সাম্য-মৈত্রীর বাণী এবং মানুষের জীবনযাপনের দিকনির্দেশনা নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্মের উত্থান ঘটে।
আদিম মানুষের অজ্ঞতা, কল্পনা ও ভয়ভীতি থেকে ধর্মের উৎপত্তি এবং ধারণাটির সূত্রপাত প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে মানুষের পূর্বপ্রজাতি নিয়ান্ডার্থাল প্রজাতি থেকে। মানুষের ধর্মচিন্তা বিকশিত হয়েছে প্রধান দুটি ধারায়—
♦ একত্ববাদ (তাওহিদ-একেশ্বরবাদ)
♦ বহুত্ববাদ (শিরক-কুফর)।
আধুনিক গবেষণায় জানা যায়, ধর্মের উদ্ভবের মূলে আছে :
♦ প্রাগৈতিহাসিক যুগ ও প্রকৃতি পূজা :
প্রাগৈতিহাসিক গুহামানব ঝড়, বৃষ্টি, আগুন, বজ্রপাতের মধ্যে অতিপ্রাকৃতিক শক্তির উপস্থিতি কল্পনা করত। ফলে চন্দ্র, সূর্য, নদী, আগুনের মতো প্রাকৃতিক উপাদানের পূজা শুরু হয়।
♦ সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব :
(ক) সর্বপ্রাণ (Animism) সর্বেশ্বরবাদ : নৃবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের স্বপ্ন দেখা ও মৃত্যুর ধারণা থেকে আত্মা ও অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস জন্মায়।
(খ) প্রকৃতিবাদ (Natute-worship) : প্রাকৃতিক বিশালতা ও রহস্যময়তায় মানুষের মুগ্ধতা ও ভীতিই ধর্মের মূল উৎস।
♦ বিভিন্ন ধর্মের ক্রমবিকাশ :
(ক) আদিম বিশ্বাস, পৌরাণিক ধর্ম : প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিসর, গ্রিস, সিন্ধু সভ্যতায় সর্বেশ্বরবাদ বা বহু ঈশ্বরবাদী ও পৌরাণিক ধর্মের প্রচলন হয়।
(খ) ইব্রাহিমি ধর্ম : মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত তাওহিদবাদী ধর্মের মধ্যে রয়েছে ইহুদি, খ্রিস্টান, ইসলাম ধর্ম।
(গ) ভারতীয় ধর্ম : ভারতীয় উপমহাদেশে উৎপত্তি লাভ করে হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম।
মানব ইতিহাসের মতোই ধর্মের বিকাশ-বিবর্তনের কোনো সর্বসম্মত তত্ত্ব নেই। আছে একাধিক মত, আছে লিখিত ও অলিখিত দর্শনের বিতর্ক এবং তথ্যের আবর্তন। এমনই আলোচনায় ধর্মের বিকাশধারায় আছে :
ট্যাবু : লোকাচার ও রীতিনীতি। ট্যাবু সমাজ আরোপিত কঠোর বিধি-নিষেধ, নিষিদ্ধ বা অগ্রহণযোগ্য বিষয়। নৈতিকতা, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় নিয়ম থেকে মৃতের সৎকার ও মৃত ব্যক্তির স্বজনদের মঙ্গলাচরণ এবং শাসকশ্রেণির ওপর আরোপিত দেবত্ব-অতিভক্তি ইত্যাদি ।
টোটেম : টোটেম হলো কোনো গোত্র, উপজাতি বা সমাজ গোষ্ঠীর বিশেষ প্রতীক, যা সাধারণত কোনো প্রাণী, পাখি, গাছ বা প্রাকৃতিক বস্তুর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। মানুষ এ প্রতীককে তাদের রক্ষাকর্তা, শক্তির উৎস বা পরিচিত চিহ্ন হিসেবে গ্রহণ করে।
মানা : মানা হলো দ্রব্য ও বস্তুগত শক্তি। এটা মানুষের সাফল্য, মুক্তি ও মানসিক প্রশান্তির কারণ মনে করা হয়।
ম্যাজিক : কৌশল, তন্ত্রমন্ত্রের অতি ইন্দ্রিয় ক্ষমতা।
তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব হলো, বিভিন্ন ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস, উপাসনা পদ্ধতি, নৈতিকতা, আচার অনুষ্ঠান এবং ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ বিশ্লেষণ করে পার্থক্য ও মিল-অমিল অনুধাবন করার একটি শাস্ত্র। পবিত্র কোরআনে উৎসাহ—তোমরা কিতাবিদের (আসমানি কিতাবের অনুসারী) সঙ্গে উত্তম উপায়ে তর্ক-বিতর্ক করো।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৬)
বর্তমানে ৮৩০ কোটি (৮.৩ বিলিয়ন) মানুষের মধ্যে প্রায় চার হাজার তিন শ ধর্ম প্রচলিত আছে। Pew Research Center, Britanica এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মের ডেটা বেইস অনুযায়ী বৈশ্বিক ধর্মসমূহের পরিসংখ্যান রিপোর্ট ২০২৬ হলো—
খ্রিস্টধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ২৪৫ কোটি (২.৪৫ বিলিয়ন) বা ২৯.৫%। ইসলাম ধর্ম ১৯৫ কোটি (১.৯৫ বিলিয়ন) বা ২৩.৫%। হিন্দু ১২০ কোটি (১.২০ বিলিয়ন) বা ১৪.৫%। বৌদ্ধ ৫২ কোটি (৫২০ মিলিয়ন) বা ৬.৩%। চীনা লোক ধর্ম ৪২ কোটি (৪২০ মিলিয়ন) বা ৫.০%। শিখ তিন কোটি (৩০ বিলিয়ন) বা ০.৩৬%। ইহুদি এক কোটি ৫৮ লাখ (১৫.৮ মিলিয়ন) বা .১৯%। বাহাই ৮০ লাখ (৮ মিলিয়ন) বা ০.১০%। জন
৫০ লাখ (৫ মিলিয়ন) বা ০.০৬%। শিন্তো ৩৫ লাখ (৩.৫ মিলিয়ন) বা ০.০৪% এবং অন্যান্য ধর্ম ১% এর নিচে। ধর্মহীন মানুষের সংখ্যা ১২৫ কোটি (১.২৫ বিলিয়ন) বা ১৫.১%।
ইসলামে শিরক কুফরের স্থান নেই। একত্ববাদের পরিপন্থী বিষয় ইসলামে নিষিদ্ধ। অথচ ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্মে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহুত্ববাদ, সর্বেশ্বরবাদ, সর্বপ্রাণবাদ (Animism) তথা কুফর শিরক সমর্থন করে।
ইসলাম ছাড়া অন্য মতপথের কোনো মূল্যও নেই—‘কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবে না...।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫)
বস্তুত ধার্মিকতার মূলশক্তি বিশ্বাস। শুদ্ধাচার, মানবিক পূর্ণতা যার মধ্যে যত বেশি, তিনিই তত যথার্থ ধার্মিক। সাম্য-ভ্রাতৃত্বের প্রীতিময় সুসম্পর্ক ইসলামের অঙ্গীকার ও দর্শন। এ জন্যই মহান আল্লাহর নির্দেশ, ‘উদ্খুলু ফিসসিলমি কাফ্ফা’ অর্থাৎ ‘তোমরা ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০৮)
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ
কাপাসিয়া, গাজীপুর