kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

বিআরটিএ নিয়ন্ত্রণ করে ধুন্ধুমার চাঁদাবাজি

লায়েকুজ্জামান   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিআরটিএ নিয়ন্ত্রণ করে ধুন্ধুমার চাঁদাবাজি

নাসির উদ্দিন নাসিম

বেকারত্ব ঘোচাতে বিদেশে পাড়ি জমিয়েও লাভ হয়নি। ভাগ্যবিড়ম্বিত হয়ে কয়েক মাসের মাথায় ফিরে আসেন দেশে। পরে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেন। দলে পদ-পদবি বাগিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে নেন। তিনি নাসির উদ্দিন নাসিম। তুরাগ থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। ক্ষমতার অপব্যবহার করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তুরাগ-উত্তরা এলাকা। গড়ে তুলেছেন অগাধ বিত্ত। চাঁদাবাজির টাকায় রাজধানীতে গড়েছেন একাধিক আলিশান বাড়ি। চলাফেরা করেন দামি গাড়ি হাঁকিয়ে। বিআরটিএর উত্তরা অফিসের দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ থেকে তুরাগ এলাকার ফুটপাত, যন্ত্রচালিত রিকশা থেকে চাঁদাবাজি, জায়গাজমির দখলবাজি, গার্মেন্টের জুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করে গড়ে তুলেছেন বিত্তের পাহাড়।

এ ধরনের লোক কিভাবে দলের পদ-পদবি পায় জানতে চাইলে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুবলীগ আদর্শভিত্তিক সংগঠন। চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কেউ যুবলীগে থাকতে পারবে না। দলীয় ফোরামে খোঁজ নিয়ে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

তুরাগ-উত্তরায় আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, নিজেদের আখের গোছাতে দারুণভাবে ঐক্যবদ্ধ তুরাগ থানা যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের চার নেতা। এঁরা হচ্ছেন যুবলীগের নিত্য ঘোষ, নাসির উদ্দিন নাসিম, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাদেকুর রহমান ও শাহীন। এঁরাই ওই এলাকার সংগঠন দুটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। আদায় করা চাঁদাবাজির টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে বিত্তবান তাঁরা। চার নেতার যৌথ চাঁদাবাজির মূল নিয়ন্ত্রক নাসির উদ্দিন নাসিম। আদায় করা চাঁদাবাজির টাকা তিনিই বিলিবণ্টন করেন।

বিআরটিএর উত্তরা অফিসে নাসির উদ্দিন নাসিমের ছাড়পত্র নিয়ে তবেই কাজ করতে হয় দালালদের। বিআরটিএ অফিসে দালালি করেন এমন একজন বলেন, ‘আমরা প্রায় ২৫ জন এখানে কাজ করি। কিছু টাকা বেশি নিয়ে বিভিন্ন লোকের গাড়ির কাগজপত্র ঠিক করে দিই। কেউ লাইসেন্স করতে এলে লাইসেন্স পাইয়ে দিতে সহায়তা করি। বিনিময়ে বাড়তি কিছু অর্থ নিই। মাঝেমধ্যে র‌্যাব পুলিশ আমাদের ধরে নিয়ে যায়, মারপিট করে। অথচ কেউ দেখে না, দিনে আমরা যদি এক হাজার টাকা আয় করি, এ থেকে ৭০০ টাকা দিতে হয় নাসির উদ্দিন নাসিমকে। তার অনুমতি ছাড়া এখানে কেউ দালালির কাজ করতে পারে না।’

সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে দালালচক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা ছাড়াও বিআরটিএতে এই চক্রের আয়ের আরেকটি বড় উৎস হলো প্রশিক্ষণ গাড়ি ভাড়া দেওয়া। বিআরটিএর উত্তরা অফিসে চালক লাইসেন্স নিতে আসা যুবক রাকিব হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গাড়ি চালাতে পারি কি না তা দেখার জন্য আমাকে একটি লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িতে ওঠানো হয়। মিনিট দুই গাড়ি চালাই। এর জন্য দালালরা আমার কাছ থেকে ২০০ টাকা আদায় করে।’

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, উত্তরা বিআরটিএ অফিসে দুটি প্রশিক্ষণ গাড়ি আছে। গাড়ি দুটি সরবরাহ করেছেন নাসির উদ্দিন নাসিম। কেউ প্রশিক্ষণ পরীক্ষা দিতে এলে গাড়িভাড়া বাবদ দিতে হয় ২০০ টাকা। বিআরটিএর অফিস রেকর্ডে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় হাজার লোক প্রশিক্ষণ পরীক্ষায় অংশ নিতে আসে। এ হিসাবে শুধু গাড়িভাড়া থেকেই আদায় করা হয় প্রতিদিন দেড় লাখ টাকা। দালালদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সব মিলিয়ে বিআরটিএর অফিস থেকে প্রতি মাসে অবৈধ আয় হয় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। এই টাকা নাসির উদ্দিন নাসিমের কাছে জমা হওয়ার পর তিনি ভাগ-বাটোয়ারা করেন।

বিআরটিএতে দালালচক্রের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিআরটিএ উত্তরা অফিসের সহকারী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমরা মানুষের সেবা দিই। কেউ এমন কোনো অভিযোগ দিতে পারবে না। অফিসের কেউ বলেছে কি আপনারা দালালের কাছে যান? তার পরও লোকজন কেন দালালের কাছে যায়, সেটাই বুঝি না।’

যৌথ চাঁদাবাজির আরেকটি বড় খাত তুরাগ থানার বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করা যন্ত্রচালিত রিকশা। একাধিক যন্ত্রচালিত রিকশার চালক কালের কণ্ঠকে বলে, ‘আমরা প্রতি মাসের শুরুতে এক হাজার টাকা জমা দিয়ে টোকেন নিই। এটা রিকশা চালানোর অনুমতি। ওই টাকা নেয় নাসির উদ্দিন নাসিম।’ রিকশাচালকরা জানায়, তুরাগ থানা ও উত্তরা থানা এলাকায় প্রায় তিন হাজার যন্ত্রচালিত রিকশা চলাচল করে। এই হিসাবে এ খাত থেকে আয় হয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা। এই টাকাও নাসির উদ্দিন নাসিমের মাধ্যমে বণ্টন হয় চার নেতার মধ্যে।

এ ছাড়া নাসির উদ্দিন নাসিম তুরাগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় দোকান বসিয়ে চাঁদা আদায় করছেন। তুরাগ নদের তীরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করে সেখানে অবৈধ বালু বিক্রির ব্যবসা করছেন। ১০ নম্বর সেক্টরে রাজউকের আটটি বরাদ্দ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্লটে রিকশার গ্যারেজ করে ভাড়া আদায় করছেন তিনি।

২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের মিটিং-মিছিলে পা মেলাতে থাকেন নাসিম। ২০১৪ সালে যুবলীগের নেতৃত্বে আসার পর থেকে নাসির উদ্দিন নাসিমের ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়তে শুরু করে।

তুরাগ থানার চণ্ডালভোগ মসজিদের পাশে পাঁচ কাঠা জায়গার ওপর পাঁচতলা ডাবল ইউনিটের ভবনটি তাঁর। এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, ওই এলাকায় বর্তমানে প্রতি কাঠা জমির মূল্য এক থেকে দেড় কোটি টাকা। সে হিসাবে ভবনের জায়গার মূল্য প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা। আর ভবনটি নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা। এ ছাড়া চণ্ডালভোগ এলাকায় তাঁর আরো একটি বাড়ি আছে ১২ কাঠা জমির ওপর।

এসব বিষয়ে নাসির উদ্দিন নাসিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিআরটিএর দালালি আমি নিয়ন্ত্রণ করি না। শুনেছি দলের কিছু লোক নিযন্ত্রণ করে। তবে কারা, সঠিক তা জানি না। তুরাগে আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি আছে। সেখানে বাড়ি করেছি। আর দলীয় পদ ব্যবহার করে চাঁদাবাজির প্রশ্নই ওঠে না।’

নিজের কোন আয় থেকে বাড়ি করার টাকা পেয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে চুপ থাকেন নাসিম। অস্বীকার করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করে বালু ব্যবসার বিষয়টিও।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা