kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ফিরে দেখা ১৩ জুন

যেভাবে সুয়েজ খালের অধিকার ফিরে পায় মিসর

আবরার আবদুল্লাহ   

১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যেভাবে সুয়েজ খালের অধিকার ফিরে পায় মিসর

মিসরের একটি জনপ্রিয় প্রবাদ হলো, ‘আপনি পৃথিবীর যেখানেই থাকুন, সুয়েজ খাল দ্বারা উপকৃত।’ বিশ্ববাণিজ্যে সুয়েজ খালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণেই হয়তো এই প্রবাদের সৃষ্টি। ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগর সংযুক্ত এবং এশিয়া-আফ্রিকা বিচ্ছিন্ন করা সুয়েজ খাল মূলত সামুদ্রিক বাণিজ্যের চেহারাই পাল্টে দিয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৭০টি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল করে সুয়েজ খালে। এতে পণ্য পরিবহন করা হয় তিন থেকে পাঁচ মিলিয়ন টন। বছরে প্রায় ২৫ হাজার জাহাজ সুয়েজ খাল ব্যবহার করে। এর বিনিময়ে মিসর ৪৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব উপার্জন করে। ধারণা করা হয়, ২০২৩ সাল নাগাদ সুয়েজ খালে দৈনিক ৯৭টি জাহাজ চলাচল করতে পারবে। তখন মিসরের বার্ষিক আয় হবে ১৩.২২৬ বিলিয়ন  মার্কিন ডলার।

সুয়েজ খাল খননের আগে ইউরোপের জাহাজগুলোর দক্ষিণ এশিয়ায় আসতে সময় লাগত ৪০-৫০ দিন। আর পাড়ি দিতে হতো অতিরিক্ত সাত হাজার কিলোমিটার পথ। কিন্তু সুয়েজ খাল ব্যবহার করে জাহাজগুলো মাত্র ২০ দিনে দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছতে পারে। সময় ও জ্বালানি বেঁচে যাওয়ায় বিশ্বজুড়েই বাণিজ্যিক পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের খরচ কমেছে অনেকাংশে।

কথিত আছে, খ্রিস্টপূর্ব ১৮৯৭ থেকে ১৮৩৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এই খাল খননের কাজ শুরু করেন ফারাও সম্রাট দ্বিতীয় নিকো। কিন্তু এই খাল মিসরীয়দের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে মর্মে স্বপ্ন দেখে তিনি তা পরিত্যাগ করেন। তারপর পারস্যের শাসক প্রথম দারিয়াস। দারিয়াসের পর দীর্ঘকাল পর্যন্ত কেউ সুয়েজ খাল খননের চিন্তা করেনি। খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকে ভারত মহাসাগরে ইংরেজ ও ওলন্দাজ নৌবাহিনীর তৎপরতা এবং কৃষ্ণসাগর ও ইজিয়ান সাগরে পর্তুগিজদের উৎপাত মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়, যাতে তুর্কি সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। ভারত মহাসাগরে তুর্কি আধিপত্য বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক জাহাজ ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ইউরোপীয় তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ পাশা (১৫৬৫-১৫৭৯ খ্রি.) সুয়েজ খাল খননের পরিকল্পনা করেন; কিন্তু মিসরীয় জনগণের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার, বিপুল ব্যয় বহনে সুলতানের অস্বীকৃতি, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হওয়া ইত্যাদি কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ইতিহাসবিদ ও সামরিকবেত্তাদের দাবি, উসমানীয় সুলতান এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে লোহিত সাগর, ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতো তুর্কি বাহিনীর। ১৭৯৮ সালে ফ্রান্স মিসর দখল করায় সম্রাট নেপোলিয়ান সুয়েজ খালের প্রাচীন নৌপথটি (সম্রাট নিকোর সময় খনন করা) আবিষ্কার করেন এবং সুয়েজ খাল খননের পরিকল্পনা করেন, যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

১৮৫৪ সালে ফরাসি প্রকৌশলী ফার্দিনান্দ ডি লেসেপ্স মিসর ও সুদানের শাসক সাইয়েদ পাশাকে সুয়েজ খাল খননের জন্য একটি আন্তর্জাতিক কম্পানি গঠনের প্রস্তাব দেন। সাইয়েদ পাশা তাতে সম্মত হন এবং ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম সুয়েজ চ্যানেল কম্পানি নামের একটি কম্পানি গঠন করা হয়। তাঁর অধীনে ১৮৫৯ সালে খননকাজ শুরু হয়। ১৮৬৯ সালে খনন সম্পন্ন হলে তা সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। নির্মাণকাজে একসঙ্গে ৩০ হাজার শ্রমিক নিয়োজিত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ব্রিটিশ ও ফরাসি উপনিবেশ থেকে শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক কাজের জন্য এখানে পাঠানো হতো। বিভিন্ন দেশের প্রায় ১.৫ মিলিয়ন শ্রমিক সুয়েজ খাল খননের কাজে নিযুক্ত হয়। এদের মধ্যে লক্ষাধিক শ্রমিকের মৃত্যুও হয়।

নির্মাণের সময় সুয়েজ খালের দৈর্ঘ্য ছিল ১৬৪ কিলোমিটার এবং গভীরতা ছিল আট মিটার। একাধিকবার সংস্কারের পর বর্তমানে সুয়েজ খালের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ১৯৩.৩ কিলোমিটার, গভীরতা (সর্বোচ্চ) ৭৭.৫ মিটার (২৫৪ ফুট)। নির্মাণকালে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে ব্রিটিশ কম্পানিকে অংশীদার করা হয়। ১৮৭৫ সালে মিসর অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডিজরেইলি মিসরের শাসক ইসমাইল পাশার কাছ থেকে ৪০ লাখ পাউন্ড স্টার্লিংয়ের বিনিময়ে সুয়েজ খালের বেশির ভাগ শেয়ার কিনে নেন। ব্রিটিশ শিল্পপতি রথচাইল্ড এতে বিনিয়োগ করেন। এভাবে চতুরতার সঙ্গে ব্রিটেন সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটেন সুয়েজ খালের নিরাপত্তার অজুহাতে মিসরে সেনা মোতায়েন করে, যা ১৯২২ সালে মিসরের স্বাধীনতার ব্যাপারে ইঙ্গ-ফরাসি সমঝোতা হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ১৯৩৬ সালে মিসর পুরোপুরি স্বাধীন হওয়ার পর আবার সেনা মোতায়েন করে ব্রিটেন এবং তা ১৯৫৬ সালের ১৩ জুলাই পর্যন্ত বহাল থাকে।

১৯২২ সালে মিসর স্বাধীনতা লাভের পর থেকে সুয়েজ খালের ওপর ইঙ্গ-ফরাসি নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। মিসরে সুয়েজ খাল জাতীয়করণের দাবিতে গণ-আন্দোলন শুরু হয়। নেপথ্যে মিসরের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুড এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। এতে ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়েন দলের শীর্ষ নেতারা। ব্রিটিশ সরকারের চাপের মুখে মিসর সরকার দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান হাসান আল বান্নাকে গ্রেপ্তার করে। যদিও মিসর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি ঝুঁকে পড়লে ব্রিটেন ব্রাদারহুডের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করে এবং সরকার উৎখাতের প্রস্তাব দেয়; কিন্তু ব্রাদারহুড এই প্রস্তাব এড়িয়ে যায়। মূলত গণ-আন্দোলনের মুখেই সুয়েজ খাল থেকে সেনা প্রত্যাহার করে ব্রিটিশ সরকার।

গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়। বলা হয়, আসওয়ান হাইড্যাম্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করতে অস্বীকৃতি জানানোয় বিপাকে মিসর সরকার। সরকার সুয়েজ খাল জাতীয়করণের মাধ্যমে জনরোষের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। সুয়েজ খাল জাতীয়করণের পর ইঙ্গ-ফরাসি-ইসরায়েলি বাহিনী সম্মিলিত হামলা চালায় মিসরে। ২৯ অক্টোবর ইসরায়েল সিনাই উপদ্বীপে এবং ৩১ অক্টোবর কায়রোতে বিমান হামলা চালায় ইঙ্গ-ফরাসি বাহিনী। মিসরের ওপর অন্যায় এই হামলার প্রতিবাদে সারা বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে এবং মিসরের বন্ধু রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন হামলা বন্ধ না করলে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেয়। বৈশ্বিক প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ নভেম্বর ১৯৫৬ তারিখে হামলা বন্ধ করে ব্রিটিশ-ফরাসি-ইসরায়েলি বাহিনী। এই হামলার কারণে সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫৭ সালের এপ্রিলে তা আবার চালু হয়। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর সুয়েজ খাল আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৫ সালে মিসর-ইসরায়েল শান্তিচুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ আট বছর পর জাহাজ চলাচল শুরু হয় সুয়েজ খালে।

তথ্যসূত্র : মেরিন ইনসাইট ডটকম, হিস্টরি ডটকম ও মার্ক কার্টিস ডটইনফো

মন্তব্য