kalerkantho

শনিবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১০ সফর ১৪৪৩

যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক

দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে

পার্থ সারথি দাস   

১৭ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে

যেমন হবে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে

দেশে প্রথম প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ে হতে যাচ্ছে পদ্মা সেতুর সংযোগ ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক। পদ্মা সেতুর এপার যাত্রাবাড়ী-মাওয়া ও ওপার পাচ্চর-ভাঙ্গা অংশকে যোগ করবে চার লেনের দোতলা পদ্মা সেতু। ২০১৮ সালে পদ্মা সেতু চালুর চার মাসের মধ্যেই পুরো এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ করার কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে পদ্মা সেতু চালুর সময়েই এক্সপ্রেসওয়ে চালুর লক্ষ্য রয়েছে প্রকল্প প্রকৌশলীদের। দেশে প্রথম এই এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে যাত্রাবাড়ী থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় যেতে সময় লাগবে বড়জোড় ৪২ মিনিট। ছয়টি ফ্লাইওভার ও ১৫টি আন্ডারপাস-বিশিষ্ট নির্মিতব্য এক্সপ্রেসওয়ের কোথাও ট্রাফিক ক্রসিং থাকবে না। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন-পশ্চিম এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে।

গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অন্য চারটি প্রকল্পের সঙ্গে এই প্রকল্পের কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। পাশের দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশেই প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত একাধিক এক্সপ্রেসওয়ে আছে। ভারতে এক্সপ্রেসওয়ে আছে ২১টি, আরো নতুন ১৬টি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে জাপানের কাছে অর্থ সহযোগিতা চেয়েছে দেশটি। মালয়েশিয়ায় এক্সপ্রেসওয়ে ৩৭টি, পাকিস্তানে ১১টি এমনকি শ্রীলঙ্কায় আছে তিনটি এক্সপ্রেসওয়ে। বাংলাদেশে এ ধরনের এক্সপ্রেসওয়ে এখনো নির্মিত হয়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের সমান্তরালে ২৩২ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সওজ অধিদপ্তর। ২০২২ সালের মধ্যে এটি নির্মাণের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার সুপারিশ অনুসারে, ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এটির কাজ করছে বাংলাদেশ সেতু বিভাগ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এটির আগেই শেষ হবে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের কাজ। তবে মহাসড়ককে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রথম উদ্যোগ যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-ভাঙ্গায়। 

২০১৫ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের মহাসড়ক আছে মাত্র ১ শতাংশ। দুই পাশে হালকা যানবাহনের জন্য আলাদা লেনসহ আন্তর্জাতিক মানের মহাসড়ক নেই। এক পাশে হালকা যানবাহনের আলাদা লেন আছে ৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বনপাড়া-হাটিকুমরুল অংশে। ওই মহাসড়কটির তিনটি অংশের মধ্যে একটি অংশ এক বছরের মধ্যে বিধ্বস্ত হয়ে যায় নির্মাণ ত্রুটির কারণে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল ২০০৪ সালে। তবে পদ্মা সেতুর সংযোগ এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশেই থাকবে হালকা যানবাহন চলাচলের আলাদা লেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, এক্সেস কন্ট্রোলড এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম উদাহরণ হতে যাচ্ছে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক। দুর্ঘটনা ঘটবে না, যানজটে মোড়ে মোড়ে আটকে থাকতে হবে না এ ধরনের মহাসড়কে। শুধু নির্মাণ করলেই হবে না, তার পরিচালনা করতে হবে সঠিকভাবে। থাকতে হবে নজরদারি। ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ের আগেই এটি নির্মিত হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা তখন বুঝতে পারবেন, এটা কতটা উপকারে আসবে। আমরা আগে বিনিয়োগবান্ধব ও পর্যটকবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করিনি। এখন করতে যাচ্ছি।  নির্মিতব্য প্রথম এক্সপ্রেসওয়ের যাত্রাবাড়ী-মাওয়া ও পাচ্চর-ভাঙ্গা অংশে দুটো করে সব মিলে চারটি বেস ক্যাম্প নির্মাণের জন্য কাজ শুরু হয়েছে। চলছে বিভিন্ন ধরনের জরিপকাজ। প্রকল্প পরিচালক কর্নেল ইফতেখার আনিসের কাছে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, স্থানীয় সংযোগ সড়কগুলোর যানবাহন এই এক্সপ্রেসওয়ের এপারে-ওপারে চলাচল করতে পারবে না। যানবাহন চলাচল করবে বাধাহীনভাবে। ফলে হানিফ ফ্লাইওভার থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা যেতে লাগবে বড়জোড় ৪২ মিনিট।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ মে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক সভায় অনুমোদিত হয়েছে। বিদ্যমান দুই লেন থেকে চার লেন করা হবে এক্সপ্রেসওয়ে মহাসড়কটি। মহাসড়কের দুই পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য নির্মাণ করা হবে আলাদা লেন। এই দুটোর প্রতিটি লেন হবে ৫ দশমিক ৫০ মিটার প্রশস্ত। চার লেন মহাসড়কের মধ্যস্থান বা মিডিয়ান হবে পাঁচ মিটার প্রশস্ত। ভবিষ্যতে এই মিডিয়ানের ওপর দিয়ে মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। মহাসড়কের কোথাও ট্র্যাফিক ক্রসিং থাকবে না। ফলে যানবাহন চলাচল করতে পারবে নির্বিঘ্নে। ঢাকা-খুলনা জাতীয় মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী ইন্টারসেকশন থেকে ইকুরিয়া-বাবুবাজার সংযোগ সড়কসহ মাওয়া পর্যন্ত ও পাচ্চর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের এক্সপ্রেসওয়ে হবে ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন থাকবে চার লেনের দুই পাশে। ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর ও ফরিদপুর এ চার জেলায় পড়েছে প্রকল্পের অবস্থান। প্রকল্পের মেয়াদ প্রকল্প অনুমোদনের সময় গত মে মাস থেকে শুরু হয়েছে। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করার কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পে ব্যয় হবে ছয় হাজার ২৫২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ দুটো। তার মধ্যে একটি হলো যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার। অন্য অংশ হলো পাচ্চর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার। প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে ২৪ দশমিক ৮৮ হেক্টর। প্রকল্প এলাকায় সব মিলে ৩১টি সেতু নির্মাণ করা হবে। তার মধ্যে পিসি গার্ডার সেতু হবে ২০টি। আরসিসি সেতু হবে ১১টি। এগুলোর মধ্যে ধলেশ্বরী-১ সেতু হবে ২৫৮ মিটার দীর্ঘ। ধলেশ্বরী-২ সেতু হবে ৩৮২ মিটার দীর্ঘ। এ ছাড়া আড়িয়াল খাঁ সেতু হবে ৪৫০ মিটার দীর্ঘ। প্রকল্পে ফ্লাইওভার বা উড়াল সড়ক হবে ছয়টি। উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হবে আবদুল্লাহপুর, হাঁসারা, শ্রীনগর, কদমতলী, পুলিয়া বাজার ও সদরপুরে। রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণ করা হবে জুরাইন, কুচিয়ামোড়া, শ্রীনগর ও আতাদিতে। প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে ১৫টি।

গত অক্টোবর মাসে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল পাঁচ হাজার ২৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। গত মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৯৬২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সর্বশেষ প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ২৫২ কোটি ২৮ লাখ টাকায়। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, জমির দাম ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় দুই দফায় বেড়েছে এক হাজার ২২২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে হবে ২৪ দশমিক ৮৮ হেক্টর। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় ১৯ দশমিক ৩৭ ও মুন্সীগঞ্জে ৫ দশমিক ৫১ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।