kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

কাঁকড়াশিল্পে ধস

এক মাস ধরে চীনে রপ্তানি বন্ধ
বাগেরহাটে ঘেরে মারা যাচ্ছে কাঁকড়া। এরই মধ্যে ১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী, বাগেরহাট   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কাঁকড়াশিল্পে ধস

চীনে করোনাভাইরাসের প্রভাবে কাঁকড়াশিল্পে ধস নেমেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঘেরে থাকার কারণে কাঁকড়া মারা যাচ্ছে। ডিমওয়ালা কাঁকড়া বেশি মরছে। ব্যবসায়ী ও চাষিরা বলছেন, এরই মধ্যে বাগেরহাটে বিভিন্ন ঘেরে কয়েক শ মেট্রিক টন কাঁকড়া মারা গেছে, যার মূল্য ১৫০ কোটি টাকার বেশি। এক মাস ধরে চীনে কাঁকড়া রপ্তানি বন্ধ থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। চীনে রপ্তানি করা কাঁকড়ার মূল্য বাবদ ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা আটকা পড়েছে। লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে কাঁকড়া ব্যবসায়ী, চাষি ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন এমন হাজার হাজার মানুষ হতাশায় ভুগছেন। অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে কাঁকড়া রপ্তানির জন্য নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খোঁজার দাবি উঠেছে।

বাগেরহাট সদর উপজেলার মাঝিডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ঘেরের পারে স্তূপ করে রাখা হয়েছে মরা কাঁকড়া। ঘেরে প্রায় দেড় হাত পানির মধ্যে পা ফেলতেই মরা কাঁকড়া পাওয়া যাচ্ছে। আর তাঁরা তা তুলে পারে ফেলছেন। বাতাসে মরা কাঁকড়ার দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বাজারে ক্রয়কেন্দ্রগুলোতে কাঁকড়ার সরবরাহ নেই বললেই চলে।

বাগেরহাটের কাঁকড়া ব্যবসায়ী সাধন কুমার সাহা জানান, দেশে উৎপাদিত কাঁকড়ার ৮৫ শতাংশ চীনে আর কিছুটা তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর রপ্তানি করা হয়। বাগেরহাট থেকে প্রতি মাসে গড়ে ২০০ টন কাঁকড়া (দাম ১৫-২০ কোটি টাকা) রপ্তানি হয়ে আসছিল। বাগেরহাট থেকে সর্বশেষ গত ২২ জানুয়ারি সাধন কুমারের কাঁকড়া চীনে রপ্তানি করা হয়। করোনাভাইরাসের প্রভাবে এর পর থেকে চীনে কাঁকড়া রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। সাধন কুমারের রপ্তানি করা কাঁকড়ার মূল্য বাবদ ৫০ লাখ টাকার বেশি আটকা পড়েছে। তাঁর তথ্য মতে, রপ্তানি বন্ধ থাকায় ঘের থেকে সময়মতো না ধরার কারণে কাঁকড়া মারা যাচ্ছে। ৭০ শতাংশ কাঁকড়া ঘেরে মারা গেছে। আর কয়েক দিন থাকলে বাকিটাও মারা যাবে। সব মিলিয়ে জেলায় কাঁকড়াশিল্পের সঙ্গে জড়িত ৫০ হাজার ব্যবসায়ী, জেলে ও শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কাঁকড়া রপ্তানির জন্য নতুন দেশ খুঁজতে সরকারের প্রতি দাবি জানালেন সাধন কুমার।

বাগেরহাট সদর উপজেলার মাঝিডাঙ্গা গ্রামের শেখ সেলিম ও বেল্লাল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন কাঁকড়াচাষি জানালেন, ২৫ দিন আগে থেকে ঘেরে কাঁকড়া মরা শুরু হয়েছে। চীনে কাঁকড়া রপ্তানি বন্ধ থাকায় তাঁরা ঘের থেকে কাঁকড়া ধরছেন না। প্রতিদিন হাজার হাজার কাঁকড়া ঘেরে মরছে। বাজারে এক মাস আগে এক কেজি কাঁকড়া এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন তা ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

শরণখোলা উপজেলার সোনাতলা গ্রামের চাষি পলাশ মাহমুদ জানান, আড়াই থেকে তিন মাসে কাঁকড়া পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। এর মধ্যে বিক্রি না হলে এমনিতেই মরে যায়। কারণ মা কাঁকড়ার পেট ডিমে পরিপূর্ণ থাকে। এ ছাড়া পুরুষ কাঁকড়ার খোলস পরিবর্তনের সময় এসে যায়। ডিম ছাড়া এবং খোলস পরিবর্তনের সময় সব কাঁকড়া সাগর, নদ-নদীতে চলে যায়। বদ্ধ জায়গায় থাকলে তারা মারা পড়ে। রপ্তানি বন্ধ থাকায় ঘেরের কাঁকড়া কেউ কিনছে না।

একই উপজেলার ধানসাগর এলাকার আলিম হাওলাদার জানান, তাঁর ঘেরে দুই হাজার ২০০ কেজি কাঁকড়া ছিল। কয়েক দিনে প্রায় এক হাজার কেজি মরে গেছে। গত বছর তাঁর প্রায় আট লাখ টাকা লাভ হয়। এবার আসলই থাকবে না।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. খালেদ কনক জানান, ঘেরে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত কাঁকড়া মজুদ করা, লবণাক্ততা এবং ভিন্ন ভিন্ন জলাশয়ে বড় হলেও একসঙ্গে একই জলাশয়ে থাকার কারণে কাঁকড়া মারা যাচ্ছে। এ জন্য বিভিন্ন উপজেলায় সচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে। ঘের থেকে অতিরিক্ত কাঁকড়া সরিয়ে অন্য জলাশয়ে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য মতে, জেলায় তিন হাজার ৭৪৮ জন কাঁকড়া চাষি এবং এক হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে তিন হাজার ৭৭৮টি কাঁকড়া ঘের রয়েছে। জেলায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই হাজার ৬২৯ মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ১১ হাজার ৮৭৮ মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ১১ হাজার ৪৩৫ মেট্রিক টন রপ্তানি করে ২১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা আয় হয়েছে।

লাভজনক হওয়ায় কাঁকড়া চাষে ঝুঁকেছে বাগেরহাটের মানুষ। মৎস্য বিভাগও চাষে উৎসাহিত করছে। ফলে ঘের ও চাষির সংখ্যা বাড়ছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা