প্রশ্ন : আপনার ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরু কিভাবে? ইমতিয়াজ সুলতান জনি : বুদ্ধি হওয়ার আগে থেকেই বোধহয় আমি ফুটবল খেলি। আরেকটা কারণ হলো এহেতেশাম ভাই, গোলরক্ষক পজিশনে খেলতেন। আমার খুব আগ্রহ তৈরি হয়। স্কুলে যাওয়া শুরু হওয়ার পর সিটি ক্লাবের মাঠে আমরা খেলতাম। তখনো সিটি ক্লাব হয়নি, ওই মাঠে পাড়ার ছেলেরা মিলে খেলতাম। ওখানে খেলা দেখে ফকিরেরপুল ক্লাব আমাদের কয়েকজন বন্ধুকে দ্বিতীয় বিভাগের দলে নেয়। ১৯৭৮ সালে আমি ফকিরেরপুলে খেলি, তখন কিন্তু আমি মিডফিল্ডার। জগন্নাথ কলেজের হয়ে শিক্ষাবোর্ডের খেলা, সেখানে খেলা দেখে আমাকে রহমতগঞ্জ অফার করে। তারপর ১৯৭৯ থেকে '৮১ সাল পর্যন্ত আমি রহমতগঞ্জে খেলি। ১৯৮২ সালে আমি আবাহনীতে যাই। প্রশ্ন : সহজেই আবাহনীতে যাওয়ার পথ তৈরি হয়ে গেল? জনি : আবাহনী আসলে আমাকে নিতে চেয়েছিল ১৯৮১ সালে। কারণ ওই বছর আমি জাতীয় যুবদলের ক্যাম্পে ডাক পাই, তবে ২২ জনের দলে থাকলেও মূল দলে আর সুযোগ পাইনি। তাই হয়তো আবাহনী ও মোহামেডান, বড় দুই দলই আমাকে খুব করে চেয়েছিল। কিন্তু তার আগে আমি রহমতগঞ্জে কথা দিয়ে ফেলি, তাই বড় দুই দলের কোনোটিতেই আমার যাওয়া হয়নি। প্রশ্ন : কিন্তু পরের বছর শেষপর্যন্ত আবাহনীকেই বেছে নেন... জনি : তখনকার ফুটবলে জনপ্রিয় দুই দল থেকে অফার পেয়েছি, ভাবতেই ভালো লাগছিল। ফুটবলারদের স্বপ্নই থাকত আবাহনী-মোহামেডানে খেলা। দুই দলের অফার থাকলেও আবাহনীর আগ্রহ অনেক বেশি ছিল। তা ছাড়া আবাহনীতে খেলার সুযোগটা আমার বেশি ছিল। মোহামেডানে তখন লেফট ব্যাকে স্বপন দা খেলেন, অত বড় ফুটবলারকে বাদ দিয়ে নিশ্চয় আমাকে খেলাবে না তারা। এটাও একটা বড় বিবেচনার বিষয় ছিল আমার জন্য। তা ছাড়া আবাহনীতে যাওয়া নিয়ে বিশাল কাহিনী হয়েছিল। প্রশ্ন : সেই গল্পটা যদি একটু বলতেন... জনি : আবাহনীর আগ্রহ এমন পর্যায়ে ছিল যে তারা পারলে ১৯৮১ সালেই আমাকে নিয়ে নেয়। মনে আছে হারুন ভাই (হারুনুর রশীদ) আর তান্না ভাই (তানভীর মাজহার তান্না) এমন প্রস্তাব দিয়েছিলেন, রহমতগঞ্জের ব্যাপারটা তাঁরা দেখবেন। আমি যে টাকা নিয়েছি, সেটা তাঁরা ফেরত দিয়ে দেবেন রহমতগঞ্জকে। কিন্তু আমি তাতে রাজি হইনি। এবার পরের বছর আবার হারুন ভাই মরিয়া হয়েছেন আমাকে আবাহনীতে নেওয়ার জন্য। হারুন ভাইয়ের বিয়ের বছর ছিল ওটা। দুই দিন বাদে তাঁর বিয়ে আর তিনি ছুটছেন আমার পেছনে। আমাকে বলে বসেন, 'তুমি আবাহনীতে গেলে মনে করব বিয়ের সেরা গিফট আমি পেয়েছি।' আবাহনী থেকে আগ্রহের মাত্রাটা এ পর্যায়ে ছিল, তাই আমার পক্ষে অন্য কিছু চিন্তা করার কোনো সুযোগই ছিল না। প্রশ্ন : আবাহনীর মতো বড় দলে খেলবেন, এটার জন্য মানসিক প্রস্তুতি কিংবা ওই সময় নিজের অনুভূতিটা কেমন ছিল? জনি : মানসিক প্রস্তুতি যদি বলেন, সেটা ১৯৮১ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল। সে বছরই বুঝেছিলাম, আগামী মৌসুমে বড় একটা দলে খেলব। তা ছাড়া রহমতগঞ্জে তিন বছর খেলার সুবাদে আবাহনী-মোহামেডানের বিপক্ষে অনেক ম্যাচ খেলে ফেলেছি। আরেকটা ব্যাপার হলো, আবাহনীতে সবাই আমাকে এত ভালোভাবে নিয়েছিলেন, আমার অস্বস্তির কোনো কারণ ছিল না। একটা ভয় ছিল, হারলে কিংবা ড্র করলে সমর্থকদের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না, তখনকার আবাহনী-মোহামেডানে খেলার অলিখিত শর্তই ছিল পয়েন্ট হারানো যাবে না। সম্ভবত আমিই সবচেয়ে কনিষ্ঠ খেলোয়াড় ছিলাম ১৯৮২ সালের দলে, তাই অন্যরা খুব সাহায্য করতেন। ওই দলের গোলরক্ষক মঈন, তারপর পাকির আলী, অশোকার সঙ্গে আমি ডিফেন্সে। মাঝমাঠে অমলেশ দা, খুরশীদ বাবুল ভাই, আশীষ, হেলাল আর ফরোয়ার্ডে সালাউদ্দিন ভাই, আনোয়ার ভাই, চুন্নু ভাই। সে বছর আমরা লিগ জিততে পারিনি, সম্ভবত ফেডারেশন কাপ জিতেছিলাম। প্রশ্ন : ১৯৮৩ সাল থেকে লিগ জেতা শুরু এবং তারপর হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হয়ে ঢাকা লিগে আবাহনী নতুন ইতিহাস গড়ে। সেই সময়ের দলের খেলা কেমন ছিল? জনি : ওই সময় আবাহনী দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে। দলটাকে শক্তিশালী করার জন্য প্রতিবছরই কিছু পরিবর্তন আসত বিভিন্ন পজিশনে। আমার ক্যারিয়ারটা দারুণ কেটেছে ওই সময়, ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত কোনো ম্যাচে আমাকে বসে থাকতে হয়নি। সম্ভবত প্রতিটি ম্যাচ পুরো ৯০ মিনিট খেলেছি আমি। আবাহনীতে খেলা এত উপভোগ করেছিলাম, সুস্থ ও ফিটনেস ধরে রাখার জন্য অনেক শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতাম নিজেকে। দলের খেলা বললে, এ দেশে তখন আবাহনী আধুনিক ফুটবলের প্রতীক। তবে ১৯৮২ সালে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলাম। লিগের ম্যাচ শেষ করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে এশিয়ান গেমসের ক্যাম্পে এসে ঘুমাচ্ছিলাম, পুলিশ এসে আমাদের থানায় নিয়ে গেল। ওখানে দেখলাম সালাউদ্দিন ভাই, আনোয়ার ভাই এসেছেন। তারপর তো ফুটবলের কলঙ্কের ইতিহাস। ওই বছরই আমার জাতীয় দলে খেলা শুরু। প্রশ্ন : ১৯৮৪ সালে কাজী সালাউদ্দিন খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর ১৯৮৫ সালে আবাহনী দলের দায়িত্ব নিয়েছেন কোচ হিসেবে। সেটা আবাহনীর হ্যাটট্রিক শিরোপার মৌসুম, তখন আপনি হয়েছেন আবাহনীর অধিনায়ক। কোচের চাওয়া মেনেই কি অধিনায়ক করা হয়েছিল আপনাকে? তা ছাড়া আগের বছর একসঙ্গে খেলা একজনকে কোচ হিসেবে মেনে নেওয়া কি কঠিন ছিল? জনি : সালাউদ্দিন ভাই চেয়েছিলেন কি না জানি না। তবে আবাহনীতে আমি অনেক কম বয়সে অধিনায়কত্ব পেয়েছিলাম, খুব সম্ভবত ১৯৮৪ সালের দলে আমার জুনিয়র ছিল শুধু এমিলি। আর সালাউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে খেললেও তিনি অনেক সিনিয়র ছিলেন। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি সহজভাবে মিশতেন, একটা সময় তাঁর সঙ্গে আমি রুম-পার্টনারও ছিলাম। এই সুবাদে তাঁর আন্তরিকতার ব্যাপারটা আমার জানা ছিল। তার পরও সিনিয়র হিসেবে তাঁর সঙ্গে একটা দূরত্ব সব সময় আমরা বজায় রাখতাম। সালাউদ্দিন ভাই কোচ হওয়ার পর সেই দূরত্বটা অন্য পর্যায়ে পৌঁছে গেল। কোচ-খেলোয়াড় সম্পর্ক। প্রশ্ন : ১৯৮৫ সালের লিগ শিরোপা জেতা খুব কঠিন ছিল আবাহনীর! জনি : প্রথম লেগে শেষ মোহামেডান থেকে আট পয়েন্ট দূরে আবাহনী। খুব হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম, আর বোধহয় হচ্ছে না হ্যাটট্রিক শিরোপা জেতা। জিততে হলে বাকি আট ম্যাচ জিততে হবে, সঙ্গে আবাহনীর প্রতিপক্ষ দলগুলোকেও পয়েন্ট হারাতে হবে। স্বাভাবিকভাবে সবাই খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। সেই হতাশায় এশিয়ান ক্লাব কাপ খেলতে দল শ্রীলঙ্কায় যাবে কি না, সে নিয়েও একটা দ্বিধা ছিল। পরে সিদ্ধান্ত হয় আমরা শ্রীলঙ্কা যাব এবং ওখানে গিয়ে দলটা হতাশা কাটিয়ে অনেক ইতিবাচক হয়। সঙ্গে পাওয়া গেল প্রেমলালকে, লঙ্কান ক্লাব দলে খেলা দেখেই ক্লাব কর্মকর্তারা এ স্ট্রাইকারকে পছন্দ করেন। কিন্তু আমার জন্য একটা দুঃসংবাদ ছিল, শ্রীলঙ্কায় থাকার সময় আমার আম্মা মারা যান। ফেরার পর মনটা তাই ভালো ছিল না, আমি কিছু দিন বিশ্রামে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওই শ্রীলঙ্কা সফরে দলটা যেন সতেজ হয়েছিল, সব কটি ম্যাচ জেতে আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায় অবিশ্বাস্যভাবে। প্রশ্ন : ব্রাদার্সের বিপক্ষে ম্যাচে তো আবাহনী হারতে হারতে জিতে যায়! জনি : খেলোয়াড়দের যেমন চেষ্টা ছিল, তেমনি বোধহয় ভাগ্যটা আমাদের পক্ষে ছিল। ব্রাদার্সের বিপক্ষে আমরা প্রথমার্ধে দুই গোল খেয়ে যাই, আরেকটি গোল হতে হতেও হয়নি। আবাহনী সমর্থকরাও হতাশ। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগের মিনিটে এফ আই কামাল একটি গোল ফিরিয়ে দিয়ে সবাইকে চাঙ্গা করে তোলে। দ্বিতীয়ার্ধে আরো দুই গোল করে ৩-২ গোলে ব্রাদার্সকে হারিয়ে হ্যাটট্রিক শিরোপার স্বাদ পায় আবাহনী। পরের বছর সুপার লিগে মোহামেডানের ম্যাচের আগে ভারত থেকে আনা হয়েছিল চিমা, মনোরঞ্জন ও ভাস্কর গাঙ্গুলীকে। কিন্তু আমরা দুই গোলে হেরে যাই। তারপর ১৯৮৭ সালে খেলা মোহামেডানের সঙ্গে ড্র করলেই আমরা চ্যাম্পিয়ন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুতে ৩-২ গোলে হেরে যাই। পরে সেই ম্যাচটা আর্মি স্টেডিয়ামে আবার হয়। ওই ম্যাচটা ছিল আবাহনীর হয়ে আমার শেষ ম্যাচ। প্রশ্ন : ১৯৮৮ সাল থেকে আপনি মোহামেডানে, আবাহনী ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন কি? জনি : দুটো ব্যাপার কাজ করেছিল তখন আমার মধ্যে। এক হলো মোহামেডানের কোচ নাসের হেজাজির আগ্রহ; আরেকটা হলো হঠাৎ করে আমার সম্পর্কে আবাহনীর নেতিবাচক ধারণা। আবাহনীতে থাকব, এ সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন আমি স্বাক্ষর করতে যাব, তখন একজন খেলোয়াড়ের মাধ্যমে আমি জানতে পারি ওই নেতিবাচক কথা। এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, 'জনির আর দেওয়ার কিছু নেই, নতুন লেফট ব্যাক আনতে হবে।' এটা শোনার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি মোহামেডানে চলে যাব। ওই বছর খেলোয়াড় ও কোচ হেজাজি মোহামেডানে যোগ দিয়েছেন। মোহামেডানের লেফট ব্যাক পজিশন দুর্বল হওয়ায় তিনি আমাকে খুব করে চান। তাঁর বোধহয় ধারণা ছিল, তিনি যেভাবে চান, আমি সেভাবে খেলতে পারব। প্রশ্ন : কিন্তু মোহামেডানে যাওয়ায় তো ভীষণ ঝুঁকি ছিল। তখন বড় দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও একটা ভাগ ছিল, যিনি যেখানে একবার নাম লিখিয়েছেন, সেই দলের ট্যাগ লেগে যেত তাঁর গায়ে। ছেড়ে গেলে তো পুরনো দলের সমর্থকদের রোষানলে পড়তে হতো। জনি : হ্যাঁ, এটাসহ অনেক কিছুই মাথায় ছিল। যেমন মোহামেডানে গিয়ে ঠিকঠাক পারফরম করতে পারব কি না, কারণ অনেকে গিয়ে মানিয়ে নিতে পারেনি। তখন আমার অবস্থা কী হবে, আবাহনী সমর্থকদের চাপ সহ্য করতে পারব কি না, এসব চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়েই আবাহনী ছেড়ে মোহামেডানে গিয়েছিলাম। শুধু আবাহনী সমর্থকরা নয়, আমার ঘরেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। আমার ভাগনেরা এক বছর আমার বাসায় আসেনি। সময়টা খুব কঠিন ছিল আমার জন্য। আবাহনী গ্যালারি থেকে দুয়ো ধ্বনি শুনেছি, কিন্তু মাঠে আমার পারফরম্যান্সের কোনো হেরফের হয়নি। তাতে সাদাকালো সমর্থকদের মন জয় করতে পেরেছিলাম। ১৯৮৮ সালের প্রথম টুর্নামেন্ট ফেডারেশন কাপের পারফরম্যান্স দেখে হেজাজি খুব খুশি হয়েছিলেন। আমারও সৌভাগ্য সে বছর মোহামেডানের হয়ে লিগের হ্যাটট্রিক শিরোপা জিতি। দুই জনপ্রিয় দলের হয়ে হ্যাট্রিক শিরোপা জেতা বিরল সম্মানের। প্রশ্ন : শেষ পর্যন্ত গায়ে মোহামেডানের ট্যাগই লেগে গেছে। খেলা শেষ করার পর সাদাকালোর কর্মকর্তাও হয়েছিলেন। জনি : আসলে ছোটবেলা থেকে আমি মোহামেডানের সমর্থক। তাই ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত খেলার পর আমি মোহামেডানের ম্যানেজার হয়েছিলাম। এক রকম মোহামেডানের ভালোমন্দের অংশীদার হয়ে গিয়েছিলাম। ছেড়ে আসার পর ওই বছর বেশ কিছু দিন পর আবাহনী ক্লাবেও গিয়েছিলাম। সামান্য একটু আড্ডা মেরেই চলে এসেছিলাম; আসলে অত মাখামাখির সুযোগ ছিল না, তার প্রভাব পড়ত মাঠে। প্রশ্ন : মোহামেডানে খেলার সময়ও আপনি একবার আবাহনী জার্সি গায়ে দিয়েছিলেন... জনি : সেটা ১৯৮৮ সালে। মোহামেডানের হয়ে রেজিস্ট্রেশন করে ফেলার পর আবাহনী আমাকে চেয়েছিল কলকাতায় আইএফএ শিল্ড খেলতে যাওয়ার সময়। মোহামেডানও অনুমতি দেয় এবং সেটাই আমার আকাশি-হলুদ জার্সিতে শেষ খেলা। একইভাবে আবাহনীতে খেলার সময় আমি মোহামেডানের জার্সি গায়ে খেলেছিলাম ভারতে ১৯৮২ সালে। তখনো আবাহনীর হয়ে কোনো ম্যাচ খেলা হয়নি, এর মধ্যে মোহামেডানের অনুরোধে ভারতে আশীষ-জব্বার টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিলাম। প্রশ্ন : আপনি দুই বড় দলেই খেলেছেন। তাদের খেলার পার্থক্যটাও নিশ্চয়ই আলাদা করতে পারেন। জনি : খেলার ধরন নির্ভর করে কোচের ওপর। আবাহনী চেষ্টা করত নতুন ধারার ফুটবল খেলতে, তাই ভাল বিদেশি কোচও আনত। যেমন আমার খুব মনে আছে, এক যুগোস্লাভিয়ান কোচের অধীনে আমাদের দলের চেহারা পাল্টে গিয়েছিল। ১৯৮৩ সালে নাবুম সাবাব নামের সেই কোচ এসেছিলেন, তিনি পুরো মৌসুম না থাকলেও তাঁর প্রাক মৌসুম ট্রেনিং ছিল দুর্দান্ত। তিন মাসের এই কঠিন ট্রেনিংটাই বোধহয় আমাদের দলটাকে দুই বছরের জন্য একটা প্রাণশক্তি দিয়ে গিয়েছিল, এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ধারণা। মোহামেডানে গিয়ে আমি পেয়েছি নাসের হেজাজি ও কায়কোবাদ ভাইকে। হেজাজি চাইতেন তাঁর গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে। অনেকেই জানেন না, ১৯৮৮ সালের লিগের হ্যাটট্রিক শিরোপার শেষ ম্যাচ আমাকে পাঁচটা ইঞ্জেকশন দিয়ে মাঠে নামিয়ে দিয়েছিলেন। ডান পায়ের নখে ইনফেকশন হয়েছিল, তাই বুট পরতে পারছিলাম না। কিন্তু ইঞ্জেকশন দিয়ে ওই আঙুলটা অবশ করে আমাকে মাঠে নামিয়েছিলেন। ম্যাচ ড্রয়ে আমরা শিরোপা জিতি; তারপর আমি মাঠ থেকে সোজা ক্লিনিকে গিয়ে নখের অপারেশন করি। ডাক্তারের সঙ্গে সেভাবেই আলাপ করে রেখেছিলেন কোচ। প্রশ্ন : আপনাদের সময়ের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলাপে ঘুরেফিরে শুধু ক্লাবের কথাই আসে। ক্লাবে সোনালি সময়ের গল্প হয়। কিন্তু জাতীয় দলে সেই খেলাটা রূপান্তর ঘটানো যায়নি কেন? জনি : আমি ৭০ দশকের খেলা দেখেছি, ৮০ দশক নিজে খেলেছি। আবাহনীর আন্তর্জাতিক ক্লাব পর্যায়ে অনেক ভালো ম্যাচ আছে। ১৯৮৩ সালে নেপালে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়েছিলাম, প্রতিপক্ষ একটি চায়নিজ দলসহ কয়েকটি বাইরের ক্লাব দল ছিল। ওখানে খুব ভালো ফুটবল খেলেছিলাম আমরা। তারপর মোহামেডানের হয়ে কাতারে ও পাহাংয়ে গিয়ে খেলেছি। ১৯৮৯ সালে পাহাংয়ে এশিয়ান ক্লাব কাপে মোহামেডান অসাধারণ ফুটবল খেলে ফাইনাল রাউন্ডে ওঠে। এ ছাড়া ভারতের দলগুলোর সঙ্গেও আমরা ভালো ফুটবল খেলেছি। এই পারফরম্যান্সটা জাতীয় দলে গিয়ে বজায় রাখা যায়নি, এটা সত্যি। তখনো জাতীয় দলে বিদেশি কোচের অধীনে কিন্তু একসঙ্গে প্র্যাকটিসের জন্য এত সময় পাওয়া যেত না। একটা দল বানিয়ে চলে যাওয়া হতো, এ দলটির দুর্বলতা ঢাকার জন্য কিংবা ফরমেশন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্র্যাকটিস ম্যাচেরও চল ছিল না। এসবই কারণ মনে হয়, নইলে প্রত্যেক পজিশনে সেরা ফুটবলাররাই খেলত তখন। ১৯৮৫ সালের সাফ গেমস দেখুন, আমরা খুব ভালো ফুটবল খেলে ফাইনালে টাইব্রেকারে হেরেছি। ১৯৮৪ সালে সাফ গেমসের প্রতিটি দলের বিপক্ষে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছি আমরা। প্রথম রাউন্ডে নেপালকে পাঁচ গোলে হারানোর পর আবার সেই নেপালের ম্যাচে খেলোয়াড়দের গাছাড়া ভাব ছিল; অর্থাৎ তাদের হারাতে হলে অত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে! পেশাদারির জায়গাটা আমাদের নড়বড়ে ছিল। আমার বিশ্লেষণে ওই সময়ের দলগুলো খুব ভালো ছিল কিন্তু শিরোপার জন্য পেশাদারি ও নিখুঁত-নির্ভুলভাবে টুর্নামেন্ট শেষ করার জন্য যে প্রস্তুতির দরকার সেটা হয়ে উঠত না। ছোটখাটো ভুলেই শেষ হয়ে যেত। আরেকটা বিষয়, বোধ হয় আমাদের সময় ক্লাব ফু্টবলের মান অনেক ওপরে ছিল এবং খেলোয়াড়রা সেটাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতেন। প্রশ্ন : আপনাদের পরের প্রজন্ম সাফ গেমস ফুটবল জেতে ১৯৯৯ সালে। এখনকার ফুটবল কেমন দেখছেন? জনি : এ জন্য তাদের অভিনন্দন। কিন্তু সমস্যা হলো, ওই শিরোপার ওপর ভর করে আমরা আরো নতুন কিছু জয়ের জন্য ছুটতে পারতাম। সেই পরিকল্পনা করা উচিত ছিল আমাদের। আমাদের সময় ফুটবলের রমরমা ছিল, এখন সে রকম দর্শক নেই; কিন্তু খেলা পিছিয়েছে আমি তা মনে করি না। ফুটবলটা হয়ে গেছে বিজ্ঞানের মতো, সময় তার সঙ্গে যোগ করে দিয়েছে নতুন অনেক কিছু। আধুনিক ফুটবলের এই যুগে আমাদের ছেলেরাও ভালো ফুটবল খেলছে; তবে সেটা যেভাবে এগোনো উচিত ছিল, সেভাবে এগোয়নি। আমাদের সময়কার ফুটবল ধরলে এখনকার মান আরো ওপরে থাকার কথা। সমস্যা হলো, গত ১৫ বছরে আমাদের খেলার কোনো ধারাবাহিকতা নেই। প্রশ্ন : আবার একটু আপনার খেলায় ফিরি। লেফট ব্যাক হিসেবে কাকে সামলাতে আপনার সবচেয়ে কষ্ট হয়েছে? জনি : ওয়াসিম ইকবাল। ব্রাদার্স হয়তো দল হিসেবে অত বড় না হলেও রাইট উইংয়ে ওয়াসিম সব সময় আমার জন্য ভাবনার বিষয় ছিল। তার মতো বুদ্ধিদীপ্ত খেলোয়াড় খুব কম ছিল, পায়ে কাজও ছিল। ওয়াসিম আমাকে পরাস্ত করে ক্রস করবে বা ডিফেন্সে ঢুকে যাবে, এটা তো আমার জন্য সুখকর নয়। তাই ব্রাদার্সের সঙ্গে ম্যাচের আগে আমি এ জন্য নিজেকে ভালোভাবে প্রস্তুত করার চেষ্টা করতাম। আবাহনীতে খেলার সময় সাব্বিরও কিছুটা ভুগিয়েছে। রাইট উইংয়ে এ দুজনই সেরা আমার চোখে। প্রশ্ন : ঢাকার ফুটবলে ডিফেন্ডারের ওভারল্যাপিং শুরু করেন মঞ্জু। তাঁর দেখাদেখি শফিউল আরেফিন টুটুল। তারপর আপনিও করতেন ওভারল্যাপ, তুলনায় একটু কম ছিল বলে কি তারকাখ্যাতিতে একটু পিছিয়ে আপনি? জনি : এটা ঠিক, মঞ্জুভাই শুরু করেছিলেন ওভারল্যাপিং। আমিও ওভারল্যাপ করে খেলেছি; কিন্তু যাঁরা শুরু করবেন স্বাভাবিকভাবে তাঁদের কথা মানুষ বেশি মনে রাখবে। আমার বিশ্লেষণে আমি চেষ্টা করতাম ভালো টিমম্যান