kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ঘরে ঘরে স্মৃতি মুক্তিযুদ্ধের

মেহেদী হাসান, সাব্রুম (ত্রিপুরা) থেকে ফিরে   

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঘরে ঘরে স্মৃতি মুক্তিযুদ্ধের

দক্ষিণ ত্রিপুরার চোত্তাখলায় বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য। ছবি : সংগৃহীত

‘তপন, বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও। মনসুর’—১৯৭১ সালের সাদা-কালো ছবিটি কিছুটা বিবর্ণ হলেও ছবির পেছনের হাতের লেখা এখনো স্পষ্ট। আরেকটি ছবির পেছনে লেখা ঠিকানা—‘লে: মো: মনসুরুল আমিন (বাবলু), কোম্পানী কমান্ডার, ডেলটা কোম্পানী, ১৯তম বঙ্গ শার্দুল পল্টল, চট্টগ্রাম সেনানিবাস, চট্টগ্রাম’। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পাঁচ দশক পরও একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু মনসুরের স্মৃতি আগলে রাখা সাব্রুমের বাসিন্দা তপন লাল চক্রবর্তী যেন ফিরে গেলেন সেই পুরনো দিনগুলোতে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন হায়ার সেকেন্ডারি (উচ্চ মাধ্যমিক) পরীক্ষার্থী। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বাংলাদেশি শরণার্থীদের কার্ড লেখার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সহযোগিতার অনেক কাজ করেছেন তিনি।

দুই মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু মনসুর ও ডা. রেজার স্মৃতিচারণা করে তপন লাল চক্রবর্তী বলেন, ‘রেজা ও মনসুর আমার ঘরে এসে থাকত। আকরাম নামে মনসুরের এক বডিগার্ড ছিল। সে ছোট অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিত।’ তিনি বলেন, ‘এসব স্মৃতি মনে পড়ে। আমারও অভ্যেস হয়ে গেছে। ওদের বালিশ দিলে বালিশে শুতো না। হাতটা মাথার পেছনে নিয়ে হাতের ওপর শুতো সারা রাত। বালিশ দিলে ওরা বলত, এত আরাম-আয়েশ তারা কেন করবে?’

তপন লাল চক্রবর্তী বলেন, ‘রাতে আমরা যেতাম এখান থেকে ১০ কিলোমিটার এগিয়ে ভোজপুর পুকুরের দিকে। মনসুরসহ অনেককে ওই পারে (বাংলাদেশে) পার করে দিতাম। তখন একটা চিন্তা হতো কখন আসবে কখন আসবে?’ তিনি বলেন, ‘সাব্রুমে যত লোক তার চেয়ে বেশি লোককে তারা আশ্রয় দিয়েছিল। আমার পরিবারের কথাই ধরুন। আমাদের পরিবারের সদস্য ছিল তখন চারজন। আমাদের বাড়িতে কম করে হলেও ৫০ জন ছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘ঘর তো নেই। চালা আছে, সেখানেও লোক ছিল। কী অবর্ণনীয় কষ্ট! আমি ওপারে যেতাম। শরণার্থী আসলে তাদের ট্রানজিট ক্যাম্পে পাঠাতাম। ভলান্টারি করতাম। ট্রানজিট ক্যাম্পে তারা থাকবে দুদিন। ওখানে চাল-ডাল দেওয়া হতো। এরপর তাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠানো হতো।’

তপন বলেন, একাত্তরে সাব্রুমে হাজার হাজার বাংলাদেশি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের বেশির ভাগই ছিল চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের। তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে তিনি কখনো এ দেশে আসেননি। তবু রাউজান, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি—এসব নাম তাঁর মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল কার্ড লিখতে লিখতে।

তপন লাল চক্রবর্তী বলেন, ফেনী নদীর ওপর অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করে শরণার্থীদের সাব্রুমে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে সাব্রুমে যাওয়ার পথে ব্যাপক নির্যাতন-নিপীড়নের খবরও আসছিল। একদিন খবর এলো পথে একজন শরণার্থী সন্তান প্রসব করেছে। তখন ট্রাক্টর পাঠানো হয়েছিল তাদের আনতে। পাকিস্তানি বাহিনীর ছোড়া মর্টারের গোলাও সাব্রুমে গিয়ে পড়েছিল। তখন সেখানে বাড়িঘর কম ছিল। কথা প্রসঙ্গে আসে জিয়াউর রহমান প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরগুলোতে তিনি যেতেন। জিয়াউর রহমানকেও চিনতেন। খালেদা জিয়াকে আনতে জিয়াউর রহমান লোক পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া আসেননি। এতে জিয়াউর রহমানের ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এক নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়েছিল সাব্রুমের হরিণায়। শুরুর দিকে সেই সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন জিয়াউর রহমান।

মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরগুলোতে নিয়মিত যাতায়াতের কারণে গড়ে ওঠা সখ্যের কথা বলতে গিয়ে তপন লাল চক্রবর্তী জানালেন, হায়ার সেকেন্ডারির ফল প্রকাশ হওয়ার দিন মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর ফল জানতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ফল প্রকাশ হয়েছে শুনেছেন। কিন্তু তাঁর ফল তখনো পাননি। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল তখন তপনকে সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে করে ফল দেখতে যায়। ওই কেন্দ্রে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় সেদিন ওই শিবিরে মুরগির মাংস রান্না করা হয়েছিল বলেও জানান তপন।

সাব্রুমের আরো কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে আলাপকালে তাঁরাও মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশি শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার কথা জানান।

দক্ষিণ ত্রিপুরার চোত্তাখলায় ২০ একরেরও বেশি জায়গার ওপর নির্মাণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উদ্যান’। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে ওখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের আবক্ষ মূর্তি রয়েছে।

সাব্রুমের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকেই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে লোকজন সাব্রুম এলাকায় আশ্রয় নিতে শুরু করেছিল। অন্য এলাকা দিয়েও এ দেশের লোকজন ত্রিপুরায় আশ্রয় নিচ্ছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সাপ্তাহিক সমাচারে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশির ত্রিপুরায় আশ্রয় নেওয়ার খবর মূল শিরোনাম হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল।

তবে বড় পরিসরে আশ্রয় নেওয়া শুরু হয় একাত্তরের মার্চ মাসের শেষ দিকে। তখনকার জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য এবং পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা রামগড় থেকে সাব্রুমে ঢুকে আগরতলায় পৌঁছেছিলেন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তাঁরা সাব্রুমসহ ত্রিপুরায় বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প চালু করেছিলেন।

 

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা