটাই হবে। তাই ওই তহবিল থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলেন তিনি। এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকে বসছি। তাঁরা ব্যাংকঋণের সুদের হার আপাতত বন্ধ রাখা, দোকান ভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল মওকুফের কথা বলেছেন। আমরা এসব বিষয় নিয়ে বৈঠক করছি। শিগগিরই একটা সিদ্ধান্ত আসবে।’ জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতির সভাপতি নুরুল কবির শোভন কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য প্রণোদনা দিয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়নি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ এই শিল্পের সঙ্গে ২১ থেকে ২৫ লাখ মানুষের রুটিরুজি জড়িত। তিনি প্রত্যেক জেলাওয়ারি প্রণোদনা দেওয়ার দাবি করেন। এ ছাড়া ব্যাংক সুদ বন্ধ রাখা, এক বছরের জন্য ভ্যাট ও ট্যাক্স বন্ধ রাখার দাবি করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা