হাতে অস্ত্র নেই তবু তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ করেছেন ফুটবল, ব্যাট কিংবা বল দিয়ে। কেউ আবার সুইমিং পুলে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ১৬টি ম্যাচ খেলে মুক্তিযোদ্ধা ফান্ডে দান করেছিলেন সে সময়ের মূল্যবান ৫ লাখ রুপি। সাঁতারে অরুণ নন্দী আর ক্রিকেটে জুয়েলদের আত্মত্যাগও অতুলনীয়। বিজয় দিবসের ঠিক আগে সেই বীরত্বগাথাই জানাচ্ছেন রাহেনুর ইসলাম পুরো বাংলাদেশ তখন অগ্নিগিরি। লাভা বেরোচ্ছে। রাতের রাজপথ কারফিউ কাতর, দিনের রাজপথ জনতার বিক্ষোভ মিছিলের পদচ্ছাপগুলো ধারণ করবে বলে প্রতীক্ষমাণ। একদিকে সামরিক যান চলে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে জল্লাদের মতো ভঙ্গিতে অন্যদিকে আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসের মতো পথে নেমে আসে মানুষ। এই মিছিলে রাজনীতি না করেও যাওয়ার দোষ নেই; কিন্তু না গেলে দোষ ছিল। বাংলাদেশের (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) কিংবদন্তি অনেক খেলোয়াড়ও শামিল ছিলেন তাতে। অসীম সাহসী কেউ কেউ অস্ত্র হাতে নেমে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু যুদ্ধ কেবল অস্ত্র হাতেই নয়, করা যায় ফুটবল দিয়েও- বাংলার একদল দামাল সন্তান পুরো বিশ্বকে দেখিয়েছে সেটাই। 'স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল' গড়ে ফুটবলকে বানিয়েছে হাতিয়ার। তারই গর্জন এপার বাংলা ওপার বাংলা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো পৃথিবীতে। ১৯৭১ সালের ২৪ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতের মাটিতে ১৬টি ম্যাচ খেলেছে জাকারিয়া পিন্টুর দল। লক্ষ্য ছিল সবুজের পটে লাল সূর্যের ভেতরে সোনালি মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার স্বীকৃতি। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যম বাড়ানো, বিশ্বব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়া আর মুক্তিযোদ্ধা ফান্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহ। দেশের জন্য অবর্ণনীয় কষ্ট সয়ে সেটাই হাসিমুখে করে গেছেন ৩১ ফুটবলার। সফলও হয়েছেন শেষ পর্যন্ত। পাকিস্তানের মতো প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর রক্তচক্ষু এড়িয়ে আর রাজাকার, আলবদরদের ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিতও হয়েছে তাতে। '৭১-এর উত্তাল সেই দিনগুলোয় বাঙালি খেলোয়াড়রা শিকার হচ্ছিলেন নির্মমতার। হত্যা করা হয়েছিল পাকিস্তানের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন বাঙালি পোল ভোল্টার মিরাজসহ আরো অনেককে। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা আর দেশ স্বাধীন হলে তাঁদের প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবে সে সময় বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা উল্লেখ করে মুজিবনগরে যোগ দিতে বলা হয় ফুটবলারদের। এর উদ্যোক্তা ছিলেন মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, আলী ইমাম, এন এ চৌধুরীসহ (কালুভাই) আরো কয়েকজন। সেই চিঠির কথা জানতে পেরে জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ হাজরাসহ কয়েকজন খেলোয়াড় যোগ দেন মুজিবনগরে। এরপর আকাশবাণীতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গড়ার ঘোষণা প্রচার করা হলে দেশসেরা খেলোয়াড়দের পাশাপাশি আগ্রহী অনেকেই চলে আসেন মুজিবনগরে। সেখান থেকেই জাকারিয়া পিন্টুকে অধিনায়ক করে ৩১ জন ফুটবলার নিয়ে শুরু হয় অসীম সাহসী এক যুদ্ধের। সেই যুদ্ধের শুরুটা '৭১ সালের ২৪ জুলাই থেকে। সেদিন কৃষ্ণনগরের নদীয়া স্টেডিয়ামে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম ম্যাচ ছিল নদীয়া জেলা একাদশের বিপক্ষে। নদীয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থা ম্যাচের আগে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে অন্য একটি দেশের পতাকার পাশে নিজেদের দেশের সবুজের পটে লাল সূর্যের ভেতরে সোনালি মানচিত্র খচিত পতাকা প্রথমবার দেখতে ভেঙে আসে পুরো কুষ্টিয়া। স্টেডিয়ামে তখন বাংলাদেশিদেরই জয়জয়কার। তবে আপত্তি