সাক্ষাৎকার
হজ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরে সেবার মান বেড়েছে
- হজ ব্যবস্থাপনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন হয়েছে। ফলে যাত্রীসেবা এখন আরো সহজ, স্বচ্ছ ও নিরাপদ হয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্যালাক্সি বাংলাদেশ গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও সিইও আহমেদ ইউসুফ ওয়ালিদ। কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম রনি
হজ ও ওমরাহ আদায়ের পদ্ধতি (তামাত্তু হজ)

হজের কোরবানি কী ও কিভাবে

হজের একটি অন্যতম আমল হলো কোরবানি তথা পশু জবাই করা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন যে ব্যক্তি ওমরাহসহ হজ পালন করবে, তবে যে পশু সহজ হয়, তা জবাই করবে।’
(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৬)
তাই কিরান ও তামাত্তু হজ আদায়কারীদের ওপর তা পালন করা ওয়াজিব। যেহেতু তারা একই সফরে ওমরাহসহ হজ পালন করে থাকে। ইফরাদ হজ আদায়কারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, তবে করলে ভালো। (মানাসিকে মোল্লা আলি কারি, পৃষ্ঠা ৪৭৮)
যার সামর্থ্য আছে তার জন্য একাধিক কোরবানি করা উত্তম। হাদিস শরিফে হজের মধ্যে বেশি বেশি তালবিয়া পড়তে ও কোরবানি করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। তা ছাড়া নবীজি (সা.) বিদায় হজের সময় ১০০ উট কোরবানি করেছিলেন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৭১৮)
কোরবানির পশুর বিবরণ
ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর গুণাগুণ সম্পর্কে যেসব বিবরণ ও শর্ত আছে, হজের কোরবানির পশুর ক্ষেত্রেও সেসব শর্ত প্রযোজ্য। উট, গরু ও মহিষ দুই বছরের এবং বকরি, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে এক বছর বয়সী হতে হবে। আর পশুটি কোরবানি শুদ্ধ না হওয়ার মতো সব সংকট থেকে মুক্ত হতে হবে। উট, গরু ও মহিষের মধ্যে সর্বাধিক সাতজন অংশীদার থাকতে পারবে। (মানাসিক, পৃষ্ঠা ৪৭৮)
কোরবানির সময়
১০ জিলহজ সুবহে সাদিকের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় কোরবানি করলে কোরবানির ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে ১০ তারিখ বড় শয়তানকে পাথর মারার আগে কোরবানি করলে দম ওয়াজিব হবে। তাই বলা যায়, হাজিদের জন্য কোরবানির সময় শুরু হলো ১০ তারিখ বড় শয়তানকে পাথর মারার পর থেকে। কোরবানির পশু জবাই হওয়া নিশ্চিত হওয়ার পরেই কেবল হলক করে হালাল হতে পারবে, কোরবানির আগে হলক (মাথা মুণ্ডন) করে ফেললে কাফফারাস্বরূপ আরেকটি পশু জবাই করতে হবে। (মানাসিক, পৃষ্ঠা ২৬৩)
কোরবানির স্থান
হজের কোরবানির পশু ও কাফফারা তথা জরিমানার পশু হারামের সীমার মধ্যে জবাই করা আবশ্যক। হারামের বাইরে জবাই করলে কোরবানি ও কাফফারা কোনোটাই আদায় হবে না। হারামের যেকোনো স্থানেই কোরবানি করা যায়। মিনায় কোরবানি করা জরুরি নয়। (রদ্দুল মুহতার ২/৫৩২)
প্রবাসীদের নিয়ে সৌদির কঠোর বিধি-নিষেধ
১৮ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নুসুক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওমরাহ পারমিট ইস্যুও সাময়িকভাবে স্থগিত

