• ই-পেপার

হজযাত্রীদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ইসলামী ব্যাংকের হজ প্রি-পেইড কার্ড

হজ ও ওমরাহ আদায়ের পদ্ধতি (তামাত্তু হজ)

হজ ও ওমরাহ আদায়ের পদ্ধতি (তামাত্তু হজ)

হজের কোরবানি কী ও কিভাবে

মুফতি মাহমুদ হাসান
হজের কোরবানি কী ও কিভাবে

হজের একটি অন্যতম আমল হলো কোরবানি তথা পশু জবাই করা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, আর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন যে ব্যক্তি ওমরাহসহ হজ পালন করবে, তবে যে পশু সহজ হয়, তা জবাই করবে।

(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৬)

তাই কিরান ও তামাত্তু হজ আদায়কারীদের ওপর তা পালন করা ওয়াজিব। যেহেতু তারা একই সফরে ওমরাহসহ হজ পালন করে থাকে। ইফরাদ হজ আদায়কারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, তবে করলে ভালো। (মানাসিকে মোল্লা আলি কারি, পৃষ্ঠা ৪৭৮)

যার সামর্থ্য আছে তার জন্য একাধিক কোরবানি করা উত্তম। হাদিস শরিফে হজের মধ্যে বেশি বেশি তালবিয়া পড়তে ও কোরবানি করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। তা ছাড়া নবীজি (সা.) বিদায় হজের সময় ১০০ উট কোরবানি করেছিলেন।

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৭১৮)

কোরবানির পশুর বিবরণ

ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর গুণাগুণ সম্পর্কে যেসব বিবরণ ও শর্ত আছে, হজের কোরবানির পশুর ক্ষেত্রেও সেসব শর্ত প্রযোজ্য। উট, গরু ও মহিষ দুই বছরের এবং বকরি, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে এক বছর বয়সী হতে হবে। আর পশুটি কোরবানি শুদ্ধ না হওয়ার মতো সব সংকট থেকে মুক্ত হতে হবে। উট, গরু ও মহিষের মধ্যে সর্বাধিক সাতজন অংশীদার থাকতে পারবে। (মানাসিক, পৃষ্ঠা ৪৭৮)

কোরবানির সময়

১০ জিলহজ সুবহে সাদিকের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় কোরবানি করলে কোরবানির ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে ১০ তারিখ বড় শয়তানকে পাথর মারার আগে কোরবানি করলে দম ওয়াজিব হবে। তাই বলা যায়, হাজিদের জন্য কোরবানির সময় শুরু হলো ১০ তারিখ বড় শয়তানকে পাথর মারার পর থেকে। কোরবানির পশু জবাই হওয়া নিশ্চিত হওয়ার পরেই কেবল হলক করে হালাল হতে পারবে, কোরবানির আগে হলক (মাথা মুণ্ডন) করে ফেললে কাফফারাস্বরূপ আরেকটি পশু জবাই করতে হবে। (মানাসিক, পৃষ্ঠা ২৬৩)

কোরবানির স্থান

হজের কোরবানির পশু ও কাফফারা তথা জরিমানার পশু হারামের সীমার মধ্যে জবাই করা আবশ্যক। হারামের বাইরে জবাই করলে কোরবানি ও কাফফারা কোনোটাই আদায় হবে না। হারামের যেকোনো স্থানেই কোরবানি করা যায়। মিনায় কোরবানি করা জরুরি নয়। (রদ্দুল মুহতার ২/৫৩২)

প্রবাসীদের নিয়ে সৌদির কঠোর বিধি-নিষেধ

১৮ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নুসুক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওমরাহ পারমিট ইস্যুও সাময়িকভাবে স্থগিত

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রবাসীদের নিয়ে সৌদির কঠোর বিধি-নিষেধ

হজ মৌসুম সামনে রেখে নতুন কড়াকড়ি বিধি-নিষেধ জারি করেছে সৌদি আরব সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল থেকে বৈধ অনুমতি ছাড়া কোনো প্রবাসী মক্কায় প্রবেশ করতে পারবেন না।

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবারের হজ কার্যক্রম অনুমতি ছাড়া হজ নয় নীতিতে পরিচালিত হবে। এর মূল লক্ষ্য হলো হাজিদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধু যাঁদের কাছে মক্কা থেকে ইস্যুকৃত বৈধ ইকামা, হজ পারমিট অথবা পবিত্র স্থানগুলোতে কাজের অনুমতি রয়েছে, তাঁরাই শহরে প্রবেশ করতে পারবেন। বৈধ অনুমতি না থাকলে প্রবেশপথের চেকপোস্ট থেকেই তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

এ ছাড়া ওমরাহ ভিসায় আসা বিদেশি যাত্রীদের জন্য আগামী ১৮ এপ্রিল সৌদি আরব ত্যাগের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৮ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নুসুক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওমরাহ পারমিট ইস্যুও সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। এই সিদ্ধান্ত সৌদি নাগরিক, প্রবাসী ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নাগরিকসবার জন্য প্রযোজ্য হবে।

আরো জানানো হয়েছে, ১৮ এপ্রিলের পর হজ ভিসা ছাড়া অন্য কোনো ভিসাধারী মক্কায় প্রবেশ বা অবস্থান করতে পারবেন না। ডিজিটাল সেবা সহজ করতে আবশির ও মুকিম পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে হজ পারমিট নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবাইকে নতুন বিধি-নিষেধ কঠোরভাবে মেনে চলার আহবান জানিয়েছে এবং সতর্ক করে বলেছে, নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বছরের হজ ব্যবস্থাপনা আরো নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত করতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

হজ মৌসুম সামনে রেখে সৌদি সরকার অবৈধভাবে হজ পালন এবং এতে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হজের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক লাখ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই কড়াকড়ি কার্যকর থাকবে। মূল লক্ষ্য হলো পবিত্র নগরী মক্কা এবং এর আশপাশের এলাকায় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, বৈধ হজ পারমিট বা নির্ধারিত ভিজিট ভিসা ছাড়া মক্কায় প্রবেশের চেষ্টা করলে ২০ হাজার রিয়াল জরিমানা গুনতে হবে। অন্যদিকে যাঁরা অবৈধভাবে হজ পালনে সহায়তা করবেন, যেমনভিসা, পরিবহন বা আবাসনের ব্যবস্থা করে দেবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ এক লাখ রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। অপরাধের মাত্রা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই জরিমানার পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।

এ ছাড়া অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতাও আদালতকে দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাঁরা নিয়ম ভেঙে মক্কায় প্রবেশ করবেন বা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করবেন, তাঁদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। একই সঙ্গে তাঁদের ১০ বছরের জন্য সৌদিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হবে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ হজে লাখো মানুষের অংশগ্রহণ থাকে। তাই প্রতিবছরই নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় সৌদি সরকার। কর্তৃপক্ষ সব মুসল্লিকে নিয়ম মেনে হজ পালনের আহবান জানিয়েছে এবং কোনো অনিয়ম নজরে এলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে জানানোর অনুরোধ করেছে।

যেসব কাজ হজের মহিমা ক্ষুণ্ন করে

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
যেসব কাজ হজের মহিমা ক্ষুণ্ন করে

একজন হাজি সাহেবের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো হজের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁর সারা জীবনের গুনাহ মাফ করে দেন। তবে শর্ত হলো, হজের মহিমা ক্ষুণ্ন হয়, এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, হজের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে। যে ব্যক্তি সেসব মাসে (ইহরাম বেঁধে) নিজের ওপর হজ অবধারিত করে নেয়, সে হজের সময়ে কোনো অশ্লীলতায় লিপ্ত হবে না, কোনো গুনাহ করবে না এবং ঝগড়াও নয়। তোমরা যা কিছু সৎকর্ম করবে আল্লাহ তা জানেন। আর (হজের সফরে) পথ খরচ সঙ্গে নিয়ো। বস্তুত তাকওয়াই উত্কৃষ্ট অবলম্বন। আর হে বুদ্ধিমানরা! তোমরা আমাকে ভয় করে চলো। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৭)

উল্লিখিত আয়াতে হজের মহিমা ক্ষুণ্ন হয়, এমন কাজগুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। নিচে সেগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো :

রাফাস (অশ্লীলতা) থেকে মুক্ত থাকা : হজের ইহরাম বেঁধে ফেলার পর যেসব কাজ নিষিদ্ধ, তার মধ্যে একটি হলো অশ্লীলতায় জড়ানো। সাধারণত হাজি সাহেবরা দৃশ্যমান কোনো অশ্লীলতায় না জড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছু কাজ তাঁদের অনেককে সূক্ষ্মভাবে অশ্লীলতায় লিপ্ত করে ফেলে, তা তাঁরা হয়তো অনুভবও করেন না। যেমনহজের ইহরাম অবস্থায় স্মার্টফোন, ট্যাব অতিরিক্ত ব্যবহার করলে কোনো না কোনো সময় এমন কিছু দেখে বসে, যা দেখা তাঁর জন্য হারাম ছিল, যাতে অশ্লীলতা ছিল। অথবা অডিও/ভিডিও কলে তাঁর পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের অজান্তে এমন শব্দ প্রয়োগ করে বসলেন, যে শব্দ ইহরাম অবস্থায় ব্যবহার করার সুযোগ নেই। অথচ হজ আল্লাহর গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য এসব কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি ছিল।

ফুসুক (পাপাচার) থেকে মুক্ত থাকা : পাপাচার অনেক রকম হতে পারে। তবে এখানে শুধু সেগুলোই তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো, যেগুলো হজের সফরে মানুষ নিজের অজান্তে করে বসে।

নজরের হেফাজত করা : হাজি সাহেবদের জন্য হজের মহিমা রক্ষা করার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি তৈরি হয় নজরের হেফাজত দিয়ে। প্রতিটি মুসলমানের জন্য সর্বাবস্থায়ই নজরের হেফাজত করা ফরজ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০-৩১), যা ভঙ্গ করা কবিরা গুনাহের শামিল। অথচ হাজি সাহেব বিমানবন্দরের রিসেপশন থেকে শুরু করে উড়োজাহাজযোগে সৌদি আরব পৌঁছা এবং সেখানকার বিমানবন্দর পার হওয়া পর্যন্ত পদে পদে তাঁর সামনে এমন সব মানুষ থাকবে, যাদের দিকে তাকানো তাঁর জন্য হারাম ছিল। মুমিনের উচিত, এই কঠিন মুহূর্তগুলোয় আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং বেশি বেশি ইস্তেগফার করতে থাকা।

গিবত থেকে বেঁচে থাকা :  হজের সফরেও অনেক সময় মানুষ তাদের চিরাচরিত অভ্যাস থেকে বের হতে পারে না, ফলে সেখানে গিয়েও নিজের অজান্তেই মাঝেমধ্যে এজেন্সি, সহযাত্রী ইত্যাদির বিরুদ্ধে অহেতুক গিবতে লিপ্ত হয়। অথচ গিবত ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্য গুনাহ। (তাবরানি)

অহংকার না করা : এই সফরে কথায়, কাজে বা আচরণে এমন কিছু করা উচিত নয়, যা অহংকারের পর্যায়ে চলে গিয়ে এই ইবাদতের মহিমা নষ্ট করে দেবে। কেননা মহান আল্লাহ অহংকারীকে ভালোবাসেন না।

(সুরা : নাহল, আয়াত : ২৩)

সময় নষ্ট না করা : হজের সফরে প্রতিটি মুহূর্তই জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, তাই একটি মুহূর্তও যেন অনর্থক না কাটে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। পবিত্র কোরআনে সফল মুমিনদের গুণাবলি সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা অসার ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে।

(সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৩)

লোক-দেখানো ইবাদত থেকে বিরত থাকা : অনেকে আবেগ সামলাতে না পেরে সেখানে এত বেশি ফটো সেশন করে, যা উপস্থিত হাজি সাহেবদেরও বিরক্তের কারণ হয়। তাই হজের সফরে কারণ ছাড়া এসব কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।

ঝগড়া থেকে দূরে থাকা : হজের সফরে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। তাই সেখানে অহেতুক তর্কবিতর্ক, অমূলক অভিযোগ, অসহিষ্ণুতা থেকে বিরত থাকতে হবে।

প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে যাওয়া : অনেক দেশের মানুষকে দেখা যায়, হজে গিয়ে ভিক্ষা করে, এটা কোনোভাবেই উচিত নয়।

তাকওয়া অবলম্বন : এককথায় বলতে গেলে হজের সফরে সর্বোচ্চ তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে। কারণ মহান আল্লাহ প্রত্যেকের মনের অবস্থা জানেন, যার তাকওয়া যত উন্নত হবে, তার হজও তত গ্রহণযোগ্য হবে।

মহান আল্লাহ সবাইকে হজে মাবরুর নসিব করুন। আমিন।

হজযাত্রীদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ইসলামী ব্যাংকের হজ প্রি-পেইড কার্ড | কালের কণ্ঠ