জানিয়ে বসেন নদীয়ার ডিসি দীপক কান্তি ঘোষ । কারণ ভারত তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে একজন ডিসিরও ক্ষমতা থাকে না আরেকটি দেশের পতাকা ওড়ানোর অনুমতি দেওয়ার। কিন্তু গ্যালারিতে ভাঙচুর শুরু হলে চাকরির ঝুঁকি নিয়েই অনুমতি দেন দীপক কান্তি ঘোষ। তবে মাত্র ১০ মিনিটের জন্য। অতঃপর এলো সেই গর্বের ক্ষণটি। অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর হাত ধরে রচিত হলো নতুন ইতিহাস। স্বাধীন একটি দেশের পতাকার পাশে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করা বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে সেদিনই প্রথম উড়ে পতপত করে। নদীয়া প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গগণবিদারী ধ্বনিতে। আবেগবিহ্বল অশ্রুসজল নয়নে স্বাধীন বাংলা দলের খেলোয়াড়রা চুমু দেন পতাকায়। গেয়ে উঠেন 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি'। পুরো স্টেডিয়াম পতাকা নিয়ে প্রদক্ষিণ করেন সবাই। জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা ধ্বনিতে প্রকম্পিত তখন নদীয়া, যা কাঁপিয়ে দিয়েছিল লাহোর-ইসলামাবাদকেও। যুদ্ধ শুধু বুলেটে নয়, ফুটবলেও হতে পারে- সেবারই প্রথম দেখল গোটা বিশ্ব। ঐতিহাসিক প্রথম ম্যাচটি নদীয়া জেলা একাদশের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। গোল দুটি করেছিলেন এনায়েতে ও শাহজাহান। তুমুল উন্মাদনার সেই ম্যাচ শেষে অবশ্য সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল নদীয়ার জেলা প্রশাসক দীপক ঘোষকে, সে সঙ্গে নদীয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থাকেও। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে উঠে যায় সেই নিষেধাজ্ঞা। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বিপক্ষে অন্যদের খেলা আটকাতে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দিয়ে বসে পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশন। জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ হাজরা, কাজী সালাউদ্দীনরা থেমে যাননি তার পরও। ফিফা ও ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের বাধ্যবাধকতায় কলকাতার ঐতিহ্যবাহী দল মোহনবাগান খেলে তাদের খ্যাতনামা খেলোয়াড় গোস্টপালের নামে একাদশ গড়ে। অন্য দলগুলোও বেছে নেয় এই কৌশল। এমনকি খোদ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলও খেলে 'বাংলাদেশ ইলেভেন' নামে। সে সঙ্গে নাম বদলে খেলেন দলের তারকা কয়েকজন খেলোয়াড়ও। কেননা স্বাধীন বাংলা দলে খেলা ফুটবলারদের আত্মীয়দের যথেষ্ট হেনস্তা হতে হচ্ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে। অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর বাবাকে তো ধরেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গুলি করে মারতে। পাকিস্তানি বাহিনীর একজন ডাক্তারের দয়ায় সেবার রক্ষা পান পিন্টুর বাবা। তাই বাফুফে ও সাফের বর্তমান প্রেসিডেন্ট কাজী সালাউদ্দীন খেলেছিলেন তূর্য হাজরা নামে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল সব মিলিয়ে ১৬ ম্যাচ খেলেছিল ভারতে। জয় ১২টিতে, ড্র একটিতে আর হারতে হয়েছিল তিন ম্যাচ। হার-জয় মুখ্য নয়, ফুটবল নিয়ে যুদ্ধটাই ছিল আসল। অমানুষিক পরিশ্রমে সেটাই করে গেছেন ফুটবলাররা। ভারতের এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে কখনো ট্রেনে ভ্রমণ করতে হয়েছে টানা ৪২ ঘণ্টা। বাস ও ট্রেন ভ্রমণ ফ্রি হলেও থাকতে হতো তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রী হয়ে। ট্রেনে সমাদর না মিললেও ভারতের যে শহরেই গেছেন জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ হাজরারা সেখানেই পেয়েছেন উষ্ণ অভ্যর্থনা। ভারতীয়রা অবাক বিস্ময়ে চেয়ে দেখেছে স্বাধীনতার জন্য ইস্পাত কঠিন ফুটবলারদের মুখগুলো। শ্রদ্ধায় ঝুঁকেও পড়েছে সবাই। দিলীপ কুমার, উত্তম কুমার, সায়রা বানু, শর্মিলী ঠাকুর, মনসুর আলী খান পাতৌদিরা দিয়ে গেছেন উৎসাহ। পাতৌদি মহারাষ্ট্রের অধিনায়ক হয়ে একটি ম্যাচ খেলেছেন স্বাধীন বাংলা দলের বিপক্ষে। ম্যাচে অসাধারণ একটি গোলও ছিল ভারতের সাবেক এই ক্রিকেট অধিনায়কের। এরপর স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে তিনি অনুদান দেন ২০ হাজার রুপি। এ ছাড়া জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা দিলীপ কুমার অনুদান দিয়েছিলেন ৩০ হাজার রুপি। সব মিলিয়ে ১৬ ম্যাচ খেলে পাঁচ লাখ রুপি আয় করেছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল, যার পুরোটাই দান করা হয় একপ্রকার শূন্য থাকা মুক্তিযোদ্ধা ফান্ডে। বলে রাখা ভালো, সে সময়ের পাঁচ লাখ রুপি এখনকার চার-পাঁচ কোটি টাকার কম হবে না কোনোভাবে। ফুটবল নিয়ে যুদ্ধের ১৬ ম্যাচের একটিতে সিওয়ানে অন্য রকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল জাকারিয়া পিন্টুর দলের। বাংলাদেশে অনেক বিহারি মারা হচ্ছে এই অভিযোগে প্রথমে খেলতেই চায়নি সিওয়ানের বিহারিরা। পরে রাজি হলেও শর্ত জুড়ে দেয় ম্যাচটি ড্র রাখার। সে সঙ্গে দাবি ছিল প্রথমে কোনো গোল যেন না করে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। 'অলিখিত চুক্তি'তে আপত্তি জানাননি পিন্টুরা। কিন্তু ম্যাচের শেষ দিকে মধ্য মাঠ থেকে নেওয়া কাজী সালাউদ্দীনের একটি শট জড়িয়ে যায় সিওয়ান একাদশের জালে! আর যায় কোথায়? দর্শকরা সবাই তেড়ে আসে খেলোয়াড়দের দিকে। প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিকে পেরেছে দিয়েছে দৌড়! পরে স্থানীয় পুলিশ উদ্ধার করে নিয়ে যায় ফুটবলারদের। এমন নানা অভিজ্ঞতায় ১৬ ম্যাচ খেলার পর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার খবর শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি কেউই। ফুটবল নিয়ে যুদ্ধ করে একটি দেশের স্বাধীনতায় এভাবে অবদান রাখতে পারার গর্বে গর্বিত সবাই। সেই দলের অনেকে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আলী ইমাম, ননী বসাক, লুৎফর রহমান, লালু, মাহমুদ তাঁদের অন্যতম। প্রবাসে থাকছেন এনায়েত, শাহজাহান, সাইদুর, অনিরুদ্ধ, নিহার ও গোবিন্দ কুণ্ডু। সেই দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু এখন আরডিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান, ম্যানেজার তানভির মাজহার তান্না ঢাকা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, তারকা খেলোয়াড় কাজী সালাউদ্দীন বাফুফে ও সাফ সভাপতি। তবে সংসারের চাকা ঘুরে না এমন খেলোয়াড়ের সংখ্যাও কম নয়। তাঁদেরই একজন (তাঁর সম্মানের কথা ভেবে নাম প্রকাশ করা হলো না) কাজ করছেন দেশের একটি স্বনামধন্য কম্পানির সিকিউরিটি বিভাগে। এক খেলোয়াড় মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবার পাচ্ছে না সরকারের দেওয়া মাসিক তিন হাজার টাকা ভাতা। এই তিন হাজার টাকা ভাতাতেই আবার সংসার চলছে অনেকের। তবে সেটা দেওয়া হচ্ছে ছয় মাস পর পর! সংসারের চাকা না ঘুরলেও দেশের হয়ে যুদ্ধ করার যে সম্মান সেটা বুকে ধারণ করেই বেঁচে আছেন তাঁরা। বাফুফের পুরনো ভবনে তাঁদের ছবি না দেখে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাস মুন্সী একবার বলেছিলেন, 'আমাদের দেশে হলে ভাস্কর্য থাকত স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের।' কিন্তু এই দেশটা বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও তাই এখনো 'স্বাধীনতা পুরস্কার'ই পাওয়া হয়নি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের! স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল : জাকারিয়া পিন্টু (অধিনায়ক), প্রতাপ শংকর হাজরা (সহ-অধিনায়ক), আলী ইমাম, মোহাম্মদ কায়কোবাদ, অমলেশ সেন, আইনুল হক, শেখ আশরাফ আলী, বিমল কর, শাহজাহান আলম, মনসুর আলী লালু, কাজী সালাউদ্দীন, এনায়েতুর রহমান, কে এম নওশেরুজ্জামান, সুভাষ সাহা, ফজলে সাদাইন খোকন, আবুল হাকিম, তসলিমউদ্দিন শেখ, আমিনুল ইসলাম, আবদুল মমিন জোয়ারদার, মনিরুজ্জামান পেয়ারা, সাত্তার, প্রাণগোবিন্দ কুণ্ডু, মুজিবর রহমান, মেজর জেনারেল (অব.) খন্দকার নুরুন্নবী, লুৎফর রহমান, অনিরুদ্ধ চ্যাটার্জি, সনজিব কুমার দে, মাহমুদুর রশিদ, সাইদুর রহমান প্যাটেল, দেওয়ান মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন, নিহার কান্তি দাস।