kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

ইসলামে রসিকতার সীমারেখা

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইসলামে রসিকতার সীমারেখা

প্রাচীন যুগ থেকে মানুষ আমোদপ্রিয়। তাই মানুষকে আকৃষ্ট করতে যুগ যুগ ধরে ব্যাবসায়িক পণ্য বিক্রি ও রাজনৈতিক প্রচারণায় কমেডির ব্যবহার হয়ে আসছে। বর্তমান যুগে এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। তাই ব্যক্তিগত পর্যায়েও অনেকে কমেডি ভিডিও তৈরি করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কাজটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে দিন দিন বাড়ছে নতুন নতুন অ্যাপ।

এ ছাড়া বিভিন্ন দেশি-বিদেশি টিভি চ্যানেল চালু করেছে নতুন নতুন কমেডি শো, যেখানে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা ও অশ্লীল কৌতুকগুলোই বেশি শোনানো হয়। এ কারণেই হয়তো বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, কৌতুকাভিনয় হলো আত্ম-অবক্ষয়। তাঁর মতে, কৌতুকাভিনয় এমন অনুভূতির সঞ্চার করে, যা নৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করে।

 

কমেডিয়ান হওয়া

কমেডিকে পেশা হিসেবে নেওয়া কোনো মুমিনের জন্য শোভা পায় না। কৌতুক মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে দূরে রাখে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ওগুলোকে হাসিঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। (সুরা : লুকমান, আয়াত : ৬)

কমেডিয়ানরা সাধারণত মানুষকে হাসানোর জন্য বিভিন্ন গল্প বানিয়ে বলে। বাস্তবে যার কোনো ভিত্তি থাকে না। সম্পূর্ণ একটি মিথ্যা গল্প দিয়েই তারা মানুষের মনোরঞ্জন করে। হাদিসে এ ধরনের কাজকে নিষেধ করা হয়েছে। আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, মিথ্যা বাস্তবিকপক্ষেও নয় এবং ঠাট্টাচ্ছলেও সংগত নয়। তোমাদের কেউ তার সন্তানকে কিছু দেওয়ার ওয়াদা করে তা তাকে না দেওয়ার বিষয়টিও সংগত নয়। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৩৮৮)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, মানুষকে হাসানোর জন্য যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯০)

তা ছাড়া এই কমেডি শোগুলোর মাধ্যমে ছড়ানো হয় নানা অশ্লীল কথাবার্তা। যা পরবর্তী সময়ে মানুষ ঠাট্টাচ্ছলে নিজেদের পরিবারের মধ্যেও বলে ফেলে। অথচ এগুলো শয়তানের কাজ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, শয়তান তোমাদেরকে অভাব-অনটনের ভয় দেখিয়ে থাকে এবং অশ্লীলতার আদেশ করে থাকে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬৮)

 

ফান ভিডিও শেয়ার করা

অনেকে কৌতুক করতে জানেন না। কিন্তু কৌতুক ভীষণ পছন্দ করেন। তাই কোনো কৌতুকের ভিডিও পেলেই তা ইন্টারনেটে শেয়ার করে দেন। কেউ কেউ আবার ভিডিও শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে আয় করার জন্য কমেডি ভিডিওকেই বেছে নেন। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের মিথ্যা, অশ্লীল ভিডিও প্রচার করাও জঘন্য অপরাধ।

ইরশাদ হয়েছে, যারা পছন্দ করে যে মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও পরকালে রয়েছ যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি; আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। (সুরা : নূর, আয়াত : ১৯)

 

রসিকতার সীমারেখা

হ্যাঁ, এর মানে এই নয় যে ইসলাম আমাদের মুখের হাসি কেড়ে নিতে চাইছে। ইসলাম রসিকতা করতে নিষেধ করেনি। নিজের পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধবের মাঝেমধ্যে রসিকতা করারও অনুমতি আছে। তবে সেখানে কোনো অশ্লীলতা ও মিথ্যার মিশ্রণ ঘটানো যাবে না।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তাঁরা (সাহাবায়ে কেরাম) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমাদের সঙ্গে কৌতুক করছেন? তিনি বললেন, আমি কৌতুকের ছলে কখনো সত্য ছাড়া কিছু বলি না। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ১৭৬)

অনেক ক্ষেত্রে মানুষ কমেডি করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা জাতি-গোষ্ঠীকে ট্রল করে বসে। যা ইসলামে নিষিদ্ধ। একদিন আয়েশা (রা.) হাসির ছলে নবী (সা.)-কে জনৈক ব্যক্তির চালচলন নকল করে দেখালেন। রাসুল (সা.) তাতে বিরক্তি প্রকাশ করেন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫০২)

মুমিন কোনো অনর্থক কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে তাদের সফল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (মুমিনরা সফল) যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে। (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৩)। তা ছাড়া আমাদের সবাইকে মহান আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। হিসাব দিতে হবে তাঁর দেওয়া অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলো সঠিক জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে কি না সে বিষয়ে। মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ৩৬)

তাই আমাদের উচিত কমেডির অনর্থক কাজ বর্জন করে সোনালি পরকাল বিনির্মাণে আত্মনিয়োগ করা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা