• ই-পেপার

ইসলামী অর্থনীতির সুফল

প্রশ্ন-উত্তর

সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

প্রশ্ন-উত্তর

লেবার চার্জ আলাদা নেওয়ার বিধান

প্রশ্ন : আমাদের এলাকায় কিছু টাইলসের দোকান আছে, যেখানে দোকানদাররা কাস্টমার থেকে প্রতি টাইলসের কার্টনে লেবার চার্জ হিসাবে পাঁচ টাকা গ্রহণ করে; কিন্তু তারা লেবারকে সব সময় ওই পরিমাণ টাকা দেয় না, কখনো লেবার খরচ পাঁচ টাকার কম হয়, আবার কখনো পাঁচ টাকার বেশি হয়। এখন জানার বিষয় হলো, বিক্রেতা ক্রেতা থেকে লেবার চার্জ গড় হিসাবে প্রতি কার্টনে পাঁচ টাকা নিতে পারবে কি না?

আসিফ চৌধুরী, মিরপুর

 

উত্তর : হ্যাঁ, প্রশ্নে বর্ণিত বিক্রেতা তার ক্রেতা থেকে লেবার চার্জ গড় হিসাবে প্রতি কার্টনে পাঁচ টাকা নিতে পারবে। (আদ্দুররুল মুখতার : ১৮/৬, আলফিকহুল হানফি : ৩৬২/৪)

 

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব ১১৫৭

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

‘তাদের আগে যে জিন ও মানব সম্প্রদায় গত হয়েছে তাদের মতো তাদের প্রতিও আল্লাহর উক্তি সত্য হয়েছে। এরাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। প্রত্যেকের মর্যাদা তার কর্মানুযায়ী, এটা এ জন্য যে আল্লাহ প্রত্যেকের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেবেন এবং তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না। যেদিন অবিশ্বাসীদের জাহান্নামের সন্নিকটে উপস্থিত করা হবে, সেদিন তাদের বলা হবে, তোমরা তোমাদের পার্থিব জীবনেই সুখ-সম্ভার পেয়েছ এবং সেগুলো উপভোগও করেছ। সুতরাং আজ তোমাদের দেওয়া হবে অবমাননাকর শাস্তি।...’ (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ১৮-২০)

আয়াতগুলোতে পার্থিব জীবনে অবিশ্বাসীদের জৌলুস দানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

 

শিক্ষা ও বিধান

১. আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয়, জিনরা মানুষের মতো শরিয়তের নির্দেশপ্রাপ্ত। তাদের ভেতরও বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী আছে।

২. আয়াতে ইঙ্গিত মেলে, অতীতে জিনদের কোনো কোনো সম্প্রদায় অবাধ্য হওয়ার কারণে আল্লাহর শাস্তি পেয়েছে।

৩. পার্থিব জীবনে মুসলমানদের তুলনায় অবিশ্বাসীরা অধিক সম্পদ ও জৌলুসের অধিকারী হবে। পরকালে তাদের অবস্থা হবে বিপরীত। 

৪. আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, মাসের পর মাস যেত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবারে চুলার আগুনও জ্বলত না (অর্থাৎ রান্নার মতো খাবার থাকত না)।

৫. কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসীদের লাঞ্ছনাকর শাস্তি দেওয়া হবে। কেননা তারা দুনিয়াতে উন্নত জীবনোপকরণ নিয়ে অহংকার করত। (তাফসিরে শারভি, পৃষ্ঠা-১৪২১৪)

মালয়েশিয়ায় ‘ইসলামিক ইয়ার’ পুরস্কারে ভূষিত হলেন ড. আহমেদ আল-রায়সুনি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মালয়েশিয়ায় ‘ইসলামিক ইয়ার’ পুরস্কারে ভূষিত হলেন ড. আহমেদ আল-রায়সুনি

