ভালো খেলোয়াড় এ দেশে আছেন, আগেও ছিলেন অনেকে। জুয়েল রানা নির্দ্বিধায় সেই ভালোদেরই দলের একজন। মনের আনন্দে ফুটবল খেলতে খেলতে হয়েছেন খ্যাতিমান সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার, সন্মান বয়ে এনেছেন দেশের ফুটবলের জন্যও। ১৯৯৯ সাফ ফুটবলে রানার আপ হওয়া কিংবা ওই বছরই সাফ গেমস ফুটবলে প্রথম সোনা জেতার যে দুটি কীর্তিতে মনে করা হয়েছিল খেলাটির পুনরুত্থানের মঞ্চ, সেই দুটি দলেরই অধিনায়ক ছিলেন জুয়েল রানা। ফুটবলে অধিনায়ক মানে তো নিছকই একটি 'আর্মব্যান্ড'। কিন্তু জুয়েল রানা সেই বাহুবন্ধনীতে জড়িয়ে নিয়েছিলেন কর্তৃত্বের লাগামও। প্রয়োজনে সতীর্থদের শাসন কিংবা কর্মকর্তাদের সমালোচনায় 'দ্বিতীয়' জুয়েলের দেখা আজও পাওয়া যায়নি। খেলা ছেড়ে সেই তিনি এখন কোচ, কিন্তু নোমান মোহাম্মদের সঙ্গে কথাবার্তায়-বিশ্লেষণে-স্মৃতিচারণায় তিনি সেই 'অ্যাংগ্রি ইয়াংম্যান' জুয়েল রানাই! প্রশ্ন : আপনার ক্যারিয়ারের শুরু ফুটবলের সোনালি সময়ে। আর ২০০৭-০৮ মৌসুমে যখন অবসরে যান, বাংলাদেশের ফুটবল তখন রং হারিয়ে বিবর্ণ। এটি নিশ্চয়ই ভীষণ কষ্টকর? জুয়েল রানা : অবশ্যই। আমাদের সেই কষ্ট এখনকার ফুটবলাররা বুঝবে না। কারণ ওরা তো প্রতি ম্যাচে ৩০-৪০ হাজার দর্শকের সামনে খেলেনি। জিতলে সমর্থকদের উল্লাস কিংবা হারলে তাদের গালিগালাজ- কোনোটির সঙ্গেই পরিচিত নয় সেভাবে। এখনকার আবাহনী-মোহামেডানেও ওরা খেলে, আর আমরাও আবাহনী-মোহামেডানে খেলতাম। একেবারে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ওই সময়ে এর চেয়ে বড় সম্মানের কিছু বাংলাদেশে আর ছিল না। এখন যে সম্মান নেই মোটেও। আমার কিংবা আমার প্রজন্মের কষ্টের জায়গাটা ঠিকই ধরেছেন। আমরা ওই সময় দেখেছি বলেই এই সময়টা মেনে নিতে পারি না। প্রশ্ন : কেন এমন হলো- নিজে নিজে ভাবেন না? জুয়েল রানা : ভাবি। আমি ভাবি, নিশ্চিতভাবেই জানি যে আমার সময়ের অন্য ফুটবলাররাও ভাবেন। কিন্তু যাঁদের ভাবার কথা, তাঁরা ভাবেন না। প্রশ্ন : কর্মকর্তাদের কথা বলছেন? জুয়েল রানা : আর কারা! আমাদের ফুটবল ধ্বংসের পেছনে একক দায় কর্মকর্তাদের। তাঁরা ভেবেছিলেন, মাঠে দর্শক আসছে, ফুটবলের রমরমা বাজার যাচ্ছে, এমনটাই বোধ হয় থাকবে চিরকাল। কিন্তু পরিচর্যা না করলে কোনো কিছুই চিরকাল এক রকম থাকে না। সেটি ধ্বংস হয়ে যায় আর এর জায়গা নিয়ে নেয় অন্য কিছু। ফুটবলের জায়গাটা যেমন নিয়েছে ক্রিকেট। এতে ক্রিকেটের কৃতিত্ব অবশ্যই আছে, তবে এর চেয়ে বেশি ফুটবলের ব্যর্থতা। আরো নির্দিষ্ট করে বললে ফুটবল কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা। প্রশ্ন : কথাটি তো অনেক মোটা দাগে বলা হলো। নির্দিষ্ট কয়েকটি উদাহরণ যদি দিতেন? জুয়েল রানা : পুল প্রথার কথাই ধরুন। আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্স মিলে ঠিক করে ফেলল যে কেউ কারো মূল ছয়-সাতজন খেলোয়াড় নেবে না। আর ওই ফুটবলারদের বেতনও তারা ঠিক করে ফেলল। এভাবে জোর করে তাদের হয়তো খেলানো যাবে, কিন্তু সেরাটা বের করে আনা যাবে কি? কখনোই না। আর শুধু তো এটি নয়। আমরা পুলের খেলোয়াড়রা দেখলাম, আমাদের চেয়ে পিছিয়ে থাকা ফুটবলারদের দাম বেশি। আমাদের টাকা তো ক্লাব ঠিক করে দিচ্ছে। কিন্তু অন্য খেলোয়াড়দের যেহেতু পুল নেই, তাদের দলে নিতে কথা বলছে দুই-তিনটি ক্লাব। তখন তাদের দাম হয়ে যাচ্ছে পুলের খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। ভালো খেলার মানসিকতা তখন আমাদের থাকে কী করে! প্রশ্ন : সেই আপনারা তো পরে বিদ্রোহ করে মুক্তিযোদ্ধায় গেলেন? তাতে দেশের ফুটবলের কোন লাভটা হলো? জুয়েল রানা : লাভ হবে না কেন, অবশ্যই হয়েছে। এই যে গত মৌসুমে মামুনুল নাকি ৪০ লাখ টাকা পেয়েছে, ২০-২৫-৩০ লাখ টাকা করে পাচ্ছে আরো অনেকেই- সেটি সরাসরি আমাদের সেই বিদ্রোহের ফসল। যদি আমরা সেদিন মাথা নিচু করে থাকতাম, তাহলে বাংলাদেশের ফুটবলে এখনো পুল প্রথা থাকত। এখনো খেলোয়াড়রা ওই পাঁচ-সাত লাখ টাকা করেই পেত। প্রশ্ন : আপনার কথায় বোঝা গেল, ফুটবলাররা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটি ছিল যে এতে দেশের ফুটবলের লাভ হয়েছে কী! জুয়েল রানা : এখন জনপ্রিয়তার কথা যদি বলেন, সেটি ভিন্ন ব্যাপার। আগে মানুষের বিনোদন বলতে কিছু ছিল না। তারা বিকেলে স্টেডিয়ামে যেত ওই বিনোদনের খোঁজে। এখন বিনোদনের অনেক কিছু আছে। আবার ঘরে বসে টিভিতে তারা বিশ্বের সেরা সব ফুটবলারের খেলা দেখতে পারে। সঙ্গে ক্রিকেটের জোয়ারের ব্যাপারও আছে। সব মিলিয়েই মাঠে দর্শক কমেছে। কিন্তু যদি সাফল্যের কথা বলেন? আমাদের সময় কর্মকর্তারা বারবার বলতেন, সাফ গেমসে একবার চ্যাম্পিয়র করাও, দেখো আমরা বাংলাদেশের ফুটবলকে কোথায় নিয়ে যাই! আমরা তো ১৯৯৯ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। ২০০৩ সালে হয়েছি। ২০১০ সালে হয়েছি। তিন-তিনটি শিরোপা তো কর্মকর্তাদের আমাদের ও পরের প্রজন্ম এনে দিয়েছে। এক শিরোপা দিয়েই না কর্মকর্তারা আমাদের কো-থা-য় নিয়ে যান! তিন শিরোপাতেও তো কোথাও নিয়ে যেতে পারেননি। পারছেন না। প্রশ্ন : ১৯৯৪ সালে আবাহনী-মোহামডোন-ব্রাদার্সের খেলোয়াড়রা বিদ্রোহ করে যে মুক্তিযোদ্ধায় গিয়েছিলেন, ক্লাব ফুটবলের জনপ্রিয়তা ধসের পেছনে এটি কারণ ছিল বলে মনে করেন কি? কারণ তারকা ফুটবলাররা চলে যাওয়ায় জনপ্রিয় ক্লাবগুলোর দর্শকরাও মাঠে আসা আস্তে আস্তে কমিয়ে দিয়েছিলেন... জুয়েল রানা : আমি নিরপেক্ষ জায়গা থেকে দেখলে এটি হয়তো ঠিক। কিন্তু জনপ্রিয়তার জন্য, সমর্থকদের জন্য আমার ক্লাবে সেরা খেলোয়াড়দের ধরে রাখতে হবে- এই তাগিদটা কার থাকার কথা? খেলোয়াড়দের নাকি কর্মকর্তাদের? আরে ভাই, আমি মোহামেডানে খেলার জন্য অন্য ক্লাবের প্রস্তাবের চেয়ে না হয় ৫০ হাজার-এক লাখ টাকা কম নিতে পারি। কিন্তু আমাকে অন্য ক্লাব অফার করল ১২ লাখ, মোহামেডান করল ছয় লাখ- তখন কী করব! আমাদেরও তো জীবন আছে। আর ক্যারিয়ারও বেশি দিনের নয়। নিজেদেরটা আমরা ভাবব না? যে যাই বলুক, ওই কর্মকর্তাদের জন্যই আবাহনী-মোহামেডানের আজ এই দশা, দেশের ফুটবলের এই করুণ অবস্থা। প্রশ্ন : শুরুতেই অনেক রাগ-ক্ষোভ-কষ্টের কথা হয়ে গেল। এবার ঘুরে আসি আপনার আনন্দময় শৈশবে। ফুটবলের সঙ্গে পরিচয়ের বিশেষ কোনো গল্প আছে কি? জুয়েল রানা : না, বিশেষ কোনো গল্প নেই। তখনকার অন্য সব ছেলের মতোই ফুটবল খেলা শুরু করেছিলাম। আগারগাঁওয়ে, এখন যেখানে রেডিও অফিস, এর পাশে আমাদের নিজেদের বাসা ছিল প্রায় দুই বিঘা জায়গার ওপর। আব্বা ঠিকাদারি ব্যবসা করতেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমাদের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জে রেখে তিনি যান মুক্তিযুদ্ধে। পাক সেনারা যখন শুনল যে এটি মুক্তিযোদ্ধার বাসা, তখন বোমা মেরে তা দেয় উড়িয়ে। যুদ্ধের পর ফিরে বাবা দেখলেন, ওই বাসায় ওঠার অবস্থা আর নেই। ধানমন্ডির শংকরে বাসা ভাড়া করে গ্রাম থেকে নিয়ে এলেন আমাদের। ঘটনাটি এ কারণেই বললাম যে আমার খেলোয়াড় হয়ে ওঠার পেছনে এর পরোক্ষ একটা অবদান আছে। আমরা যে বাসায় থাকতাম, এর বাউন্ডারি সীমার পর থেকে শুরু স্কুলের মাঠ। আলী হোসেন গার্লস স্কুলে পড়েছি ক্লাস টু পর্যন্ত। নামে গার্লস স্কুল হলেও সেখানে ওই দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ছেলেমেয়ে একসঙ্গে পড়ত। ক্লাস থ্রিতে গিয়ে ভর্তি হই ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ হাই স্কুলে। এই দুটো স্কুল মুখোমুখি, মাঝে বিশাল খেলার মাঠ। আর আগেই তো বললাম, ওই মাঠটি ছিল আমাদের বাসার প্রাচীরঘেঁষা। স্কুলের সময়টুকু বাদ দিয়ে সারা দিন তাই মেতে থাকতাম খেলাধুলা নিয়ে। ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস- কোনো বাছবিচার ছিল না। মনে আছে, ১৯৮৫ সালে এশিয়ান হকি হলো ঢাকায়, তখন আমরা বন্ধুরা মিলে আম গাছের ডাল কেটে সেটিকে হকিস্টিক বানিয়ে খেলেছি। ফুটবলার আমাকে হতেই হবে, ওই ধরনের কোনো নেশা বা ইচ্ছা তখনো ঘাড়ে চেপে বসেনি। প্রশ্ন : মোহামেডান কিংবা মুক্তিযোদ্ধার জুয়েল রানা হিসেবেই আপনার পরিচিতি। কিন্তু শৈশবে যেহেতু বেড়ে ওঠা ধানমণ্ডিতে, নিশ্চয়ই তখন আবাহনীর সমর্থক ছিলেন? জুয়েল রানা : তা তো অবশ্যই। পাড়ার দল বলে কথা। আর আমার ফুটবলার হয়ে ওঠায় ওই আবাহনী মাঠেরও ভূমিকা অনেক। ক্লাস নাইন বা টেনে পড়ি যখন, প্রথম গেলাম আবাহনী মাঠে। বড় বড় ফুটবলারদের প্র্যাকটিস দেখি চোখের সামনে। তা দেখলে অনুপ্রাণিত হবে যে কেউ। আবাহনী মাঠের আরেকটি ভূমিকার কথা বলি। পাড়ার এক বড় ভাই ছিলেন, তাঁর নাম মামুন। আমাদের বয়সী ছেলেপুলেকে কোচিং করাতেন আবাহনী মাঠে। আমাদেরও যেতে বললেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর সেখানে যাওয়া শুরু করলাম প্র্যাকটিসে। এর আগে আমি আর আমার বড় ভাই মিলে গুলিস্তানে গিয়ে কিনে আনলাম গ্লোব কম্পানির বুট। নিজের জমানো টাকায় কেনা, দাম ছিল মনে হয় ১২০ না ১৩০ টাকার মতো। প্রশ্ন : ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটা কি তখন থেকেই ডালপালা মেলছিল? জুয়েল রানা : তা বোধহয় বলা যাবে না। মনের আনন্দে খেলতাম। পাড়ার বন্ধুরা মিলে প্রতিদিন বিকেলে খেলতেই হতো আমাদের। এখন যে কোচ আছে সাইফুল বারী টিটু, ও আর আমি একই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি, থাকতাম পাশাপাশি বাসায়, খেলতামও এক সঙ্গে। এই খেলে যে বড় ফুটবলার হতে হবে, জাতীয় দলে খেলতে হবে, আবাহনী-মোহামেডানের মতো ক্লাবে খেলতে হবে- এমনটা কখনো ভাবিনি। আমার ভাগ্য ভালো বলতে হবে, সব কিছু একেবারে ধাপে ধাপে হয়ে যায়। আমি হুট করে কিছু পাইনি, আবার দীর্ঘদিন অপেক্ষাও করতে হয়নি। প্রশ্ন : একটু যদি বিস্তারিত বলেন? জুয়েল রানা : ওই মামুন ভাইয়ের অধীনে আমরা 'এজ গ্রুপ' খেলতাম। পরে ওই আমরাই খেললাম পাইওনিয়ারে, ইস্ট বেঙ্গল নামে একটি ক্লাবে। সেখানে একটি ম্যাচ খেলার পর আমি অবশ্য জন্ডিসে পড়ে যাই, আর খেলা হয়নি। পরের বছর পাইওনিয়ারে খেললাম সব ম্যাচ। সেখানে আমার খেলা দেখে পছন্দ হয়ে যাওয়ায় তৃতীয় বিভাগের একটি ক্লাব থেকে প্রস্তাব আসে। ওই ক্লাবের নামও ইস্ট বেঙ্গল। খেললাম সেখানে। আর দলকে আমরা করাই চ্যাম্পিয়ন। পরের বছর দ্বিতীয় বিভাগে খেলি। দ্বিতীয় বিভাগ শেষে অফ সিজনে আবাহনী মাঠে প্র্যাকটিস করি। সেখানে আরো অনেকে আসতেন। প্রেমলাল, পাকির আলীরা তো ছিলেনই। সাব্বির ভাই, জিয়া বাবু ভাই, আয়াজ ভাই- তাঁরাও আসতেন। প্র্যাকটিসে আমার খেলা দেখে জিয়া বাবু ভাই বললেন, 'এই ছেলে তুমি কোথায় খেল?' বললাম। তিনি বললেন, 'আর দ্বিতীয় বিভাগে খেলতে হবে না। আমি তোমাকে মুক্তিযোদ্ধায় নিয়ে যাব। অন্য কোনো ক্লাবের সঙ্গে কথা বলো না।' মুক্তিযোদ্ধা তখন বড় দল। আবাহনী-মোহামেডানের মতো হয়তো নয়, তবে ব্রাদার্স-মুক্তিযোদ্ধা একই কাতারে। ওই দলে গেলে আমি একাদশে সুযোগ পাব কি না, এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম। কথা বললাম তাই টিটুর সঙ্গে, ও আগের মৌসুমেই খেলেছে প্রথম বিভাগে ধানমণ্ডিতে। টিটু আমাকে একটা কথাই বলল, 'জীবনে অনেক সময় ঝুঁকি নিতে হয়।' ব্যাস, আমিও চলে যাই মুক্তিযোদ্ধায়। এভাবেই পাইওনিয়ার, তৃতীয় বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ হয়ে প্রথম বিভাগে চলে আসি ধাপে ধাপে। প্রশ্ন : জানি, ওই বয়সে টাকা-পয়সা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এর পরও যদি একটু বলেন, কি রকম টাকা পেয়েছিলেন? জুয়েল রানা : ঠিক বলেছেন, তখন টাকা কি জিনিস, বুঝতামই না। পাইওনিয়ারের ক্লাব হয়তো দু-এক জোড়া বুট কিনে দিয়েছিল। তৃতীয় বিভাগে বুটের সঙ্গে কিছু যাতায়াত খরচ। দ্বিতীয় বিভাগে বুট, যাতায়াত খরচের সঙ্গে হয়তো কিছু হাতখরচ। আর প্রথম বিভাগে মুক্তিযোদ্ধায় যখন আসি, তখনো খুব বেশি টাকা পাইনি। সম্ভবত ১০-১২ হাজার পেয়েছিলাম। প্রশ্ন : এরপর মোহামেডানের জুয়েল রানা হয়েছেন আপনি। খেলেছেন মুক্তিযোদ্ধা-ব্রাদার্সের মতো দলেও। কিন্তু ছোটবেলার প্রিয় দল আবাহনীতে আর খেলা হলো না কেন? জুয়েল রানা : সে আরেক কাহিনী। ১৯৯১ সালে মোহামেডান ক্লাবে খেলার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হলো আমাকে। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, 'কত টাকা চাও?' আমি বললাম, 'আপনারা যা দেবেন, তাই হবে।' আকমল ভাই ছিলেন মোহামেডানের সেক্রেটারি। তিনি বললেন, 'তুমি তো জুয়েল ভালো বিপদে ফেললে। আচ্ছা যাও, নতুন খেলোয়াড় হিসেবে তোমাকে সাত লাখ দেব।' আমি বললাম, 'আমি মোহামেডানের হয়েই খেলব। আপনারা আর কিছু বাড়িয়ে দিয়েন।' আবাহনী যেন কিভাবে কিভাবে ব্যাপারটি জেনে গেল। এরপর তারা ক্লাবে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠাল গাফফার ভাইকে। টিটুর বিয়ের অনুষ্ঠানে গাফফার ভাই এসে ধরলেন আমাকে। আমি তাঁকে সাফ বলে দিলাম, 'মোহামেডানকে আমি কথা দিয়ে এসেছি, এখন আর আবাহনীতে খেলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।' তিনি তবু জোরাজুরি করতে লাগলেন আবাহনী ক্লাবে যাওয়ার জন্য। বন্ধুরাও বলল যেতে। গেলাম। আবাহনীর কর্মকর্তারা আমাকে ক্লাবে ঢুকতে দেখে মনে করলেন, আমি তাঁদের হয়ে খেলব। কিন্তু শুরুতেই আমি নিজের অবস্থান জানিয়ে দিই। তাঁরা অনেক চেষ্টা করেন। বলেন, 'তুমি পাড়ার ছেলে। আবাহনীর মাঠে খেলে তুমি ফুটবলার হয়েছো। এখন পাড়ার ক্লাবেই খেলবে।' আমি বললাম, 'সে ইচ্ছা আমারও ছিল। কিন্তু আপনারা তো আগে প্রস্তাব দেননি। মোহামেডান দিয়েছে, তাদের আমি কথাও দিয়েছি।' আবহনীর কর্মকর্তারা তাচ্ছিল্য করে বলছিলেন, 'খেলা শুরু করতে পারেনি, এখনই বড় বড় কথা।' তখন তান্না ভাই বাঁচালেন আমাকে। তিনি বললেন, 'জুয়েল যা বলেছে, ঠিক আছে। ওর মতো যদি সব ফুটবলার হতো, তাহলে বাংলাদেশের ফুটবল আরো ওপরে উঠত।' প্রশ্ন : সেবার না হয় যেতে পারেননি, পরে আর কখনো আবাহনীতে আসা হয়নি কেন? জুয়েল রানা : হবে কিভাবে? পুল শুরু হয়ে গেল না! এরপর সেই পুল প্রথা উঠে যায় ঠিকই। কিন্তু ২০০১-০২ সাল পর্যন্ত অলিখিত পুল ছিল। মোহামেডানের খেলোয়াড় আবাহনী নিত না। আবাহনীর খেলোয়াড় নিত না মোহামেডান। আমার তাই আর আবাহনীতে খেলা হয়নি। তবে এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। লিগে তো ঘুরেফিরে তিনটি ক্লাবেই খেলেছি। সেই মোহামেডান-মুক্তিযোদ্ধা-ব্রাদার্স- সব ক্লাবকেই জিতিয়েছি লিগ। প্রশ্ন : জাতীয় দলে প্রথম ডাক পেয়েছেন কবে? জুয়েল রানা : আরে সে তো মহাবিস্ময়কর ঘটনা। প্রথম বিভাগে প্রথমবার মুক্তিযোদ্ধায় খেলতে এলাম ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে। শুরুর দিকে একাদশে সুযোগ পাইনি। শেষদিকে এসে একটি ম্যাচে মাঠে নামাল। এরপর আর একাদশ থেকে জায়গা হারাইনি। শেষ আটটি ম্যাচ খেলেছিলাম টানা। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, এর আগ পর্যন্ত পাইওনিয়ার, তৃতীয় বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ কোথাও কিন্তু স্টপার হিসেবে খেলিনি। খেলেছি হয় লেফট ব্যাক, রাইট ব্যাক অথবা মিডফিল্ডার হিসেবে। মুক্তিযোদ্ধায় টানা আট ম্যাচ স্টপার ব্যাকে খেললাম। আর তা দেখেই নাসের হেজাজি ১৯৮৯ সাফ গেমসের জাতীয় দলে ডেকে নিলেন। খুব অবাক হয়েছিলাম। প্রশ্ন : শেষ সাফ গেমস তো আপনার ১৯৯৯ কাঠমান্ডুতে! স্বর্ণপদক জিতে অবশেষে চিরন্তন হাহাকার ঘোচান আপনারা। অন্য দলগুলোর সঙ্গে ওই দলটির পার্থক্য কী ছিল? জুয়েল রানা : পাঁচটি সাফ গেমসের দলে আমি ছিলাম। ১৯৮৯ সালে ইসলামাবাদ, ১৯৯১ সালে কলম্বো, ১৯৯৩ সালে ঢাকা, ১৯৯৫ সালে মাদ্রাজ আর ১৯৯৯ সালে কাঠমান্ডুর। প্রতিভার দিক