মহান আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন। তবে শর্ত হলো ব্যবসা-বাণিজ্যে শতভাগ সততা ও আমানতদারিতা বজায় রাখতে হবে। যেসব সূক্ষ্ম কারণে ব্যবসার হালাল মুনাফা হারাম হয়ে যেতে পারে, তন্মধ্যে একটি হলো মাপে কম দেওয়া। এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা ওজনে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদেরকে মেপে বা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়।’
(সুরা : আল-মুতাফি্ফফিন, আয়াত : ১-৩)
মাপে কম দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে কোরআনে বর্ণিত আরবি ‘ওয়াইল’ শব্দটি কঠিন শাস্তি, ধ্বংস অথবা জাহান্নামের একটি উপত্যকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ওজনে কম দেওয়া কোনো সাধারণ পাপ নয়; বরং এটি মারাত্মক একটি কবিরা গুনাহ। মুমিন বান্দাদের এই গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ন্যায়ের সঙ্গে মাপ ও ওজন পূর্ণ করো।’
(সুরা : আন‘আম, আয়াত : ১৫২)
তিনি আরো বলেন, ‘যখন পরিমাপ পাত্র দ্বারা কাউকে কিছু মেপে দাও, তখন পরিপূর্ণ মাপে দিয়ো আর ওজন করার জন্য সঠিক দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করো। এ পন্থাই সঠিক এবং এরই পরিণাম উত্কৃষ্ট।’
(সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩৫)
মানুষকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার সময় মাপে কম দেওয়াও এক ধরনের জুলুম, বলা যায় পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টিকারী অন্যতম অপরাধ। এই অপরাধের ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে মহান আল্লাহর নবী শুআইব (আ.) তাঁর জাতিকে বারবার সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা পরিমাণ ও ওজন ন্যায়সংগতভাবে পূর্ণ করবে। মানুষকে তাদের দ্রব্যাদি কম দেবে না এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে বেড়াবে না।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮৫)
কিন্তু তারা সে নির্দেশ অমান্য করায় ভয়াবহ আজাবে ধ্বংস হয়েছিল।
(সুরা : হুদ, আয়াত : ৯৪-৯৫)
এই আয়াতগুলো দ্বারা বোঝা যায়, ওজনে কম দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় মারাত্মক পর্যায়ের অপরাধ। যখন একটি সমাজে প্রতারণা, মাপে-ওজনে কারচুপি এবং মানুষের হক নষ্ট করার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে বরকত উঠিয়ে নেন। ফলে দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘কোনো জাতি যখন মাপ ও ওজনে কম দিতে শুরু করে, তখন তাদের ওপর দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট এবং শাসকদের জুলুম চাপিয়ে দেওয়া হয়।’
(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)
অন্যদিকে সততা ও আমানতদারি ব্যবসার প্রাণ। যে ব্যবসায়ী লেনদেনে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত থাকে, সে শুধু মানুষের আস্থা অর্জন করে না; বরং আখিরাতে নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গ লাভের সুসংবাদ পায়।
(তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)
আধুনিক যুগের তাতফিফ
প্রকৃতপক্ষে ‘তাতফিফ’ শুধু দাঁড়িপাল্লায় কম দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং যেকোনো ব্যাপারে যেকোনো উপায়ে প্রাপককে প্রাপ্য থেকে কম দেওয়াও তাতফিফের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, গণনার মাধ্যমে কম দেওয়া, কর্মচারীর দায়িত্বে অবহেলা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি না দেওয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি করা, নিম্নমানের পণ্যকে উন্নতমানের বলে প্রচার করা, পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অন্যের পণ্যকে নিজের পণ্য বলে প্রচার করা, অন্যের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে গাফিলতি করা, চুক্তি অনুযায়ী কাজ বা সেবা প্রদান না করা, অনলাইনে পণ্যের ছবি ও বাস্তব পণ্যের মধ্যে ইচ্ছাকৃত অমিল রাখা, সরকারি বা বেসরকারি দায়িত্বে থেকে জনগণের অধিকার খর্ব করা—এগুলোও তাতফিফের অন্তর্ভুক্ত। (মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) কৃত, ৮/৬৯৪)
অনেকের মনে হতে পারে, আজকাল যারা এসব অপকর্মে লিপ্ত আছে, তারাই তো ভালো আছে। তাদের সম্পদ দিন দিন বাড়ছে। এর উত্তর হলো বাহ্যিক চোখে যেটাকে সাফল্য মনে হচ্ছে, আদতে সেটা মোটেও সাফল্য নয়। দুনিয়ার এই যিকঞ্চিৎ লাভ (!) তো আখিরাতের বিপুল প্রাপ্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সঙ্গে এটা দুনিয়াতেও বরবাদির এক বড় কারণ হচ্ছে।
এই পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকবে না, থাকতে পারবেও না। মৃত্যুর পর দাঁড়াতে হবে আল্লাহর সামনে। ইচ্ছাকৃতভাবে ওজনে অণু পরিমাণ কম দিলেও তার হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের প্রতারণা, জুলুম, মানুষের হক নষ্ট করা এবং ওজনে কম দেওয়া থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।