হওয়ার, কোচের নির্দেশনা মেনে খেলার চেষ্টা করতাম বেশি। ভালো ডিফেন্ডিংটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেটা আমার মূল দায়িত্ব, তা ঠিকঠাক করার পর আমি ওভারল্যাপ করতাম। প্রশ্ন : কোচের নিদের্শনা মেনে খেলাটা আপনার কাছে মুখ্য ছিল। জানতে ইচ্ছা করে কোন কোচের অধীনে আপনার খেলার উন্নতি হয়েছে? জনি : দেশি-বিদেশি অনেক কোচের অধীনে খেলেছি, তাঁরা আমার কাছে যেটা চাইতেন, সেটা আমি দেওয়ার চেষ্টা করেছি সব সময়। আমার সৌভাগ্য, আমার ক্যারিয়ারের প্রত্যেক কোচের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক। শেখার কথা বললে রহিম ভাইয়ের (আবদুর রহিম) কাছে শিখেছি অনেক। ইন-স্টেপে কর্নার কিক নেওয়া শিখিয়েছেন তিনি। আমি খেলা শুরু করেছিলাম মিডফিল্ডার হিসেবে, ছয় নম্বর জার্সি আমার প্রিয় ছিল। রহমতগঞ্জে থাকাকালীন ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে ম্যাচে আমি মারাত্মক ইনজুরিতে পড়ি। তারপর থেকে তিনি আমাকে লেফট ব্যাক পজিশনে নিয়ে আসেন। এমনিতে আমি দুই পায়ের ফুটবলার; কিন্তু রহিম ভাই এরপর আমার বাঁ পায়ের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অনেক প্র্যাকটিস করিয়েছেন। ফুটবলের অনেক বেসিক বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করতেন। তারপর মোহামেডানে হেজাজির সঙ্গেও আমার দারুণ সময় কেটেছে, টিম প্ল্যান নিয়ে আলাপ করতেন তিনি আমার সঙ্গে। তেমনি সালাউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গেও আমার লম্বা সময় কেটেছে। খুব ভালো সময়। প্রশ্ন : আমরা শেষদিকে এসে গেছি। আপনার সময়ের একজন ফুটবলার সামাজিক সম্মান পেতেন অনেক বেশি... জনি : আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের আগে দু-চার দিন রাস্তায় বের হওয়া কঠিন ছিল। দলের সমর্থকরা রেজাল্ট কেমন হবে জিজ্ঞাসা করলে প্রতিপক্ষ সমর্থকরা টিপ্পনি কাটার চেষ্টা করেছে। অথচ এখনকার মতো এত মিডিয়া ছিল না, কিন্তু মানুষ ঠিকই চিনত আমাদের। সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে আবার আলাদা সম্মান। এখনো বিভিন্ন সরকারি অফিস-আদালতে গেলে ওই সম্মানটুকু পাই। আবার বিড়ম্বনাও আছে। একবার কোনো এক মেয়ের সঙ্গে আমাকে দেখা গেছে, এ রকম একটা গুজব পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর আমার অবস্থা কাহিল। চারদিকে নানা প্রশ্নের মুখে পড়ে যাই। এখন কষ্ট লাগে, এখনকার খেলোয়াড়দের জন্যও কষ্ট হয় তারা ফুটবলের ওই জীবনটা দেখেনি। ভালো খেললে মানুষই তারকা বানিয়ে নেবে, সেই দিন ফিরিয়ে আনবে। প্রশ্ন : ফুটবলে কোনো আক্ষেপ... জনি : না। ফুটবলার না হলে এক জীবনে এত কিছু পাওয়া হতো না। হাজার হাজার লোক আমার মতো গার্মেন্ট ব্যবসা করে; কিন্তু জনিকে অনেকেই চেনে ফুটবলের জন্য। ফুটবল অনেক দিয়েছে, তাই ফুটবলের উপকারে আমার প্রয়োজন হলে আমি আছি।