দিয়ে আগের চারটি দলের চেয়ে যে ১৯৯৯ সালের দলটি এগিয়ে ছিল, তা আমি বলব না। তবে শৃঙ্খলাটা ছিল অনেক ভালো। দেশের জন্য কিছু করার তাড়না ছিল। নিজের চোখে দেখা অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আগের খেলোয়াড়দের ভেতর সেটি সেভাবে ছিল না। যে কারণে সাফল্য পাওয়া হয়নি। প্রশ্ন : যেসব কোচের অধীনে খেলেছেন, তাঁদের মধ্যে সেরা বলবেন কাকে? জুয়েল রানা : একজনের কথা বলব না। নাসের হেজাজি, ওল্ডরিখ সোয়াব ও অটো ফিস্টার তিনজনের নামই আমার নিতে হবে। প্রশ্ন : নিজে ছিলেন তুখোড় ডিফেন্ডার। অন্য ডিফেন্ডারদের মধ্যে আপনার দেখা সেরা কে? জুয়েল রানা : মুন্না ভাইও ভালো ছিলেন। তবে আমার কাছে সেরা কায়সার ভাই। প্রশ্ন : সেরা ফরোয়ার্ড? জুয়েল রানা : আসলাম ভাই দারুণ ফরোয়ার্ড। রুমী ভাই খারাপ ছিলেন না। নকিবও ভালো। প্রশ্ন : সেরা বিদেশি? জুয়েল রানা : অবশ্যই আগের বিদেশিরা অনেক অনেক ভালো। নালজেগার, এমেকা, সামির শাকির, ঝুকভরা অনেক উন্নতমানের। প্রশ্ন : সনি নর্দের সঙ্গে তাঁদের কিভাবে তুলনা করবেন? জুয়েল রানা : দূর, দূর! ওদের পাশে সনি নর্দে কোনো ফুটবলারই না। একটু মাথা খাটিয়ে খেললে নর্দেকে ঠেকিয়ে দেওয়াটা কঠিন না। আমি যাঁদের কথা বললাম, তাঁদের চেয়ে কেউ যদি সনি নর্দেকে ভালো বলেন, তাহলে বুঝতে হবে হয় পুরনোদের খেলা তিনি দেখেননি অথবা দেখলেও ভুলে গেছেন। নালজেগার, এমেকা, সামির শাকির, ঝুকভরা যে ফুটবল খেলেছেন, সেটি ছিল আমাদের মানের চেয়ে অনেক অনেক ওপরে। প্রশ্ন : খেলা ছাড়ার পর কোচিংয়ে এসেছেন। এখানেই থাকার ইচ্ছে? জুয়েল রানা : ইচ্ছে তো আছে, এরপর দেখা যাক কী হয়! আমাদের ক্লাব কর্মকর্তাদের মানসিকতা হচ্ছে, ফুটবলারদের ৩০-৪০ লাখ টাকা দিতে রাজি। কিন্তু কোচদের এর অর্ধেক টাকা দিতেও যত আপত্তি। তার পরও লেগে আছি। ফুটবলের মানুষ আমি। কোচিং দিয়ে ফুটবলকে কিছু ফেরত দিতে চাই। প্রশ্ন : একেবারে শেষ প্রশ্ন। আপনাদের সময়ে ফুটবলার হওয়াটা ছিল বড় গর্বের বিষয়। এখন আর তা নেই। তার পরও আপনার ছেলেকে কি আপনি ফুটবলার বানাতে চাইবেন? জুয়েল রানা : আমার ছেলে জাবির আরহাম এই ডিসেম্বরে ৯ বছরে পড়বে। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কী চায়! ও যদি ফুটবলার হতে চায়, হবে। যদি ক্রিকেটার হতে চায়, হবে। যদি খেলাধুলাতেই থাকতে না চায়, থাকবে না। মোদ্দা কথা, ওর ইচ্ছার ওপরই আমি সব ছেড়ে দিচ্ছি। হ্যাঁ, ফুটবলার হলে এখন হয়তো আর আগের মত গর্ব-অহঙ্কার-তারকা খ্যাতিটা নেই। কিন্তু জুয়েল রানার ছেলেও ফুটবল খেলে- এমনটা শুনতে গর্বই হবে আমার।