ইসলামী জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরক্কোর প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ ড. আহমেদ আল-রায়সুনিকে ১৪৪৮ হিজরি ইসলামিক ইয়ার পুরস্কারে সম্মানিত করেছে মালয়েশিয়া। ইসলামী নববর্ষ উপলক্ষে প্রদত্ত এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা ড. আল-রায়সুনির বর্ণাঢ্য পাণ্ডিত্যপূর্ণ জীবনের এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইসলামী আইনশাস্ত্র, মাকাসিদুশ শরিয়াহ (ইসলামী আইনের উদ্দেশ্য), ইসলামী চিন্তার নবায়ন এবং সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গবেষণা, লেখালেখি ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

খ্যাতিমান এই আলেম তাঁর অসংখ্য গ্রন্থ, গবেষণাপত্র, বক্তৃতা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমকালীন ইসলামী চিন্তাধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন, বিশেষ করে মাকাসিদভিত্তিক ইসলামী আইনচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

মালয়েশিয়ার ইসলামিক ইয়ার পুরস্কার দেশটির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। প্রতিবছর ইসলামী নববর্ষ উপলক্ষে এমন ব্যক্তিত্বদের এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়, যাঁরা ইসলাম, মুসলিম সমাজ এবং মানবকল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন; একই সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর হিজরতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা, ত্যাগ, নেতৃত্ব ও সভ্যতার মূল্যবোধকে সমাজে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এই সম্মাননা উপলক্ষে আন্তর্জাতিক মুসলিম স্কলার ইউনিয়ন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ড. আল-রায়সুনির এই স্বীকৃতি জ্ঞান, গবেষণা এবং মুসলিম উম্মাহকে সঠিক পথনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে আলেমদের অপরিহার্য ভূমিকারও স্বীকৃতি। সম্মাননা অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মুসলিম আলেম ইউনিয়নের বর্তমান সভাপতি আলি মহিউদ্দিন আল-কারাদাঘি ড. আল-রায়সুনির হাতে একটি বিশেষ অভিনন্দনপত্র তুলে দেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে ড. আল-রায়সুনির দীর্ঘ জ্ঞানগর্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ইসলামী আইন, মাকাসিদুশ শরিয়াহ ও মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর অবদানকে যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করেন।

ড. আহমেদ আল-রায়সুনিকে প্রদত্ত এই সম্মাননা প্রমাণ করে যে ইসলামী বিশ্বের উন্নয়ন ও পুনর্জাগরণে জ্ঞান, গবেষণা এবং প্রজ্ঞার মূল্য আজও অপরিসীম। মালয়েশিয়ার এই উদ্যোগ শুধু একজন প্রখ্যাত আলেমকে সম্মানিত করেনি; বরং বিশ্বব্যাপী জ্ঞানচর্চা ও ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের গুরুত্বকেও নতুনভাবে তুলে ধরেছে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোয় আলোকিত এই সম্মাননা নিঃসন্দেহে মুসলিম বিশ্বের গবেষক, আলেম এবং চিন্তাবিদদের জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ক বার্তা হয়ে থাকবে।

মাপে কম দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ

মুফতি দিদার হোসাইন
মাপে কম দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ

মহান আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন। তবে শর্ত হলো ব্যবসা-বাণিজ্যে শতভাগ সততা ও আমানতদারিতা বজায় রাখতে হবে। যেসব সূক্ষ্ম কারণে ব্যবসার হালাল মুনাফা হারাম হয়ে যেতে পারে, তন্মধ্যে একটি হলো মাপে কম দেওয়া। এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা ওজনে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদেরকে মেপে বা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়।’

(সুরা : আল-মুতাফি্ফফিন, আয়াত : ১-৩)

মাপে কম দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে কোরআনে বর্ণিত আরবি ‘ওয়াইল’ শব্দটি কঠিন শাস্তি, ধ্বংস অথবা জাহান্নামের একটি উপত্যকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ওজনে কম দেওয়া কোনো সাধারণ পাপ নয়; বরং এটি মারাত্মক একটি কবিরা গুনাহ। মুমিন বান্দাদের এই গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ন্যায়ের সঙ্গে মাপ ও ওজন পূর্ণ করো।’

(সুরা : আন‘আম, আয়াত : ১৫২)

