kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

পোশাক পরিধানে ইসলামের নীতিমালা

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

১৮ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পোশাক পরিধানে ইসলামের নীতিমালা

মানুষের মৌলিক চাহিদার একটি হলো পোশাক। এটি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পোশাকে মানুষের ব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে তার ধর্মীয় মূল্যবোধও ফুটে ওঠে। পোশাকের সঙ্গে মানুষের বহু ইবাদতও জড়িয়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

পোশাকের শিষ্টাচার লঙ্ঘনের কারণে মানুষের ওপর জান্নাত হারাম হওয়ার ঘোষণাও এসেছে, তাই প্রতিটি মুমিনেরই পোশাকের শিষ্টাচারের ব্যাপারে সচেতন হওয়া আবশ্যক। নিম্নে পোশাকের কিছু শিষ্টাচার তুলে ধরা হলো—

ডান দিক থেকে পরিধান করা :  প্রতিটি উত্তম কাজই ডান দিক থেকে শুরু করা সুন্নত। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যখন পোশাক বা জুতা পরিধান করো এবং অজু করো, তখন ডান দিক থেকে শুরু করবে। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪১৪১)

দোয়া পড়া : পোশাক পরিধানের সময় নবীজির শেখানো দোয়াটি পড়লে গুনাহ মাফ হওয়ার সুসংবাদ রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কাপড় পরার সময় এ দোয়া পাঠ করবে তার আগে ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে; উচ্চারণ—‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি কাসানি হা-জাস সাওবা ওয়া রজাকনিহি মিন গাইরি হাওলিম মিন্নি ওয়ালা কুওয়াতিন। ’

অর্থ—‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমার কৌশল ও ক্ষমতা প্রয়োগ ছাড়াই আমাকে এ কাপড়ের ব্যবস্থা করে পরালেন। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০২৩)

সাদা পোশাককে প্রাধান্য দেওয়া : সামুরাহ বিন জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সাদা রঙের পোশাক পরিধান করো। কেননা তা অধিক পবিত্র ও উত্তম। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৫৬৭)

তবে নবীজি (সা.) মাঝেমধ্যে ভিন্ন রঙের পোশাকও পরিধান করেছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৬৫)

সামর্থ্যমতো উত্তম পোশাক পরিধান করা : পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি জিজ্ঞেস করো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব শোভনীয় বস্তু ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তা কে নিষিদ্ধ করেছে?’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩২)

হাদিস এসেছে, আবুল আহওয়াস (রহ.) থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি কম মূল্যের পোশাক পরে নবী (সা.)-এর কাছে এলে তিনি বলেন, তোমার ধন-সম্পদ আছে কি? তিনি বলেন, হ্যাঁ। ... তিনি (সা.) বলেন, যেহেতু আল্লাহ তোমাকে সম্পদশালী করেছেন, কাজেই আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহের নিদর্শন তোমার মাঝে প্রকাশিত হওয়া উচিত। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৬৩)

জুমা ও বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ পোশাক : বিশেষ অনুষ্ঠান, বিশেষ মেহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং জুমার দিনের জন্য ভালো পোশাক আলাদা রাখাও নবীজি (সা.)-এর সুন্নত। আমাদের নবীজি (সা.) কোনো প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এবং জুমার দিনে ভালো পোশাক পরতেন। আসমা (রা.)-এর মুক্তদাস আবদুল্লাহ (র.) থেকে বর্ণিত, আসমা (রা.) আমার সামনে একটি তায়ালিসি জুব্বা বের করলেন। তাতে এক বিঘৎ পরিমাণ এক টুকরা রেশমি কাপড় লাগানো ছিল, যা দ্বারা জুব্বার দুটি কিনারা মোড়ানো ছিল। তিনি বলেন, এটা রাসুল (সা.)-এর জুব্বা। তিনি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এবং জুমার দিন তা পরতেন। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৩৪৯)

পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা : পরিছন্নতা মুমিনের ভূষণ, তাই নবীজি (সা.) অপরিচ্ছন্নতা পছন্দ করতেন না। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, একদা রাসুল (সা.) আমাদের এখানে এসে এক বিক্ষিপ্ত চুলওয়ালাকে দেখে বলেন, লোকটি কি তার চুলগুলো আঁচড়ানোর জন্য কিছু পায় না? তিনি ময়লা কাপড় পরিহিত অপর ব্যক্তিকে দেখে বলেন, লোকটি কি তার কাপড় ধোয়ার জন্য কিছু পায় না? (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৬২)

ঢিলেঢালা পোশাক পরা : ইসলামে এমন পোশাক পরা নিন্দনীয়, যা পরার পরও মানুষের দেহাবয়ব ফুটে ওঠে। ইসলামে আঁটসাঁট পোশাক পরা থেকে বিরত থাকার নিদের্শ দেওয়া হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জাহান্নামবাসী দুই প্রকার মানুষ, আমি যাদের (এ পর্যন্ত) দেখিনি। একদল মানুষ, যাদের সঙ্গে গরুর লেজের মতো চাবুক থাকবে, তা দ্বারা তারা লোকজনকে মারবে এবং একদল স্ত্রী লোক, যারা কাপড় পরিহিত উলঙ্গ, যারা অন্যদের আকর্ষণকারিণী ও আকৃষ্টা, তাদের মাথার চুলের অবস্থা উটের হেলে পড়া কুঁজের মতো। ওরা জান্নাতে যেতে পারবে না, এমনকি তার সুগন্ধিও পাবে না। অথচ এত এত দূর হতে তার সুঘ্রাণ পাওয়া যায়। ’ (মুসলিম, হাদিস : ৫৪৭৫)

সতর পরিপূর্ণ ঢাকা হয়, এমন পোশাক পরা : পোশাক যাতে এমন না হয়, যা পরিধান করার পরও মানুষের সতর অন্যের কাছে প্রকাশ হয়ে যায়। কারণ সতর প্রকাশ করা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক গুনাহ। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো পুরুষ অপর পুরুষের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাবে না এবং কোনো নারী অন্য নারীর লজ্জাস্থানের দিকে তাকাবে না। (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৫)

বিপরীত লিঙ্গের পোশাক না পরা : ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যেসব নারী পুরুষের বেশ ধারণ করে এবং যেসব পুরুষ নারীদের বেশ ধারণ করে তাদের রাসুল (সা.) অভিসম্পাত করেছেন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৭৮৪)

পুরুষদের রেশমি কাপড় পরা থেকে বিরত থাকা : আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে পুরুষদের জন্য রেশমি পোশাক এবং স্বর্ণালংকার ব্যবহার হারাম করা হয়েছে এবং নারীদের জন্য তা হালাল করা হয়েছে। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৭২০)

পুরুষদের জন্য টাখনুর নিচে কাপড় পরা : পুরুষদের জন্য টাখনুর নিচে কাপড় পরাও জঘন্য অপরাধ। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ইজারের (লুঙ্গির) বা পরিধেয় বস্ত্রের যে অংশ পায়ের গোড়ালির নিচে থাকবে, সে অংশ জাহান্নামে যাবে। ’ (বুখারি, হাদিস : ৫৭৮৭)

ছবিযুক্ত পোশাক পরা থেকে বিরত থাকা : আয়েশা (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) নিজের ঘরের এমন কিছুই না ভেঙে ছাড়তেন না, যার মধ্যে কোনো (প্রাণীর) ছবি থাকত। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৫২)

 



সাতদিনের সেরা