হজ মৌসুম সামনে রেখে নতুন কড়াকড়ি বিধি-নিষেধ জারি করেছে সৌদি আরব সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল থেকে বৈধ অনুমতি ছাড়া কোনো প্রবাসী মক্কায় প্রবেশ করতে পারবেন না।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবারের হজ কার্যক্রম ‘অনুমতি ছাড়া হজ নয়’ নীতিতে পরিচালিত হবে। এর মূল লক্ষ্য হলো হাজিদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধু যাঁদের কাছে মক্কা থেকে ইস্যুকৃত বৈধ ইকামা, হজ পারমিট অথবা পবিত্র স্থানগুলোতে কাজের অনুমতি রয়েছে, তাঁরাই শহরে প্রবেশ করতে পারবেন। বৈধ অনুমতি না থাকলে প্রবেশপথের চেকপোস্ট থেকেই তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
এ ছাড়া ওমরাহ ভিসায় আসা বিদেশি যাত্রীদের জন্য আগামী ১৮ এপ্রিল সৌদি আরব ত্যাগের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৮ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নুসুক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওমরাহ পারমিট ইস্যুও সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। এই সিদ্ধান্ত সৌদি নাগরিক, প্রবাসী ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নাগরিক—সবার জন্য প্রযোজ্য হবে।
আরো জানানো হয়েছে, ১৮ এপ্রিলের পর হজ ভিসা ছাড়া অন্য কোনো ভিসাধারী মক্কায় প্রবেশ বা অবস্থান করতে পারবেন না। ডিজিটাল সেবা সহজ করতে আবশির ও মুকিম পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে হজ পারমিট নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবাইকে নতুন বিধি-নিষেধ কঠোরভাবে মেনে চলার আহবান জানিয়েছে এবং সতর্ক করে বলেছে, নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বছরের হজ ব্যবস্থাপনা আরো নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত করতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
হজ মৌসুম সামনে রেখে সৌদি সরকার অবৈধভাবে হজ পালন এবং এতে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হজের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক লাখ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই কড়াকড়ি কার্যকর থাকবে। মূল লক্ষ্য হলো পবিত্র নগরী মক্কা এবং এর আশপাশের এলাকায় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, বৈধ হজ পারমিট বা নির্ধারিত ভিজিট ভিসা ছাড়া মক্কায় প্রবেশের চেষ্টা করলে ২০ হাজার রিয়াল জরিমানা গুনতে হবে। অন্যদিকে যাঁরা অবৈধভাবে হজ পালনে সহায়তা করবেন, যেমন—ভিসা, পরিবহন বা আবাসনের ব্যবস্থা করে দেবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ এক লাখ রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। অপরাধের মাত্রা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই জরিমানার পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।
এ ছাড়া অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও আদালতকে দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাঁরা নিয়ম ভেঙে মক্কায় প্রবেশ করবেন বা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করবেন, তাঁদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। একই সঙ্গে তাঁদের ১০ বছরের জন্য সৌদিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হবে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ হজে লাখো মানুষের অংশগ্রহণ থাকে। তাই প্রতিবছরই নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় সৌদি সরকার। কর্তৃপক্ষ সব মুসল্লিকে নিয়ম মেনে হজ পালনের আহবান জানিয়েছে এবং কোনো অনিয়ম নজরে এলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে জানানোর অনুরোধ করেছে।
হজযাত্রীদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ইসলামী ব্যাংকের হজ প্রি-পেইড কার্ড

হজের প্রস্তুতিতে নানা আয়োজনের মধ্যে নগদ অর্থ বহন বা মুদ্রা বিনিময়ের ঝামেলা অনেক সময় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই দুশ্চিন্তা দূর করে কার্যকর সমাধান হিসেবে চালু হয়েছে ‘ইসলামী ব্যাংক হজ প্রি-পেইড কার্ড’। হজযাত্রীদের কার্ডটি পেতে আগে থেকে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকার প্রয়োজন নেই। তিন বছর মেয়াদি এই কার্ডে সর্বোচ্চ চার হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল (প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টাকা) পর্যন্ত জমা রাখা যায়, যা দিয়ে সৌদি আরবে সহজেই দৈনন্দিন লেনদেন করা যাবে।
কার্ডটির আবেদনপ্রক্রিয়াও খুব সহজ। নিকটস্থ ইসলামী ব্যাংকের শাখা থেকে একটি সার্ভিস রিকোয়েস্ট ফর্ম পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র—পাসপোর্ট, ভিসার কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র, দুই কপি ছবি, ঠিকানার প্রমাণপত্র এবং একটি সচল মোবাইল ফোন নম্বর জমা দিলেই কার্ডটি পাওয়া যায়। হজ প্রি-পেইড কার্ডে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক ডিজিটাল সেবার ছোঁয়া। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ‘লাব্বাইক’ অ্যাপে কার্ডটি সংযুক্ত করে অতি সহজেই গ্রাহকরা জানতে পারবেন ব্যালান্স ও লেনদেনের বিবরণ। এমনকি ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব অ্যাপ ‘সেলফিন’-এর মাধ্যমেও কার্ডের হালনাগাদ তথ্য থাকবে গ্রাহকের হাতের মুঠোয়, তবে এ ক্ষেত্রে সেলফিনে ব্যবহৃত সিমটি রোমিং সক্রিয় থাকতে হবে। সৌদি আরবে কেনাকাটার সময় পস মেশিনে পেমেন্ট করলে মাত্র ১ শতাংশ চার্জ প্রযোজ্য হবে, যা যেকোনো সাধারণ কার্ডের তুলনায় সাশ্রয়ী। আর জরুরি প্রয়োজনে এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলনেও গ্রাহকের খরচ হবে উত্তোলিত অর্থের ১ শতাংশের সঙ্গে এক ডলার।
নিরাপত্তার বিষয়েও রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। কার্ডটি হাতে পাওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে রওনা হওয়ার আগেই ইসলামী ব্যাংকের যেকোনো এটিএম বুথে গিয়ে চার সংখ্যার একটি গোপন পিন সেট করে নিতে হবে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এরই মধ্যে হজ প্রি-পেইড কার্ড হজযাত্রীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