তিনি আরো বলেন, ‘যখন পরিমাপ পাত্র দ্বারা কাউকে কিছু মেপে দাও, তখন পরিপূর্ণ মাপে দিয়ো আর ওজন করার জন্য সঠিক দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করো। এ পন্থাই সঠিক এবং এরই পরিণাম উত্কৃষ্ট।’

(সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩৫)

মানুষকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার সময় মাপে কম দেওয়াও এক ধরনের জুলুম, বলা যায় পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টিকারী অন্যতম অপরাধ। এই অপরাধের ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে মহান আল্লাহর নবী শুআইব (আ.) তাঁর জাতিকে বারবার সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা পরিমাণ ও ওজন ন্যায়সংগতভাবে পূর্ণ করবে। মানুষকে তাদের দ্রব্যাদি কম দেবে না এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে বেড়াবে না।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮৫)

কিন্তু তারা সে নির্দেশ অমান্য করায় ভয়াবহ আজাবে ধ্বংস হয়েছিল।

(সুরা : হুদ, আয়াত : ৯৪-৯৫)

এই আয়াতগুলো দ্বারা বোঝা যায়, ওজনে কম দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় মারাত্মক পর্যায়ের অপরাধ। যখন একটি সমাজে প্রতারণা, মাপে-ওজনে কারচুপি এবং মানুষের হক নষ্ট করার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে বরকত উঠিয়ে নেন। ফলে দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘কোনো জাতি যখন মাপ ও ওজনে কম দিতে শুরু করে, তখন তাদের ওপর দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট এবং শাসকদের জুলুম চাপিয়ে দেওয়া হয়।’

(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)

অন্যদিকে সততা ও আমানতদারি ব্যবসার প্রাণ। যে ব্যবসায়ী লেনদেনে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত থাকে, সে শুধু মানুষের আস্থা অর্জন করে না; বরং আখিরাতে নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গ লাভের সুসংবাদ পায়।

(তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)

আধুনিক যুগের তাতফিফ

প্রকৃতপক্ষে ‘তাতফিফ’ শুধু দাঁড়িপাল্লায় কম দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং যেকোনো ব্যাপারে যেকোনো উপায়ে প্রাপককে প্রাপ্য থেকে কম দেওয়াও তাতফিফের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, গণনার মাধ্যমে কম দেওয়া, কর্মচারীর দায়িত্বে অবহেলা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি না দেওয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি করা, নিম্নমানের পণ্যকে উন্নতমানের বলে প্রচার করা, পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অন্যের পণ্যকে নিজের পণ্য বলে প্রচার করা, অন্যের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে গাফিলতি করা, চুক্তি অনুযায়ী কাজ বা সেবা প্রদান না করা, অনলাইনে পণ্যের ছবি ও বাস্তব পণ্যের মধ্যে ইচ্ছাকৃত অমিল রাখা, সরকারি বা বেসরকারি দায়িত্বে থেকে জনগণের অধিকার খর্ব করা—এগুলোও তাতফিফের অন্তর্ভুক্ত। (মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) কৃত, ৮/৬৯৪)

অনেকের মনে হতে পারে, আজকাল যারা এসব অপকর্মে লিপ্ত আছে, তারাই তো ভালো আছে। তাদের সম্পদ দিন দিন বাড়ছে। এর উত্তর হলো বাহ্যিক চোখে যেটাকে সাফল্য মনে হচ্ছে, আদতে সেটা মোটেও সাফল্য নয়। দুনিয়ার এই যিকঞ্চিৎ লাভ (!) তো আখিরাতের বিপুল প্রাপ্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সঙ্গে এটা দুনিয়াতেও বরবাদির এক বড় কারণ হচ্ছে।

এই পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকবে না, থাকতে পারবেও না। মৃত্যুর পর দাঁড়াতে হবে আল্লাহর সামনে। ইচ্ছাকৃতভাবে ওজনে অণু পরিমাণ কম দিলেও তার হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের প্রতারণা, জুলুম, মানুষের হক নষ্ট করা এবং ওজনে কম দেওয়া থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।