kalerkantho

সোমবার  । ১৬ চৈত্র ১৪২৬। ৩০ মার্চ ২০২০। ৪ শাবান ১৪৪১

মহাস্থানগড়ের ভেতরেই প্রাচীন ইটের বাড়ি!

প্রত্নসম্পদের ইট কেনাবেচা প্রকাশ্যেই আদালতের নির্দেশনা মানছে না কেউ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অসহায়

লিমন বাসার, বগুড়া   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মহাস্থানগড়ের ভেতরেই প্রাচীন ইটের বাড়ি!

মহাস্থানগড়ের প্রাচীন কীর্তির সেই সব ইট দিয়ে বানানো হচ্ছে বাড়িঘর। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও তা মানছে না কেউ। ছবি : কালের কণ্ঠ

বগুড়ার মহাস্থানগড়ের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা আড়াই হাজার বছরের পুরনো প্রত্নসম্পদ থেকে প্রকাশ্যে ইট খুলে নিয়ে যাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সেই ইট আবার প্রকাশ্যেই বিক্রি হয়। দাম প্রতি ভ্যান ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। আকারে বড়, কারুকাজ করা এসব ইট দিয়েই মহাস্থানগড়ের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে ঘরবাড়ি। এরই মধ্যে মহাস্থান এলাকায় দুর্লভ প্রত্ন ইট দিয়ে তৈরি হয়েছে শতাধিক বাড়ি। এ ছাড়া নতুন ইট দিয়ে তৈরি করা বাড়ির সংখ্যাও ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে। কয়েক বছর ধরে চলা এই অবৈধ কর্মকাণ্ড জানার পরও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন। অথচ ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে ওই দুর্গনগরীতে অবকাঠামো তৈরির বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইর্টস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ ২০১০ সালে রিট করলে সংরক্ষিত এলাকায় অবৈধ সব নির্মাণকাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। 

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে এ নগরীতে নির্মাণ করা হয়েছে ঘরবাড়িসহ কমপক্ষে ৯৮৭টি নানা ধরনের অবকাঠামো। এর মধ্যে ৭৬টি বাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে পাল ও সেন আমলের তৈরি ইটসহ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

এই অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের জরিপ অনুসারে ৩৯৪ একরের এ দুর্গনগরীতে পাকা, সেমিপাকা ও মাটির

বাড়িসহ পাঁচ ধরনের ঘরবাড়ির মধ্যে দ্বিতল ভবন রয়েছে বেশ কয়েকটি, যার সবই অবৈধ। অথচ স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশকে দফায় দফায় এসব ব্যাপারে অভিযোগ করে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।’

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক (রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ) ড. নাহিদ সুলতানা জানান, প্রাচীন এই নগরীকে রক্ষায় ভূমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা এ কাজে ব্যয় হবে।

মহাস্থানগড়ের শাহ সুলতান বলখি (রা.) মাজার শরিফের আশপাশে ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ঘরবাড়িই তৈরি করা হয়েছে প্রাচীন ঐতিহাসিক প্রত্নের ইট দিয়ে। যে যার মতো মাটি খুঁড়ে বের করেছে ঐতিহাসিক এসব নিদর্শন। এরপর তা দিয়ে তৈরি হচ্ছে বাড়ি। অনেকে এসব ইট দিয়ে বাড়ি করার পর আস্তরও (প্লাস্টার) করেনি। ইটের কারুকাজ দেয়ালে বের করে আলাদা বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে। একেকটি বাড়িতে সেই প্রাচীন আমলের হাজার হাজার ইট ব্যবহার করা হয়েছে। পুন্ড্রনগরের মূল্যবান পোড়া ইটের কোনো দামই যেন নেই তাদের কাছে।

মহাস্থান দুর্গনগরীর ভেতরে যাঁরা স্থায়ী বাড়ি বানিয়েছেন তাঁদের একজন গড় মহাস্থান দক্ষিণপাড়া গ্রামের নাসির উদ্দিন। তাঁর ছেলে শহীদুল ইসলাম বলেন, জমি হুকুম দখল করলে সরকারকে জমি দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগেই তাঁদের পূর্বপুরুষদের জমিতে ঘরবাড়ি করলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বাধা দিচ্ছেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নোটিশ পেয়েছে দুর্গনগরীর চান্দিপাড়া গ্রামের মোশারফ হোসেন। এ নোটিশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে গেছেন তিনি। তিনি বলেন, ২০১০ সালে হাইকোট দুর্গনগরী রক্ষায় যে নির্দেশনা দিয়েছে তাতে দ্রুত জমি অধিগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অধিদপ্তর জমি অধিগ্রহণ করছে না। এ কারণে বাড়ি করতে বাধ্য হয়েছি।

স্থানীয় দোকানদার নুরুল ইসলাম জানান, এলাকায় রফিকুল নামের এক যুবক পুরনো এসব ইট বিক্রি করে। প্রতি ভ্যান ইটের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। এক ভ্যানে সর্বোচ্চ ২০০ ইট বহন করা যায়। এ ছাড়া এই ইট বিক্রির সঙ্গে আরো রয়েছে সফিকুল, মিরাজুল ও আকবর।

গফুর নামের আরেকজন মুদি দোকানদার জানান, মাটি খুঁড়ে শুধু ইট নয়, সেখানে আরো পাওয়া যায় দুর্লভ মূর্তি, সোনার পাত্রের ভাঙা অংশ। এগুলো কখনো পাওয়া গেলে তার ভাগ্য ফিরে যায়। কখনোই এসব ব্যাপার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের জানানো হয় না। রাতের আঁধারে চলে এসব খোঁড়াখুঁড়ির কাজ।

এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাজারসংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দা কাসেম উদ্দিন, রনজু মিয়া, আবদুল মান্নান, কাসেম আলী, মিরালম ও সবুর মিয়ার বাড়ি প্রাচীন এই ইট দিয়ে তৈরি। তবে কোনো বাড়িতেই বাড়ির মালিককে পাওয়া যায়নি। এসব বাড়ি ভাড়া দিয়ে মালিক অন্য স্থানে থাকেন। ভাড়াটিয়ারা বাড়ির মালিক সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্যই জানেন না। মালিকের নিয়োজিত ব্যক্তি প্রতি মাসে এসে ভাড়ার টাকা নিয়ে যায়।

মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরের কাস্টুডিয়ান রাজিয়া সুলতানা বলেন, স্থানীয় জনগণকে হাইকোর্টের নির্দেশ সম্পর্কে অনেকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু তাঁরা বাড়িসহ নানা ধরনের অবকাঠামো তৈরি করছেন।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা বলেন, যারা হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে জানিয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হান্নান মিয়া বলেন, মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে। শিগগিরই হয়তো নির্দেশনা পাওয়া যাবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা